ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। অন্যদিকে নেহরু-গান্ধী পরিবারের মুখ কংগ্রেস-প্রধান রাহুল গান্ধীর অবস্থা ঠিক বিপরীতÑ বিধ্বস্ত, ক্ষতবিক্ষত। ভারতের অবিসংবাদিত রাজনৈতিক পরিবারের প্রধান উত্তরাধিকারী রাহুলই। তার প্রপিতামহ জওহরলাল নেহরু ছিলেন ভারতের প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী। তার দাদি ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। বাবা রাজীব গান্ধী ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী।
২০১৪ সালের নির্বাচন যদি হয়ে থাকে কংগ্রেসের যাবৎকালের সবচেয়ে খারাপ ফলের নির্বাচন, এবারের ফলাফল রাহুল গান্ধীর জন্য জোড়া আঘাত। নরেন্দ্র মোদির বিজেপির জেতা ৩০০ আসনের বিপরীতে রাহুলের কংগ্রেস জিতেছে মাত্র ৫০টির কিছু বেশি। অন্যদিকে পরিবারের পুরনো দুর্গ উত্তরপ্রদেশের আমেথিতেও হেরেছেন রাহুল। এর পরও অবশ্য তিনি পার্লামেন্টে ঢুকছেন। কারণ এবার দ্বিতীয় একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কেরালার সেই আসনটিতে জিতেছেন তিনি। তবে আমেথি ছিল মর্যাদার লড়াই। এ আসনে নির্বাচন করে রাহুলের বাবা-মা রাজীব ও সোনিয়া দুজনেই জিতেছেন। রাহুল নিজেও গত ১৫ বছর ধরে নিজের দখলে রেখেছিলেন আসনটি। কিন্তু আমেথির প্রতিটি বাড়িতে পাঠানো আবেগপূর্ণ ভাষায় লেখা চিঠিও (সম্বোধন ছিল : ‘মেরা আমেথি পরিবার’) বিজেপির প্রার্থী সাবেক অভিনেত্রী স্মৃতি ইরানির কাছে হার মানা থেকে রক্ষা করতে পারল না রাহুল গান্ধীকে। আমেথির অবস্থান উত্তরপ্রদেশের কেন্দ্রস্থলেই। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তরপ্রদেশ পরিচিত ‘রাজনীতির গ্রাউন্ড জিরো’ হিসেবে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, যে দল উত্তরপ্রদেশের ভোট জিতবে তারাই শাসন করবে ভারত।
ভারতের ১৪ জন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আটজনই (যার মধ্যে আছেন রাহুলের প্রপিতামহ, দাদি ও বাবা) উত্তরপ্রদেশের মানুষ। পার্লামেন্টের আসনসংখ্যা এ রাজ্যেই সবচেয়ে বেশি। নি¤œকক্ষ লোকসভার ৫৪৫ আসনের মধ্যে ৮০টিই উত্তরপ্রদেশে। এমনকি, গুজরাটের মানুষ নরেন্দ্র মোদিও এমপি পদে প্রথম নির্বাচন করার জন্য উত্তরপ্রদেশকে বেছে নেন। তিনি ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন রাজ্যের প্রাচীন শহর বারাণসী থেকে।
কংগ্রেস নির্বাচনে জিতবে, এমন আশা খুব বেশি লোক করেনি। তবে তারা ২০১৪ সালের চেয়ে বেশ ভালো করবে, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। এ কারণে বৃহস্পতিবারের চূড়ান্ত ফলে দলের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই স্তম্ভিত হয়েছেন। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, এটা কি গান্ধী যুগের অবসানেরই আলামত? অথবা দলের দিন ফেরানোর জন্য এর অবসান হওয়াই উচিত?
কংগ্রেস কী চাইছে?
