প্রশাসনের উদ্যোগে সরাসরি প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা শুরু এবং চাল আমদানিতে শুল্ক দ্বিগুণের ঘোষণায় কৃষকদের মধ্যে দৃশ্যত স্বস্তি ফিরেছে। আগামীতে সরকার যেন ধান-চাল সংগ্রহের পরিমাণ বাড়িয়ে তিনগুণ করে সে দাবিও জানিয়েছেন কৃষকরা।
গত তিন দিন নওগাঁ, কুষ্টিয়া, জয়পুরহাট, নাটোরসহ কয়েকটি জেলার জেলা প্রশাসকরা কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার উদ্যোগ নেওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টেছে ওইসব এলাকায়। জয়পুরহাটের কার্ডধারী কৃষক হাসম বেপারী গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিসি স্যার যখন ধান কিনতে আসলেন তখনই আমরা খুশি হয়েছি। জানি যে খাদ্যের লোকরা এবার নামবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনলে আমরা দুইটা দাম পাই। আর মিলাররাও আমাদের ঠকাতে পারবে না। আমরা চাষাবাষা, আমাদের ধান যদি ভালো বিক্রি হয় আমরা খুশি। আমরা তো ব্যবসা করি না।’
এদিকে দেশে উৎপাদন বেশি হওয়ার পরও চাল আমদানি অব্যাহত থাকায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ছিল, উৎপাদন বেশি করেও তারা ধান-চাল বিক্রি করতে পারবে না। কারণ আমদানি শুল্ক কম হলে ব্যবসায়ীরা দেশের কৃষকদের কাছ থেকে বেশি দামে না কিনে বাইরে থেকে চাল আনবে আর কৃষক না খেয়ে মারা যাবে। তবে চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক দ্বিগুণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
সিরাজগঞ্জ ভেন্না হাটের কৃষক রমিজ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ থেকে (বুধবার) আমাদের মনটা খুশি। কারণ সারা দেশেই ধান কেনা শুরু হয়েছে। কার্ড দেখে দেখে সরকারি লোক ধান কিনছে। বিদেশ থেকে চাল আনার খরচাও বাড়াইছে। আমরা খুশি। তবে আমরা চাই সব বছরই যেন সরকার কৃষকদের কার্ড দেখে ধান-চাল নেয়। আর ধান রাখার জন্য যদি সরকার জেলায় একটা করে সাইলো করে দেয় এবং বেশি বেশি ধান-চাল নেয়, তা হলে আমাদের খুব উপকার হয়।’
বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে এবং প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গতকাল থেকে দেশের ধান উৎপাদনের সব জেলা থেকে ধান সংগ্রহ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি মজুরির টাকা সংগ্রহ করতে না পেরে ক্ষেতেই ধান রেখে দেওয়ার বিষয়েও জেলা প্রশাসক, ছাত্র, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে আসায় কৃষকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, গতকাল জয়পুরহাট ও পিরোজপুরে ধান ক্রয় সংগ্রহ অভিযানের নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসকরা। এ ছাড়া গত মঙ্গলবার নাটের, চুয়াডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, মেহেরপুরের জেলা প্রশাসকরা ধান ক্রয় কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। তার আগের দিন নড়াইল-২ আসনের সাংসদ মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার নির্দেশে সরাসরি কৃষকের ধান ক্রয়ের উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা। এ ছাড়া অনেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ধান ক্রয় কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন।
গতকাল জয়পুরহাটে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকির হোসেন। এ সময় সরাসরি ধান বিক্রি করতে পেরে কৃষকরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। একই দিন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ নাজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও হাটে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করেন। সে সময় তিনি বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, সুখী হবে বাংলাদেশ। এ জন্যই আমরা কৃষকের পাশে থেকে কাজ করছি।’ এর আগে গত মঙ্গলবার চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় দরিদ্র কৃষকদের সঙ্গে ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ করেন জেলা প্রশাসক গোপাল চন্দ্র দাস। বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাও তার সঙ্গে এই কাজ করেছেন। কৃষকদের সঙ্গে থাকার বার্তা দিয়ে এই কাজ করেন তিনি। সেদিন মেহেরপুর সদরে সরকারি খাদ্য গুদামে ফিতা কেটে সরাসরি কৃষকদের কাছে ধান ক্রয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. আতাউল গণি। সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ায় এক কৃষক আবেগাপ্লুত হয়ে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) জড়িয়ে ধরে ভালোবাসা প্রকাশ করেন। গ্রামে গিয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সরকারি মূল্যে ধান কিনেছেন নাটোরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. শাহরিয়াজ। মঙ্গলবার দুপুরে নাটোর সদর উপজেলার কাফুরিয়া ইউনিয়নের থান্দারপাড়া গ্রামে গিয়ে তিনি ধান কেনেন।
