উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সুনির্দিষ্ট কারণ দেখাতে না পারলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি লভ্যাংশ হিসেবে বোনাস শেয়ার ইস্যু করতে পারবে না। বোনাস শেয়ার ঘোষণার বিষয়টি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে বোনাস শেয়ার ঘোষণার কারণ ও এর বিপরীতে রক্ষিত অর্থ ব্যবহারের খাত উল্লেখ করতে হবে। গতকাল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নিয়মিত কমিশন সভায় বোনাস শেয়ার ঘোষণায় এমন শর্তারোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা নোটিফিকেশন আকারে শিগগিরই জারি করা হবে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রায় অর্ধেকই লভ্যাংশ হিসেবে প্রায় প্রতি বছরই বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে আসছে। এই বোনাসের অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, কোম্পানিগুলো সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করে না। আবার বছর বছর বোনাস ঘোষণা করলেও কোম্পানির আয়ে এর কোনো প্রভাব দেখা যায় না। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বাজার সংশ্লিষ্টরা বোনাস ঘোষণার অর্থ ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট কারণ জানানোর দাবি জানালেও কোম্পানিগুলো তা উপেক্ষা করে আসছে। সম্প্রতি তারল্য সংকটের কারণে বোনাস শেয়ার ইস্যুর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হলে এসইসি এ পদক্ষেপ নেয়। কোম্পানিগুলো বোনাস ইস্যু করায় শেয়ার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে শেয়ারপ্রতি আয়ও (ইপিএস) কমে যাচ্ছে, যা শেয়ারের দরও কমিয়ে দিচ্ছে। যদি বোনাসের পরিবর্তে নগদ লভ্যাংশ প্রদান করা হয় পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়তে তা ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এসইসির গতকালের কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে সম্প্রসারণ, সুষমকরণ, আধুনিকীকরণ, পুনর্গঠন ও বিস্তার, কোম্পানির গুণগতমানের উন্নয়ন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছাড়া তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি লভ্যাংশ হিসেবে বোনাস শেয়ার ঘোষণা করতে পারবে না।
২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৫৪টি কোম্পানি বোনাস শেয়ার ঘোষণার মাধ্যমে ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা মূলধন উত্তোলন করে। এ অর্থ কোম্পানিগুলো কোথায় বিনিয়োগ করেছে, শেয়ারহোল্ডারদের তা জানায়নি। এতে বোনাস ঘোষণা করা কোম্পানিগুলোর শেয়ার সংখ্যা বাড়ে ৩৫৫ কোটি ৭৬ লাখ। একই সময়ে ১৭৯টি কোম্পানি ২ শতাংশ থেকে ৭৯০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। ২০১৭ সালেও ১৪২টি কোম্পানি ২৭৭ কোটি ৮০ লাখ বোনাস ইস্যুর মাধ্যমে ২ হাজার ৭৯১ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলন করে। এ সময় ১৮৭টি কোম্পানি নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। আর ২০১৬ সালে ১২৬টি কোম্পানি ২৫০ কোটি ৮০ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধন উত্তোলন করেছিল।
তালিকাভুক্ত কোম্পানি ছাড়াও মিউচুয়াল ফান্ডও রি-ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট নামে বোনাস ঘোষণা করে থাকে। বোনাস ইস্যুতে এসইসির শর্তারোপের ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে বোনাস ইস্যুর প্রবণতা কমবে। এতে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও প্রকাশ পাবে।
বোনাস শেয়ার ঘোষণায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে বস্ত্র খাত। এ খাতের ৫৪ কোম্পানির মধ্যে ২৯টি ২০১৮ সালে লভ্যাংশ হিসেবে বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে। কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা কোনো উন্নয়নমূলক কাজের প্রয়োজন না থাকলেও বীমা খাতের ২৪টি কোম্পানি গত বছর বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে। অবশ্য মূলধন ভিত্তি শক্তিশালীকরণের প্রয়োজনীয়তায় কিংবা অর্থ সংকট কাটাতে ব্যাংক কোম্পানিগুলোও বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে থাকে। গত বছর তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের মধ্যে ২০টি লভ্যাংশ হিসেবে শেয়ারহোল্ডারদের বোনাস শেয়ার দিয়েছে। চলতি বছরও এমন প্রবণতা দেখা গেছে। যদিও অধিকাংশ ব্যাংকই এবার নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তবে পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধির বাধ্যবাধকতায় ডাচ-বাংলা ব্যাংক এবার ১৫০ শতাংশ বোনাস শেয়ার ঘোষণা করেছে। ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতের ১২টি কোম্পানিও গত বছর বোনাস ঘোষণা করে।
তালিকাভুক্তির পর অধিকাংশ সময় বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ নগদ লভ্যাংশ দিয়ে এলেও এবার নগদের পাশাপাশি ২০০ শতাংশ বোনাস শেয়ারও দিয়েছে। এর আগে কোম্পানিটি তিন বার বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। বোনাসের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হবে, এ প্রতিষ্ঠানও সেটা জানায়নি।
২০১৮ সালে প্রকৌশল খাতের ২৩টি কোম্পানি বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে মূলধন উত্তোলন করেছে। এর বাইরে খাদ্য ও অনুষঙ্গ খাতের ৬টি, জ¦ালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ৭টি, ফার্মাসিউটিক্যালস ১৪টি, সেবা ও নির্মাণ, সিমেন্ট, তথ্যপ্রযুক্তি, ট্যানারি, সিরামিক ও বিবিধ খাতের বিভিন্ন কোম্পানি লভ্যাংশ হিসেবে বোনাস ঘোষণা করে।