ফলাফল চূড়ান্ত হওয়ার দিন বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন রাহুল গান্ধী। তিনি বিজেপির কাছে হার মেনে নেন। রাহুল বলেন, জনগণ তাদের রায় দিয়েছে এবং বিজেপিকে বেছে নিয়েছে। কংগ্রেস দলের পরাজয়ের জন্য তিনি সম্পূর্ণ দায়িত্বও গ্রহণ করেন। তখন পর্যন্ত আমেথিতে ভোট গোনা শেষ না হলেও (তখনো ৩ লাখ ভোট গণনা বাকি) তিনি স্মৃতি ইরানির কাছে হার স্বীকার করেন। রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আমি তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি জিতেছেন। এটা হচ্ছে গণতন্ত্র। জনগণের সিদ্ধান্তকে আমি শ্রদ্ধা করি।’ সংবাদ সম্মেলনে দলের ফলাফল কিংবা পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আর কিছু বলতে রাজি হননি রাহুল। তিনি বলেন, দলের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে এসব আলোচিত হবে। কংগ্রেসের কর্মী এবং বিজয়ী ও পরাজিত নেতাদের তিনি হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানান, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমরা কঠোর চেষ্টা করে যাব। একদিন ঠিকই জিতব আমরা।’
তবে রাহুল নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎ জয়ের যে আশ^াস দিলেন, সেদিন লক্ষেèৗয়ের কংগ্রেস অফিসে বসে থাকা গুটিকয়েক হতোদ্যম কর্মীর কাছে তা দৃশ্যত এক সুদূরের স্বপ্ন বলেই মনে হচ্ছিল। টিভিতে দলের তাবড় নেতার ধরাশায়ী হওয়ার খবর দেখে তাদের মধ্যে হতাশা ছিল সুস্পষ্ট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে স্থানীয় এক নেতা বললেন, ‘আমাদের বিশ^াসযোগ্যতা এখন খুবই কম। আমাদের অঙ্গীকারের ওপর লোকের কোনো বিশ^াস নেই। আমরা যা বলছি তা তারা বিশ^াস করছে না। মোদি সাহেব অঙ্গীকার পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু তার পরও লোকে তাকে বিশ^াস করে।’
কংগ্রেসের এই বাজে ফল রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য। বিশ্লেষকদের অনেকেই ইতিমধ্যেই দলে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, রাহুলের উচিত দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগ করা। তবে অতীতের মতো এসব আহ্বান আসছে দলের বাইরে থেকেই। তাই দলের নেতারা এটি প্রত্যাখ্যান করবেন বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে।
দিল্লিতে গুঞ্জন চলছে, রাহুল পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা মণি শংকর আয়ার বিবিসিকে বলেছেন, ‘কংগ্রেস দলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না এবং রাহুল গান্ধী পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করবে না।’
মণি শংকর আয়ার আরও বলেন, দলের এই বিরাট পরাজয়ের কারণ নেতৃত্ব নয়। ‘এর পেছনে অন্যান্য কারণ আছে, যেগুলো নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে,’ বলেন আয়ার।
লক্ষেèৗর স্থানীয় কংগ্রেস মুখপাত্র ব্রিজেন্দ্র কুমার সিং বললেন, তাদের মতে সমস্যা গান্ধী বংশ নিয়ে নয়। সমস্যা হচ্ছে দলের অন্তঃকলহ ও দুর্বল নির্বাচনী প্রচার। ব্রিজেন্দ্র কুমার বলেন, ‘দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে দুর্বলতা আছে, দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে কোন্দল, প্রচারণা শুরু করতে দেরি হয়েছে। আর উত্তর প্রদেশ ও বিহারের আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে জোট করার চেষ্টা ঠিক কাজ ছিল না, যদিও ওই জোট শেষ পর্যন্ত হয়নি।’
সুতরাং কংগ্রেস নেতৃত্ব অন্তত এখন পর্যন্ত দলের পরাজয়ের দায় রাহুল গান্ধীর ওপর চাপাচ্ছেন না। তারা দায়ী করছেন সার্বিকভাবে সংগঠন ও দলের নির্বাচনী প্রচারণা-কৌশলকে।
ব্যক্তিত্বের সংঘাত?
কংগ্রেসের অনেক বিশ্লেষক হয়তো একান্তে স্বীকার করবেন, রাহুল আসলে এক ব্যক্তিত্বের সংঘাতেই হেরেছেন, যে লড়াইয়ে তার জেতা আসলেই সম্ভব ছিল না। এ বিষয়ে সবাই একমত, কংগ্রেসের পথের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল আসলে ‘ব্র্যান্ড মোদি’।
লক্ষেèৗর ব্রিজেন্দ্র সিং যেমন বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তার গত নির্বাচনের সময়কার অনেক অঙ্গীকার পূরণ করতে ব্যর্থ হলেও তিনি এখনো বিজেপি সরকারের নীতির ব্যাপারে মানুষকে পক্ষে টানতে সক্ষম।’
