‘মাজেদ আলী’ অপহরণ ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন

অবশেষে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে নিখোঁজ ‘মাজেদ আলী’ অপহরণ ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে র‌্যাব-১১।

নিখোঁজের স্ত্রীর করা ফতুল্লা থানার জিডি এবং র‌্যাব অধিনায়ক বরাবর লিখিত অভিযোগের সূত্র ধরে মাজেদ আলী নিখোঁজের বিষয়ে তদন্তে নামে র‌্যাব-১১। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে হত্যার মূল রহস্য। সেই সাথে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মূল হত্যাকারীসহ ৩ জনকে। 

র‌্যাব-১১ আদমজীনগর, নারায়ণগঞ্জ এর প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে, গত ১৩ মার্চ নাজমা বেগম নামে পাবনার এক মহিলা র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক বরাবর অভিযোগে উল্লেখ করেন, তার স্বামী মো. মাজেদ আলী গত ১০ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা থেকে নিখোঁজ রয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি ফতুল্লা থানায় একটি জিডি করেন।

অভিযোগে উল্লেখ করেন, তারা স্বামী-স্ত্রী বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে মহিউদ্দিন বুলু নামের এক আদম ব্যবসায়ীর কথায় পাবনা থেকে নারায়ণগঞ্জে আসেন।

বুলু তাদেরকে ফতুল্লার টাগারপাড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় রাখে। পাসপোর্ট, ভিসা, মেডিক্যাল ও বিভিন্ন কাজের কথা বলে বুলু তাদের কাছে থেকে ২ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেয়। বুলু তাদের বিদেশ না নিয়ে নানা ছলচাতুরি করে কালক্ষেপণ করতে থাকে।

গত ১০ মার্চ মহিউদ্দিন বুলু বিকেলে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে কৌশলে মাজেদ আলীকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। রাতে বুলু ফিরে আসলেও মাজেদ আলী আর ফিরে আসেনি। তখন থেকে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে আসলেও মাজেদ আলী বাসায় ফিরে না আসায় নাজমা বেগম স্বামীর জন্য কান্নাকাটি করলে আদম-বেপারী মহিউদ্দিন বুলু কৌশলে পালিয়ে যায় এবং নাজমা বেগমের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

অভিযোগ পেয়ে র‌্যাব-১১ এর একটি বিশেষ গোয়েন্দা দল নিখোঁজ মাজেদ আলীর সন্ধান ও সন্দেহভাজন মহিউদ্দিন বুলু (৪২)কে ৮ এপ্রিল ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকা থেকে  আটক করে।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত মহিউদ্দিন বুলু নিখোঁজ মাজেদ আলীর পরিণতি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। পরে বুলু ও নিখোঁজ মাজেদ আলীর মোবাইল কল লিষ্ট ও ঘটনার দিনে তাদের গতিবিধি পর্যালোচনা করে দেখা যায় ওই দিন তারা নারায়ণগঞ্জ থেকে বিকেলে দাউদকান্দি ব্রীজ এলাকায় ও সন্ধ্যায় মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানাধীন মেঘনা নদীর তীর এলাকায় অবস্থান করে।

এতে ধারণা করা হয় মহিউদ্দিন বুলু ও তার সহযোগীরা মিলে টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে মাজেদ আলীকে গুম করেছে। এই ঘটনায় র‌্যাবের সহযোগিতায় নিখোঁজ মাজেদ আলীর স্ত্রী নাজমা বেগম বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় ০৯ এপ্রিল মামলা দায়ের করে।

অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকার সোহেল নামক এক নৌকার মাঝির নাম পাওয়া যায়। সে তার এলাকা ভাটেরার চর ও দাউদকান্দি বাজারের মধ্যে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় যাত্রী আনা-নেওয়া করে।

গোপন সূত্রে জানা যায় ঘটনার দিন আদম-বেপারী মহিউদ্দিন বুলু নিখোঁজ মাজেদ আলী ও অজ্ঞাত এক লোক'কে নিয়ে সোহেল মেঘনা নদীতে নৌকা চালিয়ে ছিল।

১০ মে  র‌্যাব-১১ কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি বাজার ঘাট হতে নৌকার মাঝি সোহেল (২১)কে আটক করে এবং তার নৌকাটি জব্দ করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নৌকার মাঝি সোহেল ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দি প্রদান করে। আদম-বেপারী মহিউদ্দিন বুলু ও বাবু একত্রে সোহেলের নৌকায় মাজেদ আলীকে পাশবিক নির্যাতন করে, গলা টিপে ও নাক-মুখ চেপে ধরে  শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে মেঘনা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়।

এঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত নৌকার মাঝি সোহেল ১৩ মে নারায়ণগঞ্জ জেলার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দেয়।

নৌকার মাঝি সোহেলের জবানবন্দির সূত্র ধরে মঙ্গলবার (১৪ মে) ভোরে মাজেদ আলীর হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত সুলতান মাহমুদ বাবু (৩৬)কে আটক করে।   

র‌্যাবের বিজ্ঞাসাবাদে বাবু জানায়, সে বুলুর দূর সম্পর্কিত আত্মীয় ও সম্পর্কে মামা-ভাগিনা। ঘটনার কয়েক দিন আগে বুলু এক লোককে মারার জন্য তার সহযোগিতা চায় এবং সহযোগিতা করলে এক লক্ষ টাকা দিবে বলে আশ্বাস দেয়। টাকার লোভে বাবু রাজি হয় এবং দুইজন মিলে ঐ লোককে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। দুইজন মিলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠান্ডা মাথায় মাজেদ আলীকে হত্যা করে মেঘনা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়।

র‌্যাব-১১ এর সিনিয়র এএসপি জসিমউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাজেদ তার স্ত্রীকে নিয়ে স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্নে বিদেশ পাড়ি দেবার জন্য পাবনা থেকে সুদূর নারায়ণগঞ্জে আসছিল। এক আদম-বেপারীর লোভের শিকার হয়ে মেঘনা নদীতে হারিয়ে গেলো সেই মাজেদ। কিন্তু স্বামীহারা নাজমা বেগম দুর্বিষহ স্মৃতির যন্ত্রনা নিয়ে পাবনায় ফিরে যায়, যে স্মৃতি আমৃত্যু তাকে বয়ে বেড়াতে হবে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যাবস্থা নেওয়া হচ্ছে।