৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল বিএনপি নেতাদের মধ্যে। এই সুযোগে দলের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করতে থাকেন প্রকাশ্যেই আর ভেতরে ভেতরে বলতে থাকেন সরকারের এজেন্ট, দালাল। তাদের সে মতবিরোধ বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা একে অপরকে ফের সরকারের এজেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করছেন দলীয় ফোরামে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে দলটির ভেতরকার এই অস্থিরতার চিত্র পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, সর্বশেষ গত ২৯ এপ্রিল বিএনপি থেকে নির্বাচিত চার সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এর ফলে দলের নেতাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে।
তবে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দলের নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে দলের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়নি। সভা-সমাবেশে যে যা বলেন সেটি তাদের ব্যক্তিগত অভিমত। দলের সিদ্ধান্ত দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরাই নেন।
দলের সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ ইস্যুতে নেতাদের মধ্যে যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফোন করেছিলেন কি না জানতে চাইলে গয়েশ^র বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যখন যাকে প্রয়োজন মনে করেন তখন তাকে ফোন করেন। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও দলে কোনো মতবিরোধ ও অস্থিরতা নেই বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সব সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবেই নেওয়া হচ্ছে। সবাই ঐক্যবদ্ধ আছেন।
তবে বিএনপিতে অস্থিরতা আছে বলে মনে করেন দলটির সমর্থক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, বর্তমানে বিএনপির কোনো কর্মসূচি নাই। নেতারা সব অলস বসে আছেন। আর অলস মস্তিষ্ক শয়তানের ক্রীড়াক্ষেত্র। দুজন কোথাও বসলে একে অপরের বিরুদ্ধে কটু কথা বলছেন। বিএনপি একটি দুর্যোগময় পরিস্থিতি পার করছে মন্তব্য করে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন বলেন, এ অবস্থায় নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে হবে। এজন্য বেশি বেশি বৈঠক করে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা দরকার। কর্মসূচি ঠিক করে তা বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়া দরকার। তিনি বলেন, সংসদে যোগ দেওয়ার বিষয় নিয়ে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে তা দূর করতে হবে। এজন্য খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। কারণ ভুল কেউ এককভাবে করেনি। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন কাউকে এককভাবে দায়ী করা যাবে না।
এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, নির্ধারিত ৯০ দিনের শেষদিকে বিএনপির চার সংসদ সদস্য শপথ নিয়েছেন। শপথের আগে তিন মাস সময় ছিল। যখন স্পষ্ট হলো নির্বাচিতরা শপথ নেবেনই, সে সময় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম মহাসচিব, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা ও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল বোঝাবুঝি হতো না।
বিএনপির একাধিক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ইস্যুতে দলের নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি না মানার পরও নির্বাচনে থাকার বিষয়ে দলের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করতে থাকেন। নেতারা দলীয় ফোরামে একে অপরকে সরকারের এজেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যে সমস্যা নির্বাচনের পর প্রায় কেটে গিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি থেকে নির্বাচিত চার সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণ নিয়ে আবার অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় ফোরামে ফের একে অপরকে সরকারের এজেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। বিষয়টি যেভাবে মোকাবিলা করা উচিত ছিল সেভাবে করা যায়নি।
তারা বলেন, চার সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণের দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ডাকতে পারতেন। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত জানাতে পারতেন। তাহলে ভুল বোঝাবুঝি হতো না। কিন্তু তিনি তা করেননি।
২৯ এপ্রিল বিকেলে চার সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণ নিয়ে রাতে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে মির্জা ফখরুল লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। জানান, দলের সিদ্ধান্তেই শপথ নিতে গেছেন সংসদ সদস্যরা। কারণ দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সংসদে যে সুযোগটুকু পাওয়া যাবে তা কাজে লাগাতে চায় বিএনপি।
তবে তার এ বক্তব্য সহজভাবে নেননি দলটি স্থায়ী কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মহাসচিব একবার বলছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে এমপিরা শপথ নিয়েছেন। মির্জা ফখরুলও তো এমপি। তিনি কেন শপথ নিলেন না? দলের সিদ্ধান্ত মেনে শপথ না নেওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা দরকার। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় শপথ না নেওয়ার বিষয়ে মহাসচিবের কাছে ব্যাখ্যাও দাবি করেন। ফখরুলবিহীন ওই অনুষ্ঠানে কেন ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন জানতে চাইলে গয়েশ্বর দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি যে সভায় এই বক্তব্য রেখেছেন সে সভায় অন্য বক্তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এমন কথা বলেছিলেন।