সুইজারল্যান্ডের দাভোসে সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের যে সভা হয়ে গেল তাতে বিশ্বের ধনীরা বসেছিলেন বিদ্যমান ব্যবস্থাকে রক্ষার যাবতীয় কৌশল নির্ধারণে। অতীতে তাদের মধ্যে এই ব্যবস্থার প্রতি যে আত্মবিশ্বাস এবং আস্থা কাজ করত তা এবার যেন অনেকটা মøান হয়ে গেছে। অথচ মাত্র আড়াই-তিন দশক আগেও দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। বার্লিন দেয়ালের পতনের পর পুঁজিবাদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে বলে তারা উল্লসিত ছিল। সমাজতন্ত্রের যে ভূত সারা বিশ্বকে দাবড়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল তাকে চিরতরে নামানো গেছে বলে তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। তাদেরই একজন তাত্ত্বিক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তো তাত্ত্বিক ভিত্তিই নির্মাণ করে ফেললেন যেÑ ‘পশ্চিমা উদারনৈতিক পুঁজিবাদই শেষ কথা।’ কিন্তু ২০০৭ এর অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হওয়ার পর তাদের এই চওড়া হাসি মøান হতে হতে আজ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। সেই ফুকুয়ামাও এখন পুঁজিবাদের পরিসমাপ্তির আশঙ্কা করলেন তার লেখার মাধ্যমে।
২০০৮ সালের পর থেকে যে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়েছে, তা এখনো বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। বিশ্ব অর্থনীতিতে কোনো ‘প্রকৃত পুনরুদ্ধার’ সম্ভব হয়নি এবং এখন আমরা আরেকটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি হয়েছি। এখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে, কেননা অর্থনীতিকে মন্দা থেকে উদ্ধার করার জন্য যত কৌশল ছিল তার সবটাই ব্যবহৃত হয়ে গেছে, বাকি নেই আর কোনো উপায়। এবার দাভোসে যেন সেই হতাশাই উচ্চারিত হলো। ফিনান্সিয়াল টাইমসকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ কেনেথ রগফ সেই কথাই শোনালেনÑ ‘এরকম নীরস দাভোসের অর্থনৈতিক সভা আমি এর আগে কখনো দেখিনি। সাধারণত, প্রতিবারই একটা না একটা তারকা দেশ কিংবা তারকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু, এই বছর এরকম কিছুই দেখলাম না।’
দাভোসে যারা অংশগ্রহণ করেছেন তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গত দুই বছরের যে প্রবৃদ্ধি, তা স্থিতিশীল পুনরুদ্ধারের জন্য যা দরকার তা থেকে বহু দূরে। শুধুমাত্র ট্রাম্প যখন বড় বড় করপোরেশনকে অর্থের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন তখন তা কোনো রকমে হালে পানি পেয়েছিল। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার বাড়ার পরিমাণ খুবই কমে গেছে। গত বছরের অক্টোবরের আইএমএফ যে ৩ দশমিক ৭ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছিল তার চেয়ে কমে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশ্ব বাণিজ্যে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল সংস্থাটি ২০১৮ সালে। এখন তা কমে হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০০০ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত বার্ষিক প্রবৃদ্ধির গড় হার যেখানে ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে তা ২০১০ থেকে ২০১৯-এ কমে হয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। গত আট বছর ধরে ব্রাজিল, চীন, রাশিয়া, জার্মানি, জাপান এবং ব্রিটেনের মতো বৃহৎ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও খুবই শ্লথগতিতে হচ্ছে। আর ইতালির মতো অন্য দেশগুলো এরইমধ্যে মন্দার মধ্যে চলে গিয়েছে।
এর নেপথ্যে অন্যতম যে কারণটি কাজ করছে তাহলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আমানতকে ব্যয়বহুল করে তোলা। বিগত বছরগুলোতে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক, ফেডারেল রিজার্ভ এবং ব্যাংক অফ জাপান তাদের আর্থিক নীতিগুলোকে খুব কঠোর করেছে। যদি এটা বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হয়, তারপরেও এটা মন্দা প্রতিহিত করার পক্ষে খুবই ক্ষুদ্র সমন্বয়। বাস্তবতা হলো, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কোনো ছোট ধরনের বা স্বল্পমেয়াদের মন্দাকে মোকাবেলা করছে না, তারা একটা বড় ধরনের সংগঠিত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ব্যবস্থাটি অতীতে যেমন উৎপাদন শক্তিকে উন্নত করে যুগের পর যুগ টিকে ছিল তা এখন আর পারছে না।
