ডিজিটাল মূল্য তালিকার সাফল্য নিয়ে সংশয়

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার চড়া হওয়ার খবর নিয়মিতই শিরোনাম হয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে। সিয়াম সাধনার মাস রমজানে বাজারের আগুন বাড়ে কয়েক গুণ। লাগাম টানতে সরকার দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ নেয়; বাজারগুলোতে টানায় মূল্যতালিকা। কিন্তু তাতে থোড়াই কেয়ার ব্যবসায়ীদের। তারা হাতে লেখা মূল্যতালিকা মুছে দিয়ে প্রায় সব পণ্য নিজেদের মতো দামে বিক্রি করে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। এমন বাস্তবতায় পণ্যের ডিজিটাল মূল্যতালিকা করার সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু বিক্রেতাদের ইচ্ছামতো দাম হাঁকানোর প্রবণতায় দ্রব্যমূল্যের এই বোর্ডে কোনো লাভ হবে না বলে মনে করছেন ক্রেতাদের অনেকে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, বেশি দরে পণ্য কেনা ও বিভিন্ন জনকে চাঁদা দিতে হয় বলে তালিকায় দেওয়া দামে বিক্রি করলে লাভের মুখ দেখবেন না তারা।

গত ৯ মে হাতিরপুল বাজার পরিদর্শনে গিয়ে ডিজিটাল মূল্যতালিকার ঘোষণা দেন ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি জানান, নগর ভবন থেকেই ডিজিটাল বোর্ডগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং প্রতিদিনকার মূল্য হালনাগাদ করা হবে।

ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, ডিএসসিসির আওতায় ১৩টি  কাঁচাবাজার রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আটটি বাজারে ডিজিটাল বোর্ড লাগানো হচ্ছে। তিনি আরও জানান, গতকাল রাতে হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগান বাজারে দুটি বোর্ড বসানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের।

ডিজিটাল মূল্যতালিকার আগে সাধারণ তালিকা মানা হচ্ছে কি না, তা জানতে এই প্রতিবেদক যান হাতিরপুল বাজারে। সেখানে দেখা যায়, সিটি করপোরেশনের মূল্য তালিকার চেয়ে সব পণ্যই বেশিতে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। টমেটো ৩০-৩৬ টাকায় বিক্রির কথা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। শসার কেজি তালিকায় ৩৬-৪৮ টাকা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে। তালিকায় উন্নত মসুর ডালের মূল্য ৯৫-৯৮ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। সব পণ্যই এভাবে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, অনেকে সিটি করপোরেশনের মূল্যতালিকার কথা জানেনও না। কেউ কেউ জানলেও ওটাকে গুরুত্ব দেন না। তারা মনে করেন, ওই তালিকা লোকদেখানো। তালিকা ডিজিটাল হলে দ্রব্যমূল্য চোখে পড়বে। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে ক্রেতাদের। মোসলেহ উদ্দিন নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘এগুলা দেখার সময় পাওয়া যায় নাকি? ব্যাংক লুট কইরা খায়া ফেলতেছে, আর এসব দেখার টাইম কই?’ তবে আল আমিন নামে আরেক ক্রেতা জানালেন, তিনি তালিকা দেখেন। কেউই এই মূল্য তালিকা মানতে চায় না। বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিদিনই দাম নিয়ে তার বাগ্বিতণ্ডা হয়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, যে দামে পণ্য বিক্রি করলে তাদের লাভ হবে, সে দামেই তারা বিক্রি করবেন। সিটি করপোরেশনের তালিকায় কত লেখা, তা তারা দেখেন না। তাদের অভিযোগ, করপোরেশনের নির্ধারিত মূল্য তালিকায় কম দাম লেখা থাকে। ওই দামে তাদের লাভ হবে না।

ফুটপাতের এক তরকারি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রতিদিনের দোকান ভাড়া হিসেবে লাইনম্যানকে (পুলিশের) ২০০ টাকা এবং বাজার সভাপতিকে দিতে হয় ১৫০ টাকা। এ ছাড়া থানার ওসিকে মাসে দিতে হয় ৫০০ টাকা। সেদিন মেয়র আসবে, তাই ফুটপাতে বসতে নিষেধ ছিল। কিন্তু সেদিনের ভাড়া ঠিকই দিতে হইছে। এত খরচের পর কম লাভে তরকারি বেচলে চলমু কেমনে? অনেক ক্রেতা চার্টের দামের সঙ্গে তুলনা করে ঝগড়া করে, কিন্তু আমি বলে দিই ওই চার্ট দেইখা লাভ নাই।’

মুদি ব্যবসায়ী আমিন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের চার্টে আলুর পাইকারি মূল্য লেখা ১১ টাকা এবং বিক্রির মূল্য লেখা রয়েছে ১৩ টাকা। কিন্তু আমাদেরকে ১৬ টাকা পাইকারি দরে আলু কিনতে হয়। এরপর ভ্যানভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রতি কেজিতে আরও ১ টাকা যোগ হয়। আমরা ২০-২২ টাকা দরে বিক্রি করি। এর কম হলে আমাদের পোশায় না। একশতে ১০ টাকা লাভ না করলে আমরা চলব কীভাবে?’

তালিকায় ধার্যকৃত মূল্য কমের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না জানতে চাইলে একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের লোকেরা বলেছে, ম্যাজিস্ট্রেট বা মেয়র বাজার পরিদর্শনে আসলে তালিকার দামে বিক্রি করতে, অন্যসময় ইচ্ছামতো বিক্রি করতে। তাই আমরা সেভাবেই করছি।’

ডিজিটাল বোর্ড বসানোর বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, যে বোর্ডই হোক, যেই দরে বিক্রি করলে তাদের লাভ হবে, সে দরেই তারা বিক্রি করবেন। যে দামে তারা পণ্য কিনতেও পারেন না, বোর্ডে সে রকম দাম লিখে রাখলে লাভ করা যাবে না।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার বলেন, ‘ওদের অনেক কথাই থাকবে। আমরা কৃষিপণ্য যাচাই করেই তালিকায় মূল্য নির্ধারণ করে থাকি।’

ডিজিটাল মূল্য তালিকার বিষয়ে আশাবাদী কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনকার মূল্য তালিকাগুলো ক্রেতাদের চোখে পড়ে না। ডিজিটাল বোর্ড হলে চোখে পড়বে এবং তারা মূল্যের ব্যাপারে সচেতন হতে পারবে।’ বিক্রেতাদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তালিকার মূল্য যদি কম হয়, তাহলে তাদেরকে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বসতে হবে। করপোরেশনের লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করতে হলে নির্ধারিত দামেই পণ্য বিক্রি করতে হবে; নইলে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।’ অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার জন্য ক্রেতাদেরও দায় আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ক্রেতাদেরও দায়িত্ব বিক্রেতাদের নির্ধারিত মূল্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া ও সচেতন থাকা।