জাবির শৃঙ্খলা বিধিতে ‘৫৭ ধারার আছর’

গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখির ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করে ছাত্রছাত্রী শৃঙ্খলা বিধিতে নতুন ধারা সংযোজন করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক, অ্যাকটিভিস্ট ও শিক্ষকরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারার সঙ্গে তুলনীয় দুটি ধারার সংযোজনে ক্যাম্পাসে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও মুক্ত সাংবাদিকতা চর্চা বাধার সম্মুখীন হবে। গত ৫ এপ্রিল বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাদেশ হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে ধারা দুটি। হালনাগাদকৃত অধ্যাদেশের ৫-এর (ঞ) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনও ছাত্র/ছাত্রী অসত্য এবং তথ্য বিকৃত করে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কোনও সংবাদ বা প্রতিবেদন স্থানীয়/জাতীয়/আন্তর্জাতিক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমে/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ/প্রচার করা বা উক্ত কাজে সহযোগিতা করতে পারবে না।’

৫-এর (থ) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনও ছাত্র/ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও ছাত্র/ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীর উদ্দেশে টেলিফোন, মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনও অশ্লীল বার্তা বা অসৌজন্যমূলক বার্তা প্রেরণ অথবা উত্ত্যক্ত করবে না।’

সংশোধিত বিধিতে বলা হয়, ধারা দুটির ব্যত্যয় ঘটলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের চোখে ‘অসদাচরণ’ বলে গণ্য হবে। এজন্য লঘু শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, সতর্কীকরণ এবং গুরু শাস্তি হিসেবে আজীবন বহিষ্কার, বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার, সাময়িক বহিষ্কার ও পাঁচ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে যেকোনো পরিমাণ জরিমানা করা হবে।

জাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। তাই এর অভ্যন্তরে কী ঘটছে তা জানবার অধিকার জনমানুষের রয়েছে। এ ধরনের আইন প্রণয়ন সেই স্বচ্ছতার পথে পরোক্ষভাবে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। সমাজের অপরাপর প্রতিষ্ঠানের মতো এখানে যখন অন্যায় ঘটে, সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যদি কোনো ছাত্রছাত্রী প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে খোঁজখবর করতে চান, কিংবা পত্রিকায় কোনো কিছু লেখেন, তাকে এ ধরনের আইনে শাস্তি দেওয়ার, থামিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা রয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রে ভিন্নমত দমনের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, এই ধরনের আইন প্রণয়ন তারই সম্প্রসারণ বলে মনে করি।’

জাবি সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান বলেন, ‘স্পষ্টত আমরা এখানে কালো আইন ৫৭ ধারার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। অসত্য, বিকৃত, অশ্লীল, অসৌজন্যতা ইত্যাদি কে নির্ধারণ করবে? স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসন নিজের স্বার্থে এগুলো মর্জিমত নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী আইন প্রয়োগ করবে।’ এদিকে ধারা দুটি সংযোজনের প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট।

উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আমির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন বর্ষের প্রবেশিকা অনুষ্ঠান সামনে রেখে তাড়াহুড়া করে শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে সংশোধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পক্ষের আপত্তি থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান হতে পারে।’