রাহুল গান্ধী এবারই প্রথম নরেন্দ্র মোদির কাছে নাস্তানাবুদ হলেন না। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত গত সাধারণ নির্বাচনেই দলের যাবৎকালের সবচেয়ে খারাপ ফল করে কংগ্রেস। সেবার তারা পায় মাত্র ৪৪ আসন। মোদির বিজেপির হয় ভূমিধস বিজয়। প্রচারণায় বড় ভূমিকা রাখলেও তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দলের প্রধান হননি রাহুল। তবে নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর নেতা হিসেবে তাকে প্রায় বাতিলের খাতায় তুলে দেওয়া হয়েছিল। এরপর কংগ্রেস বেশ কয়েকটি রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনেও হেরে যায়। রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে ‘বিচ্ছিন্ন ও অগম্য’ হওয়ার অভিযোগ ওঠে। আলটপকা মন্তব্য করা আনাড়ি নেতা হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গ করা হতে থাকে তাকে।
গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্যও অনেকে নিন্দা করেছেন রাহুলের। সাধারণ পরিবার থেকে আসা নরেন্দ্র মোদি অনেকবারই বলেছেন, রাহুল শীর্ষে উঠে এসেছেন মেধার জন্য নয়, বরং পারিবারিক সম্পর্কের জোরে।
ঘরোয়া আলোচনায় কংগ্রেসের কর্মীরা রাহুলকে বর্ণনা করেন একজন ‘সাদামাটা মানুষ হিসেবে, যার মধ্যে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর ছলচাতুরী আর ধূর্তামি’ নেই। তাই, নির্বাচনের এই ফলকে ব্যক্তি রাহুল, না ‘গান্ধী ব্র্যান্ড’-এর ব্যর্থতাÑ কী হিসেবে দেখা হবে, তা একটা বড় প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক কালে বর্ণাঢ্য গান্ধী পরিবার তার কিছু ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে। বিশেষ করে, শহুরে ভোটার আর তরুণদের কাছে। এদের কাছে নেহরু ও ইন্দিরার অবদান সুদূর অতীতের বিষয়। ২০০৪ থেকে ২০১৪ এই ১০ বছরের কংগ্রেস শাসন তাদের কাছে বেশি প্রাসঙ্গিক। এই সময়ের কংগ্রেস সরকার ছিল বিতর্ক আর দুর্নীতির অভিযোগে জেরবার। এবারের নির্বাচনের ফল বলছে, কংগ্রেসের ওপর ভোটারদের আস্থা এখনো কম। আর রাহুল গান্ধী দেশের মানুষকে তার স্বপে¦র সঙ্গে যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তবে এর পরও দলের নেতাকর্মীরা রাহুলকে এই হারের জন্য দায়ী করতে রাজি হবেন না। একজন দলীয় কর্মী বললেন, রাহুলের আসলে দরকার একজন অমিত শাহ। মোদির রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে অমিতের অবদান সবারই জানা। কাজেই অতীতের কথা মাথায় রাখলে বলা যায়, দলের সবাই রাহুলের পেছনেই থাকবেন। গত দুই বছরে তার ক্যারিয়ারের উন্নতিও চোখে পড়ার মতো ছিল। ছায়ার নিচ থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতিতে অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতে তার উপস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও বেশি চৌকস। নোট বাতিল, কর্মসংস্থানহীনতা, অর্থনীতির স্থবিরতা ও ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার মতো ইস্যুতে মোদি সরকারের সমালোচনায়ও দক্ষতার পরিচয় দেন। গত ডিসেম্বরে তিনি রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও মধ্যপ্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনে দলকে জয় এনে দেন। অনেকেই বলছিলেন, রাহুল দেশের প্রাচীনতম দল কংগ্রেসকে আবার পথে ফিরিয়ে এনেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে রাহুলের ক্যারিশমাটিক বোন প্রিয়াঙ্কা উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগ দিলে মনে হচ্ছিল এবার গান্ধীরা কিছু দেখিয়েই ছাড়বে।
অনেক দিন ধরেই কংগ্রেসিদের একাংশের মত, এ রাজনৈতিক পরিবারকে বাঁচানো ‘গান্ধী’ আসলে হবেন প্রিয়াঙ্কাই। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, তিনি দলের মশাল হাতে তুলে নিতে রাজি হননি। ভাইবোন খুবই ঘনিষ্ঠ। রাহুলকে নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনায় প্রিয়াঙ্কা থাকবেন, সে সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। তবে দলে আরও বড় ভূমিকা নিয়ে ভাইকে সহায়তা করতে দেখা যেতে পারে তাকে। শেষে বলা যায়, কংগ্রেস এই হারকে দেখছে দলের ভিশনের এক সার্বিক ব্যর্থতা হিসেবে। এ ব্যর্থতা হচ্ছে আজকের ভারতের হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ব্যর্থতা। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি এই ভারতের রূপকার আর লালনকারী দুটোই।
উত্তর প্রদেশের কংগ্রেস নেতা বীরেন্দ্র মদন মনে করিয়ে দিলেন, রাহুল গান্ধী একাই হারেননি। অনেক বড় নেতাই হেরেছেন। তিনি বললেন, ‘নির্বাচন আসবে এবং যাবে। কিছু হারবেন আর কিছু জিতবেন। বিজেপি কি ১৯৮৪ সালে মাত্র দুই আসন পায়নি? তারা তো ফিরে এসেছিল। আমরাও ফিরে আসব।’ তবে পরিবর্তন আসতে হবে সেটা বলতে ভুললেন না বীরেন্দ্র মদন। বললেন, ‘নয়াদিল্লিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও রাজ্য নেতারা আগামী কয়েক দিনে আলাপ-আলোচনা করে সমস্যাটা চিহ্নিত করার চেষ্টা করবেন। এখন আত্মানুসন্ধানের সময়। সময় ভুল চিহ্নিত করার।’
লেখক : বিবিসির সাংবাদিক
(বিবিসি থেকে ভাষান্তরিত)