এ ছাড়া গতকাল গোপালগঞ্জ, মাগুরা, নওগাঁয় বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান সংগ্রহের প্রত্যয়ন দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। ঠাকুরগাঁওয়ের মঘি ইউনিয়নের কৃষক আলতাফ হোসেন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে তার জমিতে ২০০ মণের ওপর ধান হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় সরকারি খাদ্য গুদাম নামেমাত্র ধান ক্রয় করছে।’ তিনি সরকারিভাকে কৃষকদের কাছ থেকে আরও বেশি ধান কেনার দাবি জানান।
গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক প্রজ্ঞাপনে চাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এতে বলা হয়, চাল আমদানিতে এখন ৫৫ শতাংশ কর দিতে হবে। ফলে আমদানি করা চালের দাম বাড়বে এবং আমদানিকারকরা নিরুৎসাহিত হবেন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চাল আমদানির ক্ষেত্রে রেগুলেটরি ডিউটি ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এই শুল্ক আগে ৩ শতাংশ ছিল। এ ছাড়াও চালের ওপর ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হয়েছে। এর বাইরে, আগের ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। আজ বুধবার (গতকাল) থেকেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তের ফলে, চাল আমদানির ক্ষেত্রে পূর্বের ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি ২৫ শতাংশ ও আগাম ৫ শতাংশ আয়কর মিলিয়ে এখন মোট ৫৫ শতাংশ করভার প্রযোজ্য হবে।
এ ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল থেকে সারা দেশে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা শুরু হয়েছে। এবার হয়তো সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানো যাবে না গুদাম সংকটের কারণে। তবে সরকার আগামীতে কৃষকদের মজুর এবং উৎপাদন খরচ আরও কমিয়ে আনতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াবে এবং ধান-চালের সংগ্রহের পরিমাণও বাড়াবে। সেই সঙ্গে কৃষকদের লাভবান করতে আমরা প্রয়োজনে রপ্তানিতে জোর দেব। তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে কৃষকদের হতাশা দেখে সরকার দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশে চলতি বছর আমন ও আউশের উৎপাদন বেশি হয়েছে এবং এরপর বোরো ধানের উৎপাদনও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। আর এই ফলন বেশি হওয়ার কারণে ধানের দাম আগের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল তিনি নিজেই কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে গিয়েছেন। তাকে দেখে কৃষকরা কেঁদেছেন। তিনি বলেন, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন সবসময় তৎপর থাকবে। তিনি ও তার কর্মকর্তারা কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার তদারকি করবেন। কোনো ব্যবসায়ী কৃষক সেজে ধান বিক্রির চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে। শিগগির কৃষকদের কৃষিকার্ড ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ব্যাংকে তাগিদ দেওয়া হবে। তবে প্রান্তিক অনেক কৃষকের কৃষিকার্ড ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকায় ধান দিতে পারছে না।
রাজশাহীর কৃষক মজিবর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিসি উপস্থিত থেকে ধান কেনার কথা শুনে তিনি ১৫ মণ ধান বিক্রি করেছেন। সরকার নির্ধারিত মূল্যে তিনি ধান বিক্রি করেছেন। প্রতি মণ ধানের দাম পেয়েছেন ১ হাজার ৪০ টাকা। তিনি বলেন, আমার মতো সারা দেশের ধানচাষিরা বাজারে ধানের এমন মূল্য পেলে উপকৃত হতো। সব জায়গায় যদি এভাবে ধান কেনা হয়, তা হলে চাষিরা কিছুটা হলেও উপকার পাবে।
সাবেক কৃষি সচিব শ্যামল কান্তি নাগ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন আমাদের উৎপাদন বেড়েছে। খোলাবাজারে আমদানির ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব নিরুৎসাহিত করা যায় সেটি দেখতে হবে। চাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর বিষয়টি ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন তিনি। এখন কৃষকদের কার্ড হালনাগাদ করতে হবে। মিল মালিক ও ফড়িয়াদের হাত থেকে কৃষকদের না বাঁচালে এখন যে উদ্বৃত্ত উৎপাদন দেখছি তা উল্টো হবে। সেচ এবং বিদ্যুতের সুবিধা সরাসরি কৃষকের হাতে যেন আসে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের ধান সংগ্রহ অভিযান আরও আগে শুরু হলে কৃষকরা উপকৃত হতো। কিন্তু ২৫ এপ্রিল থেকে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও ১৫ দিন পর শুরু হয়েছে। ১৬ মে পর্যন্ত সরকার কিনেছে মাত্র ২৮ টন। সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশি উৎপাদনের ফল সরকারকেই ঘরে তুলতে হবে। দ্রুত চাল আমদানি বন্ধ করতে হবে। তা ছাড়া সরকার যে সাড়ে ১২ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ করবে তার মধ্যে ১০ লাখ টনই ধান। ফলে এই মৌসুমে সরকার তো সরাসরি চাল নিচ্ছে না। মিলারদের কাছেই ব্যবসা চলে যাচ্ছে। তাই কৃষক এখন কোনো ফল পাচ্ছে না। কারণ সরকার তো চাল নেবে মিল-মালিকদের কাছ থেকে। তাও আরও এক মাস পর। ফলে কৃষক লাভবান হবে না। আমি মনে করি, সরকার যদি ৩০-৪০ লাখ টন ধান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিত, তা হলে কৃষক লাভবান হতো।