ঘটনা পরম্পরার এই মিল কি নেহাতই কাকতালীয়? এ প্রশ্ন ঘিরে চর্চা শুরু হয়েছে বাংলার রাজনৈতিক মহলে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গেরুয়া বাহিনীর রোড শো ঘিরে শহর কলকাতার বইপাড়ায় তুলকালাম হলো, আক্রান্ত হলো দুই ঐতিহ্যশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যাসাগর কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে দুষ্কৃতীরা টুকরো টুকরো করে ভাঙল বাংলা বর্ণপরিচয়ের স্রষ্টার আবক্ষ মূর্তি। গত বুধবার সকালে দিল্লিতে বসে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার দায় শুধু তৃণমূলের ওপরই চাপালেন না, সেই সঙ্গে খোদ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেই তৃণমূলের হয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ জানিয়ে দিলেন। বললেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উসকানিমূলক মন্তব্য, রাজ্যে লাগাতার সন্ত্রাস হওয়া সত্ত্বেও কমিশন নীরব দর্শক।’ এর কয়েক ঘণ্টা পরই, সন্ধ্যায় অমিত-কথিত ‘নীরবতা’ ভেঙে সক্রিয় হলো কমিশন।
ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ ধারায় প্রাপ্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে রবিবারের শেষ দফা নির্বাচনের আগে বাংলায় প্রচারের সময় কাটছাঁট করল কমিশন। পর্যবেক্ষণ মহলের বক্তব্য, ৩২৪ ধারা প্রয়োগের এই ঘটনা গোটা দেশেই নজিরবিহীন। যে ভোটের প্রচার শেষ হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার বিকেল ৫টায়, কমিশনের নির্দেশে তাতে যবনিকা পড়ল বৃহস্পতিবার। তবে বিকেলে নয়, রাত ১০টায়। কমিশন জানাল, বাংলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা ভেবে প্রচারের সময় ছাঁটা হলো ১৯ ঘণ্টা। তবে ১৯ কেন? ২৪ ঘণ্টা নয় কেন? এ প্রশ্নের জবাব মেলেনি কমিশনের তরফে। ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবশ্য অভিযোগ, বৃহস্পতিবার বাংলায় নরেন্দ্র মোদিকে সভা করার সুযোগ করে দিতেই কমিশনের এই সিদ্ধান্ত। এদিন মোদির দু’টো সভা ছিল বিকেল ৫টায় মথুরাপুর এবং সন্ধ্যে সাড়ে ৬টায় দমদমে। মমতার অভিযোগ, মোদি-শাহর নির্দেশেই কমিশনের এই ‘অসাংবিধানিক’ অনৈতিক ও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট পদক্ষেপ।
একই সঙ্গে কমিশন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবের পদ থেকে অত্রি ভট্টাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। মুখ্যমন্ত্রীর কাছের মানুষ বলে সুবিদিত রাজ্য পুলিশের এডিজি সিআইডি রাজীব কুমারকেও রাজ্য থেকে তুলে নিয়ে দিল্লির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে তলব করা হলো। কমিশনের এই যুগল নির্দেশনামায় সপ্তম তথা শেষ দফার নির্বাচনের ঠিক আগে চরমে পৌঁছেছে রাজনৈতিক উত্তাপের পারদ। বস্তুত, ভোটের ৭২ ঘণ্টা আগে কমিশনের এই ‘অতিসক্রিয়তাকে’ ভালো চোখে দেখছেন না বামপন্থিরাও। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের ধারণা, গোটা দেশের সামনে বাংলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে কত ভয়ংকর, এ রাজ্যে বিজেপিকে যে কী সাংঘাতিক সহিংস প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে, তা প্রমাণ করার জন্যই সুপরিকল্পিতভাবে এই পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হলো পরিস্থিতিকে। ভোট নাট্যের পঞ্চম অঙ্কের শেষ দৃশ্যে আরও কী চমক অপেক্ষা করে আছে, তা ভেবেই শঙ্কিত পর্যবেক্ষণ মহল, রাজ্যের সাধারণ মানুষও।
