সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকার পরও আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণি নিয়ে দেওয়া সতর্কবার্তা ও পূর্বাভাস ছিল অনেকটাই ত্রুটিযুক্ত। ঝড়ের গতিপথ, আঘাত হানার স্থান ও সময় কোনোটাতেই মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঘূর্ণিঝড়টি মেহেরপুর, যশোর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠিসহ কয়েক জেলা অতিক্রম করার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল তা সঠিক হয়নি। তার ওপর ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, চুয়াডাঙ্গা ও পাবনাসহ অনেক জেলার বিষয়ে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়নি অথচ ঝড়টি দুর্বল হয়ে নিম্নচাপ আকারে ওইসব অঞ্চল দিয়েই অতিক্রম করেছে। গত ২ মে দেওয়া পূর্বাভাসে ঝড় বাংলাদেশে আঘাত হানার সময় শুক্রবার সন্ধ্যা বলা হলেও তা হয়নি। ফলে ঝড়ের পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়। অথচ সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ায় ভারতের আবহাওয়া বিভাগের প্রশংসা করেছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমও ভারতের পূর্বাভাস গুরুত্ব দেয় প্রতিবেদনে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় ও আবহাওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য ভারতের আবহাওয়া বিভাগ ও বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর একই পদ্ধতি ও একই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। সেক্ষেত্রে আমাদের পূর্বাভাস ভুল হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে যেসব পূর্বাভাস ও বক্তব্য দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে বাস্তবতার অনেকটাই মিল পাওয়া যায়নি। তারা আরও বলেন, আমাদের নিজস্ব ট্র্যাক (গতিপথ) ফোরকাস্টিং সিস্টেম নেই। অন্যদের ট্র্যাক ফোরকাস্টিং থেকে পূর্বাভাস নিয়ে আমাদের আবহাওয়াবিদরা এলাকা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। আর এতে পূর্বাভাস আর ঝড়ের গতির মিল পাওয়া যায় না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘূর্ণিঝড় বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্ল্যাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি), আমেরিকার জয়েন্ট টাইফুন ওয়াচ সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ফণির বিষয়ে প্রতি মুহূর্তে ট্র্যাকসহ ফোরকাস্টিং দিচ্ছিল। আইএমডির নিজস্ব ট্র্যাক ফোরকাস্টিং মডেল আছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) নিজস্ব ট্র্যাক ফোরকাস্টিং সক্ষমতা নেই। তারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ট্র্যাক ফোরকাস্ট দেখে সেটা ফিজিক্যালি বলার চেষ্টা করে। আবহাওয়া দপ্তর ট্র্যাক (ঝড়ের গতি) কোথা দিয়ে কখন যাবে সেটা বলেনি। এক্ষেত্রে গ্লোবাল মডেলগুলোই সঠিক তথ্য দেয়। দুই-তিন দিন আগে যে পূর্বাভাস ছিল তার চাইতে ফণি ৭০-৮০ কিলোমিটার দূর দিয়ে গেছে। গতকাল (শুক্রবার) যে পূর্বাভাস ছিল তার চাইতেও ২০ কিলোমিটার দূর দিয়ে ঘূর্ণিঝড়টি গেছে। এটা আমাদের দেশে প্রবেশের কথা ছিল সাতক্ষীরা-খুলনা অঞ্চল দিয়ে। অথচ যে সময়ের কথা বলা হয়েছে তার চাইতে দুই তিন ঘণ্টা পরে যশোর, ঈশ্বরদী, পাবনা, রাজশাহী সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তিনি আরও বলেন, আমি পুরো বিষয়টি অস্বাভাবিক বলব না। কারণ সাইক্লোনকে ‘পিনপয়েন্ট’ করা খুবই কঠিন। তবে বিএমডি আরেকটু নির্দিষ্টকরণ করলে ভালো হতো। অনেক সময় তারা ফোরকাস্ট যেটা দেয় এবং সংবাদ সম্মেলনে যেটা বলে তার মধ্যেও অনেক দূরত্ব লক্ষ করা গেছে। তারা বুলেটিনে একটা বলে মুখে আরেকটা বলে। এসব ক্ষেত্রে আরও সমন্বয় করে কথা বলা উচিত। আবহাওয়া অধিদপ্তর সাধারণত তিন ঘণ্টা পরপর আপডেট দেয়। অথচ প্রতি মিনিটেই সাইক্লোনের গতিপথ পরিবর্তন হয়। তাই এই ট্রেন্ড পাল্টানো জরুরি। তিনি বলেন, ঝড়টি কলকাতার ওপর দিয়ে অনেকদূর ঘুরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। যার ফলে এর গতি অনেক কমে গেছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা থেকে অনেক দূর দিয়ে ৬৬-৮০ কিলোমিটার গতি নিয়ে অর্থাৎ অনেক দুর্বল হয়ে প্রবেশ করে।
ভুলে ভরা পূর্বাভাসের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাইক্লোন ফোরকাস্টিংয়ে বরাবরই আমরা ভারত থেকে ভালো করি। কিন্তু এটা সঠিক যে, এবার ভারত আমাদের চাইতে অনেক ভালো ফোরকাস্টিং দিয়েছে। পরিচালক নিজেই বলেছেন, শনিবার বেলা ১১টা নাগাদ ঝড়টি বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। কিন্তু এসেছে তার চাইতে অনেক আগে। তিনি বলেন, এটা হতে পারে। ওপরে আবহাওয়ার যে বিন্যাস তার ওপরে নির্ভর করে হয় ঝড়ের গতি। পশ্চিমা বায়ুর সঙ্গে মিলে ঝড়টি স্থির হওয়ার মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে সেটা দ্রুত পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিমে সরে যায়। যার ফলে ঝড়টি প্রায় ৫ ঘণ্টা আগে চলে আসে। বাতাসের গতি নিয়ে যে পূর্বাভাস দিয়েছেন সেটা সঠিক ছিল এ জন্য আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রশংসার দাবি রাখে। এই আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ বলেন, ২২ তারিখের দিকে যখন লঘুচাপটি তৈরি হয় তখন থেকেই আমি বিষয়টি লক্ষ রেখেছি। তারা শুরুর দিকে পূর্বাভাস ভালোই দিয়েছে।
