বেতন-ভাতা ও অন্যান্য দাবিতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে অনেক দিন ধরে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি একেবারেই কম হচ্ছে না। শ্রমিকরা তাদের দাবিদাওয়া সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছানোর জন্য সম্ভাব্য সকল উপায় অবলম্বন করছেন। তার পরও কেন এ আন্দোলন প্রশমনে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না, তা বোধগম্য নয়। আন্দোলনের অংশ হিসেবে খুলনার পাটকল শ্রমিকরা খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের সড়ক অবরোধ করেন এবং ঢাকার লতিফ বাওয়ানী ও করিম জুট মিলের শ্রমিকরা ডেমরার সড়ক অবরোধ করে রাখেন। গত ২ এপ্রিল থেকে ৯ দফা দাবিতে পাটকল শ্রমিকরা এ আন্দোলন ও অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন।
২০১৫ সালে পাটকল শ্রমিকদের নিয়ে সরকারঘোষিত ‘জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন’ গঠিত হলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। শ্রমিকরা মনে করেন, এ কারণে তারা সব দিক থেকেই বঞ্চিত। তাদের ৯ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে কমিশন বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, মৃত শ্রমিকদের বীমার বকেয়া প্রদান, বরখাস্ত শ্রমিকদের পুনর্বহাল, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ী করা, পাট কেনার বরাদ্দ বাড়ানো ইত্যাদি।
বাংলাদেশ পাটকল সংস্থা (বিজেএমসি) বলছে, পাটকলগুলো লোকসানি হওয়ায় তারা শ্রমিক-কর্মচারীদের ঠিকমতো বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। অন্যদিকে শ্রমিকদের অভিযোগ, মূলত পাটকল ব্যবস্থাপক ও পরিচালকদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই দায় তারা নিতে চান না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর লোকসানের দায় কোনোভাবেই শ্রমিকদের ওপর চাপানো চলে না। কেননা শ্রমিক-কর্মচারীরা কখনোই নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করে না। বেসরকারি পাটকলগুলো যদি লাভজনক হতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোকে কেন প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে? আন্দোলনরত শ্রমিকরা লোকসানের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। তারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে যখন পাটের দাম কম থাকে, বিজেএমসি তখন পাট না কিনে পরে বেশি দামে কেনে। সময়মতো বরাদ্দ না পাওয়ার যে অভিযোগ করেছে বিজেএমসি, তারও কোনো যুক্তি নেই। সময়মতো কেন বরাদ্দ পাওয়া যায় না, এ প্রশ্নের উত্তর তাদেরকে দিতে হবে। তা ছাড়া, সরকারি পাটকলগুলোর বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত পণ্য অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এসব পণ্য বিক্রির দায়িত্ব নিশ্চয়ই পাটকলগুলোর কর্র্তৃপক্ষেরই, শ্রমিকদের নয়। ফলে এখানে উদোর পি-ি যে বুধোর ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে তা স্পষ্ট।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় বলছে, জাতীয় মজুরি স্কেল-২০১৫ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সব মিল কর্র্তৃপক্ষকে জাতীয় মজুরি স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করতে নির্দেশ দিয়েছে বিজেএমসি। শ্রমিকরা এ নির্দেশনায় আশ্বস্ত হতে পারেননি। এটি অস্বাভাবিক নয়। কারণ এর আগেও বেশ কয়েকবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। শ্রমিকদের আস্থা অর্জন করতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের যে অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অনাস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তা থেকে উভয় পক্ষকে বেরিয়ে আসতে হবে। শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে নিতে হবে। বর্তমান সরকার পাট খাতের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার কথা বলে আসছে অনেকদিন ধরেই। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার কথাও আমরা জানি। এ অবস্থায় শ্রমিক আন্দোলনের কারণে এ খাতের সংকটগুলো শুধু বেদনাদায়ক নয়, হতাশাজনকও বটে।
কৃষককে পাট উৎপাদনে উৎসাহিত করার পাশাপাশি মিলগুলোর সমস্যা ও সংকট দূর করে শ্রমিকদের মজুরি প্রদানের পথ মসৃণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা স্বল্প আয়ের এ শ্রমিকদের ওপর তাদের পরিবার ও সন্তানসন্ততিদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাদের উৎপাদনকাজেও ফিরিয়ে আনা দরকার। অন্য যে দাবিগুলো শ্রমিকদের রয়েছে, সেগুলোর যৌক্তিকতা যাচাই করে, আলোচনা সাপেক্ষে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। দুর্নীতি রোধ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মাথাভারী প্রশাসন কাটছাঁটের মাধ্যমে পাটকলগুলোর লোকসান কমিয়ে আনা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে এ খাত লাভের মুখও দেখতে পারে। প্রতিবেশী দেশে এবং দেশের ভেতরে বেসরকারি পাটকলগুলো লাভজনক হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত লোকসান গুনছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে পরিবর্তন আসবে। এখন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোয় বিরাজমান সমস্যা নিরসনে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, এটাই কাম্য।
অন্যদিকে শ্রমিকদের মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্ত করে কোনো আন্দোলনের কর্মসূচি সফল হতে পারে না। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের দাবিদাওয়া, বিশেষত বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবির সঙ্গে সাধারণ মানুষ সহানুভূতিশীল, তবে দাবিদাওয়া পূরণের এ আন্দোলন অবশ্যই শান্তিপূর্ণ রাখতে হবে।