সপ্তম তথা শেষ দফায় বাংলার ৯ লোকসভা কেন্দ্রে ভোট। দমদম, বারাসত, বসিরহাট, জয়নগর, মথুরাপুর, ডায়মন্ড হারবার, যাদবপুর, কলকাতা দক্ষিণ ও কলকাতা উত্তরেও উত্তেজনার পারদ চড়েছে সপ্তমে। বলা বাহুল্য, এই উত্তেজনার আঁচে ঘৃতাহুতি দিয়েছে অমিত শাহর রোড শো এবং তৎপরবর্তী কমিশনের নজিরবিহীন নির্দেশনামা। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব অত্রি ভট্টাচার্য কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে, কুইক রেসপন্ন চিনে রাজ্য পুলিশের আধিকারিকদের শামিল করার আর্জি জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছে। তার বক্তব্য ছিল, আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার দায় তো কমিশনের সঙ্গে রাজ্য প্রশাসনেরও। এর ৪৮ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ‘কমিশনের কাজে বাধা সৃষ্টির’ দায়ে সরতে হলো অত্রিকে। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ রাজীব কুমারকে বাংলায় রাখারই ঝুঁকি নেয়নি কমিশন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারিই রাজীব কুমারকে কলকাতা পুলিশ কমিশনারের পদ থেকে সিআইডির এডিজি পদে বদলি করা হয়েছিল, যে পদের সঙ্গে চলতি নির্বাচনের কোনো প্রত্যক্ষ সংশ্রব নেই। তবু তাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো দিল্লিতে। পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, সারদা তদন্ত নিয়ে সিবিআইয়ের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া রাজীব কুমারকে রাজ্য থেকে তুলে নিয়ে মমতার রাজ্য প্রশাসনের মেকানিজমটাকেই পঙ্গু করে দেওয়া হলো শেষ দফার নির্বাচনের ঠিক আগে।
তবে ভোটের কথা নয়, এখন বাংলার মানুষের মুখে-মুখে ফিরছে ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনা। এ ঘটনায় বিজেপি নিজেদের দায় অস্বীকার করতে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে এক একঝাঁক নেতা-মন্ত্রীকে। সক্রিয় হয়ে উঠেছে দলের সোশ্যাল মিডিয়া সেল। তবু এড়ানো যাচ্ছে না দায়। ওইদিন গেরুয়া বাহিনীর মিছিলে এত হিন্দি ভাষার ফুলঝুরি যারা ফোটাচ্ছিল, তারা কি এ রাজ্যেরই লোক? কোনো রাজনৈতিক নেতার ভাষ্য নয়, এই প্রশ্ন তুলছেন বাংলার সুশীল সমাজ। বাঙালি-অবাঙালির তত্ত্ব উঠে আসছে। এখানকার বিজেপির ভাবমূর্তি প্রকরণটা বড় বেশি অবাঙালি! এই ধারণাকে ধামাচাপা দিতেই দিন দুয়েক আগের এক সাক্ষাৎকারে অমিত শাহকে বলতে হয়েছে, ‘বাংলায় বিজেপি সরকার গড়লে মুখ্যমন্ত্রী কোনও বাঙালিই হবেন, অবাঙালি নয়।’ বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ বলছেন, বিদ্যাসাগর ভূলুণ্ঠিত হয়ে বাঙালির সেই আইডেন্টিটিটাই ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন। হিন্দু-মুসলিম বিভেদরেখা নয়, অপমানিত হয়েছেন ‘বাঙালির বিদ্যাসাগর।’
কেমন ছিল মঙ্গলবার সাঁঝবেলার সেই মিছিলের চেহারা। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সেমন্তী ঘোষ বলেছেন, ‘আমাদের চেনা পরিচিত রাজনৈতিক গু-ামির থেকে এ অনেক, অনেক আলাদা জাতের হিংস্রতা।’ এই বিশেষ জাতের হিংস্রতার বর্ণপরিচয় কী ঘটে গেল ওই অভিশপ্ত সন্ধ্যাতেই ভাবাচ্ছে বাংলা সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র শহর কলকাতাকে। ভোটের ফল কী হবে সেই জল্পনার চেয়েও আরও বড় হয়ে ছড়াচ্ছে অনাগত অচেনা ভবিষ্যতের চোরা আশঙ্কা। হাটে-বাজারে, ট্রাকে-বাসে, অনুষ্ঠান বাড়ির ভিড়ে বিদ্যাসাগরের অমর্যাদার প্রসঙ্গ ক্ষণে ক্ষণে উসকে দিচ্ছে এই গুঞ্জন।