এখনো পতনের কারণ খুঁজছে বিএসইসি

দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে টানা দরপতনে রেকর্ড তৈরি হলেও এখনো এর কারণ খুঁজছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দুই মাস ধরে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করেও সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করতে না পারায় দরপতন ঠেকানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি বিএসইসি। গতকালও শীর্ষ ব্রোকার ও ডিবিএ নেতাদের সঙ্গে বিএসইসির বৈঠকটিও দরপতনের কারণ খুঁজতেই সময় শেষ হয়েছে। কোনো সমাধান মেলেনি।

গত ২৪ জানুয়ারির পর পুঁজিবাজারে দরপতন টানা ১৪তম সপ্তাহে গড়িয়েছে। এ সময়ে ডিএসইর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি শেয়ারের দর ২০১৮ সালের তুলনায় কমে গেছে। স্টক এক্সচেঞ্জটির প্রধান মূল্যসূচক কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। গতকালও বেশির ভাগ শেয়ারের দরপতনে ডিএসইএক্স ২৮ পয়েন্ট কমেছে। এর আগে ২০০৮ সালে টানা ১১ সপ্তাহ দরপতনের ঘটনা ঘটেছিল।

এবারের টানা পতনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিএসইসির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য কিছু প্রণোদনার আশ^াস দেওয়া হলেও দরপতনের নেপথ্য কারণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য অর্থমন্ত্রীও জানাতে পারেননি।

গতকাল জাতীয় সংসদে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণে নেই বলে স্বীকারও করে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সে ধারা থেমে যাবে যদি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হয়। একই দিনে আলাদা এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট চলছে।

টানা দরপতনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শীর্ষ ২০ ব্রোকারেজ হাউসের প্রতিনিধি ও ডিবিএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন বিএসইসির শীর্ষ কর্মকর্তারা। জানা যায়, ওই আলোচনায় টানা দরপতনের কারণ খুঁজতে গিয়েই অধিকাংশ সময় ব্যয় হয়।

ওই বৈঠকে দরপতনের কারণ প্রসঙ্গে বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. খায়রুল হোসেন বলেন, পুঁজিবাজারে টিআইএন বাধ্যতামূলক হচ্ছে, এমন গুজবই দরপতনের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া গ্রামীণফোনের কাছে সরকারের সাড়ে ১২ কোটি টাকার বকেয়া ও ত্রুটি থাকায় ইউনাইটেড পাওয়ারে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন না পাওয়ার ঘটনাও পুঁজিবাজারের দরপতনে প্রভাব ফেলেছে। তবে দরপতনের কারণ নিয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যানের ধারণা সাম্প্রতিককালের বলে মনে করেন বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা।

বিএসইসির বৈঠকে ব্রোকার হাউসের প্রতিনিধিরা জানান, দরপতনের একটি বড় কারণ হচ্ছে তারল্য সংকট এবং এটির নেপথ্যে রয়েছে আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) ও প্লেসমেন্ট শেয়ার বাণিজ্য। তারা জানান, অনেক নি¤œমানের কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে অর্থ তুলেছে। আবার আইপিওর মাধ্যমে যে পরিমাণের অর্থ সংগ্রহ করেছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ বাজার থেকে নেওয়া হয়েছে প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে। এ প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাজার থেকে অর্থ প্রত্যাহার হলেও নতুন ফান্ড আসেনি। প্লেসমেন্ট শেয়ারে নতুন নীতিমালা করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএসইসির চেয়ারম্যান। আইপিওর পরিমাণের চেয়ে প্লেসমেন্ট যাতে বেশি না হয় ডিএসইর এমন দাবি

মেনে নিয়ে এসব শেয়ারে লক-ইনের মেয়াদ বাড়াতেও রাজি হয়েছে বিএসইসি। ডিবিএ প্রস্তাব দিয়েছে দুটি এজিএম (বার্ষিক সাধারণ সভা) সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত প্লেসমেন্ট শেয়ারে লক-ইন রাখার। বিএসইসি বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা বিএসইসিকে জানিয়েছেন, ব্যাংক ব্যবস্থায় তারল্য সংকট ও সুদের হার বৃদ্ধির নেতিবাচক

প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে সঞ্চয়পত্র কিংবা ব্যাংকে আমানত রাখছেন। এ সময় বিদেশিরাও শেয়ার বিক্রি বাড়িয়েছেন। বাজারের এ মন্দ অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তাও ভালো প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে আইসিবি ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটিকে বাজারকে সাপোর্ট দিতে বিভিন্ন সময়ে তহবিল দেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা দিয়ে মন্দ শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে। স্টেকহোল্ডারদের এমন অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ^াস দিয়েছেন বিএসইসির চেয়ারম্যান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈঠকে অংশগ্রহণকারী একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রতিনিধি জানান, বিএসইসির সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। তাদের দিক থেকে যেসব করণীয় রয়েছে, তা দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। বাজারে যাতে নতুন করে পতন না হয়, সে জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করা হবে। মিউচুয়াল ফান্ড যাতে লভ্যাংশ হিসেবে রি-ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট দিতে না পারে, সে জন্য বিধিমালায় পরিবর্তন আনার আশ^াস দিয়েছে বিএসইসি।