গতিপথ সঠিক না হওয়ার বিষয়ে সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, এই ঝড়টি আর ৩০-৪০ কিলোমিটার পূর্বদিক থেকে এলে বড় ধরনের ক্ষতি হতো। সব ফোরকাস্টারই কিছুটা সময় হাতে রাখার চেষ্টা করে এবং ঝড়টি নিজের দেশের দিকে টানার চেষ্টা করে। অধিক সতর্কতার জন্য সেটা করা হয়। অভিজ্ঞ এই আবহাওয়াবিদ বলেন, বিষুবরেখার এত কাছে ভারত মহাসাগরে এর আগে কোনো ঝড় সৃষ্টি হয়নি। ফলে এটি অনেক শক্তি সঞ্চয় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এত প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছে। এর আগে বাংলাদেশে যত ঝড় এসেছে, তা সরাসরি বঙ্গোপসাগর দিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হেনেছে। এই ঝড় ওড়িশা হয়ে পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশের দিকে আসার পথেও বেশ শক্তিশালী ছিল।
বাংলাদেশের আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, ঘূর্ণিঝড় ফণি কমপক্ষে পাঁচ দফা গতিপথ বদলিয়েছে। শুরুতে এটি ভারতের ওড়িশা ও অন্ধ্র প্রদেশ-তামিলনাড়–র দিকে ছিল। পরে তা ওড়িশার দিকে মোড় নেয়। এরপর ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দিকে মুখ করে এগোতে থাকে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসের হ-য-ব-র-ল অবস্থা নিয়ে অধিদপ্তরের পরিচালকের বক্তব্য জানার চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। তার পক্ষে অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমালোচনা থাকবেই। আমাদের পূর্বাভাস ভারতের পূর্বাভাসের মতোই ছিল। আমরা পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের কথা না বললেও খুলনা ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কথা বলেছি। তার মধ্যেই পাবনা ও আশপাশের এলাকাও পড়ে। এছাড়া দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কথাও বলেছি। সেই অঞ্চলে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল পড়ে। সবকিছু আমাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী হয়েছে।’
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের কর্মকর্তারা দেশটির গণমাধ্যমকে বলেছেন, নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আছড়ে পড়ার পর যত বেশি স্থলভাগে প্রবেশ করে, তত তাড়াতাড়ি তার শক্তিক্ষয় হতে থাকে। অর্থাৎ স্থলভাগের শুষ্ক বাতাস যত বেশি পাবে, তত তার শক্তি কমতে থাকে। ফণি প্রথম উপকূলভাগে প্রবেশ করে ওড়িশার পুরিতে। তারপর ভুবনেশ্বর, কটক, বালেশ্বর হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রবেশ করে পশ্চিমবঙ্গের খড়গপুরে। তখন তার শক্তি অনেকটাই কমে যায়। পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রমের সময় এর গতিবেগ ছিল ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার। ফলে ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয়নি।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগ ও ঝড় পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আগেই বলেছিল, ফণি শনিবারের মধ্যে বাংলাদেশের ভূখণ্ড অতিক্রম করে ভারতের মেঘালয় রাজ্য হয়ে হিমালয়ে গিয়ে থামবে। সেখানে বাধা পেয়ে এটি প্রবল বর্ষণ ঘটাবে। এর প্রভাবে মেঘালয় ও বাংলাদেশের সিলেটে ২০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। যা থেকে হাওর ও সিলেট এলাকায় হঠাৎ বন্যার আশঙ্কা আছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফণির প্রভাবে আজ রবিবার ও আগামীকাল সোমবার বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল এবং তৎসলগ্ন ভারতীয় অঞ্চলসমূহে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদী বিশেষত সুরমা, কুশিয়ারা, কংস, যদুকাঠা, তিস্তা নদীর পানি শনিবার রাত থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং কোথাও কোথাও বিপদসীমা অতিক্রম করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কলকাতার সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার জানিয়েছে, জাতিসংঘের ‘অফিস ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন’ (ওডিআরআর)-এর মুখপাত্র জেনিস ম্যাকক্লিন বলেন, ‘ভারতের আবহাওয়া বিভাগ নির্ভুল সতর্কবার্তা দেওয়ায় আগেই ১১ লক্ষ মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। প্রায় ৯০০টি সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় দেওয়া হয় তাদের। এতে ভারতের আক্রান্ত অঞ্চলে জীবনহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ভীষণ ভালো কাজ করেছে। এজন্য জাতিসংঘ থেকে ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়।’