এবারের মন্দা শুরু হওয়ার পর উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে বিনিয়োগ খুবই কমে গিয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে উৎপাদনশীলতায়। ১৯৭০ এর দশকের প্রথম সাত বছরে দ্য অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা ‘ওইসিডি’ভুক্ত দেশগুলোর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার ছিল ২৫ শতাংশ। পরবর্তী সময় থেকে ২০০৭ পর্যন্ত এই হার ছিল ২১ শতাংশ। কিন্তু ২০০৭ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এই হার কমে হয়েছে কেবল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। শ্রমের উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি ১৯৭০ থেকে ২০০৬ এর মধ্যে কেবল দুই বছর ১ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে ছিল। সেই দুইটি বছর হলো ১৯৮০ এবং ১৯৮২। কিন্তু ২০০৬ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তা একবারই ১ দশমিক ৫ শতাংশকে ছাড়িয়েছে, তা ২০১০ সালে।
বুর্জোয়ারা এই ধরনের সংকটের সময় শ্রমজীবী জনগণের ওপর শোষণের মাত্রা তীব্র করে। তারা তাদের মজুরি কমিয়ে দেয় এবং কর্মপরিবেশের ওপর আক্রমণ হানে। শুধু তাই নয়, করপোরেশনগুলোকে বাড়তি কর দিতেও বাধ্য করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে তাদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য এই ধরনের চেষ্টা সত্ত্বেও বিনিয়োগের হার কমে গিয়েছে। ১৯৭০ এর দশকে যেখানে স্থূল পুঁজি গঠন প্রক্রিয়ার হার ২৬ শতাংশের বেশি ছিল এখন তা ২১ শতাংশে নেমে গিয়েছে।
অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে, ভোগ ছাড়া কেউ পুঁজিপতিদের উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করবে না। ১৯৮০, ১৯৯০ এবং ২০০০ এর দশকে তারা যেহেতু শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমিয়ে দিয়েছে তাই তারা আরেক ধরনের ব্যবস্থা চালু করেছে। সেটা হলো ঋণ। ১৯৬০ সালে বিশ্বের জিডিপির প্রায় ৯০ শতাংশ ছিল ঋণ। ১৯৯০ সালে জিডিপিতে সারা বিশ্বের ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১৬০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে তা ১৮০ শতাংশ। ২০০৭ সালে বিশ্বের ঋণের হার বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৯০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে তা ২৫০ শতাংশ। ঋণের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো তা ফেরত দিতে হয় এবং তা সুদসহ ফেরত দিতে হয়। সুদ দেওয়ার কারণে ভোক্তার ভোগের ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। তখন ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কিংবা কোম্পানি বা সরকারের বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে আরও বাড়তি ঋণ নিতে হয়। অর্থনীতিতে যদি অপ্রতুল প্রবৃদ্ধি থাকে তাহলে এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। বাড়তি ঋণ বাড়তি সুদ সৃষ্টি করে এবং এটা একটা দুষ্টচক্রে পরিণত হয়। আর এর ফলে ‘বুদবুদ অর্থনীতির’ জন্ম হয় যা বিশ্বকে মন্দার মুখোমুখি করে।
বিশ্বব্যাপী এই অর্থনৈতিক মন্দার ফলে যে ধরনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অভ্যুদয় ঘটছে তা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। এমনকি আইএমএফও বলছে যে, রাজনৈতিক ঝুঁকির ফলে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি অর্থনীতিতেও সৃষ্টি হচ্ছে। শ্রমজীবী জনগণ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে কর্মচ্যুতি, লে-অফ এবং আক্রমণের ফলে যে অসন্তোষ ধূমায়িত হচ্ছে তা যে কোনো সময়ে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কোথাও কোথাও একে তীব্র আকারে প্রকাশিত হতেও দেখা যাচ্ছে। অনেকেই আবার দক্ষিণপন্থা, সংরক্ষণবাদিতা, জনতুষ্টিমূলক সরকার ইত্যাদি প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে বেছে নিচ্ছে। কিন্তু সেটা কোনো সমাধান দিচ্ছে না। কেননা মার্কস-এঙ্গেলস যেমন কমিউনিস্ট ইশতেহারে বুর্জোয়া সরকারকে ‘সমগ্র বুর্জোয়াদের সাধারণ স্বার্থরক্ষার কমিটি’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেনÑ এই শক্তিগুলোও তার ব্যতিক্রম নয়।
পরিশেষে বলা যায়, এর পরে বিশ্বে যে অর্থনৈতিক মন্দা আসছে তা ২০০৮-০৯ এর চেয়ে আরও ভয়াবহ ও তীব্র হবে। এর ফলে সামাজিক অস্থিতিশীলতা এবং জনগণের অসন্তোষ আরও বাড়বে বৈ কমবে না।
লেখক : সাংবাদিক