ভেঙে যেতে পারে তৃণমূল

এমন গণনার শহর বহুদিন দেখেনি কলকাতাবাসী। শহরের বিভিন্ন গণনা কেন্দ্রে পুলিশ আর আধাসামরিক বাহিনীর কড়া পাহারায় বৃহস্পতিবার যখন চলছে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ পর্ব, তখন অদ্ভুত সুনসান গোটা শহর। দিনভর ফাঁকা রাস্তাঘাট, পথে হাতেগোনা লোকজন, গাড়ির সংখ্যাও অবিশ^াস্যরকম কম, বন্ধ দোকানপাট। অন্যান্য দিনের সদা ব্যস্ত শিয়ালদা চত্বর থেকে শুরু করে শ্যামবাজার, হাতিবাগান, ইএম       

 বাইপাস, পার্ক সার্কাসের সেভেন ক্রসিং সর্বত্র একই ছবি। নজিরবিহীন এই নৈঃশব্দ্যও কি আগাম কোনো ঝড়ের সংকেত?

বাংলার রাজনীতিতে আরও বড় ঝড় যে আসন্ন, তার ইঙ্গিত মিলেছে লোকসভার ভোটের ফলে। টের পেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। বৃহস্পতিবার গণনা চলাকালীন সারাটা দিন মুখ খোলেননি তিনি। একের পর এক আসনে দলের ভরাডুবির মধ্যে দুপুর নাগাদ শুধু চার লাইনের একটি টুইট করেন তিনি। শুক্রবারও নীরব মমতা। শুধু জানা যায়, শনিবার নিজের কালীঘাটের বাড়িতে দলের বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছেন তিনি। উদ্দেশ্য, ভোটের এই বিরূপ ফল খতিয়ে দেখা। সেই সঙ্গে ২০২১-এ বিধানসভা ভোটের আগে পর্যন্ত দলটাকে ধরে রাখার একটা সুচিন্তিত রূপরেখা তৈরি করা।

পায়ের তলার মাটি সরছে এ কথা বুঝে নিতে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে বহু যুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানোর নজির আছে তার রাজনৈতিক জীবনে। তাই দলনেত্রীর এই লড়াকু ভাবমূর্তিকেই আঁকড়ে ধরে এই দুঃসময়ে আশার আলো জ্বালতে চাইছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা। বিপর্যয়ের চিত্রটা স্পষ্ট হয়েই ধরা পড়েছে গণনার ফাইনাল স্কোরকার্ডে : তৃণমূল ২২, বিজেপি ১৮, কংগ্রেস ২। ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে দেশজুড়ে বয়ে যাওয়া মোদি ঝড় বাংলার সীমান্তে রুখে দিয়ে তৃণমূল পেয়েছিল ৩৪ আসন। এবার হাতছাড়া হয়েছে ১২টি আসন। আর বিজেপি, গতবারের সাকুল্যে দুটি আসনের সঙ্গে এবার ঝুলিতে পুরে নিয়েছে নয় নয় করে, আরও ১৬টি আসন। এবার দুটি আসন হাতছাড়া হয়েছে কংগ্রেসেরও।

এবারের ভোটের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের মোট ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে বিজেপি লিড পেয়েছে ১২৯টিতে। তৃণমূল এগিয়ে আছে ১৫৮ বিধানসভা কেন্দ্রে এবং কংগ্রেস অবশিষ্ট ৭টিতে। বলা বাহুল্য, ২০২১-এ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে এই পরিসংখ্যান অস্বস্তিতে রাখবে রাজ্যের শাসক দলকে। সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যাজিক ফিগার ১৪৮। তবে বাংলার সম্ভাব্য পালা বদলের নাটকের শেষ দৃশ্য ২০২১ পর্যন্ত আদৌ গড়াবে কি না, তা নিয়েই সংশয় রয়েছে পর্যবেক্ষক মহলে। প্রবল গেরুয়া ঝড়ের দাপটে তৃণমূলের অন্দরে এখন সর্বনাশের আতঙ্ক। একুশের আগেই ঘর যে ভাঙবে না, এ কথা হলফ করে বলতে পারছেন না দলের কোনো নেতাই।

‘উনিশে হাফ, একুশে মাফ’Ñ ভোট প্রচারের মঞ্চ থেকে বিজেপির এই হুশিয়ারি এদিন ফের শোনা গেল বঙ্গ বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষের মুখে। তার সাফ ইঙ্গিত, বাংলা জয়ের অর্ধেক রাস্তা পার করে দিয়ে এখন চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য থাবা চাটছে গেরুয়া শিবির। চাই বাংলার মসনদ। তবে ২০২১-এ মমতা সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তর সইছে না দিলীপবাবুর দলীয় সতীর্থদের। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলায় প্রচারে এসে বলেছিলেন, অন্তত চল্লিশজন বিরোধী বিধায়ক তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। কথাটা কি প্রচারের স্বার্থে নেহাত কথার কথা? এ প্রশ্নে এদিন দিলীপ ঘোষ কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। তবু তার বক্র জবাবে ছিল আসন্ন ঝড়ের ইঙ্গিত।

বরং এ নিয়ে স্পষ্ট মন্তব্য শোনা গেছে তার দলীয় সতীর্থদের মুখে। একাধিকবার জানানো হয়েছে, ৪০ নয়, একশ তৃণমূল বিধায়ক পা বাড়িয়ে আছেন বিজেপির দিকে। সদ্য তৃণমূলত্যাগী তথা ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত বিজেপি সাংসদ অর্জুন সিং এদিন বলেন, ‘কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে। একসময় তৃণমূলেই তো ছিলাম। অনেক বন্ধু-বান্ধবই আছেন ওই দলে। তারা নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন। আর ক’টা দিন, দেখুন না কী হয়।’ অর্জুন এমন কথা জানিয়ে দিলেন, নৈহাটির তৃণমূল বিধায়ক পার্থ ভৌমিক তার বিশেষ বন্ধু, নির্বাচনে বেশ সাহায্য পেয়েছেন তার কাছ থেকে। স্থানীয় রাজনীতিতে বাহুবলী বলে নামডাক আছে অর্জুন সিংয়ের। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে তার একচ্ছত্র প্রতিপত্তি। খোদ তৃণমূল নেত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নিজে জিতেছেন, ভাটপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে জিতিয়ে নিয়েছেন পুত্র পবন সিংকে। রাজনীতিতে নবাগত পবনের কাছে ধরাশায়ী তৃণমূলের ডাকসাইটে প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র। রাজ্যের আটটি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে চারটিতেই জিতেছে বিজেপি। ভোটপ্রাপ্তির শতকরা হারে ছাড়িয়ে গেছে রাজ্যের শাসক দলকে।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে, লোকসভা নির্বাচনে ভোট প্রাপ্তির হার যদি ধরা হয় তা হলে বাংলায় বিজেপির উল্কার গতিতে উত্থানের ছবিটা আরও স্পষ্ট হবে। তৃণমূল গত নির্বাচনের চেয়ে ভোট শেয়ার ২ শতাংশ বাড়িয়েও পেয়েছে ৪৩ শতাংশ। তাদের ঠিক ঘাড়ের কাছে নিঃশ^াস ফেলছে বিজেপি। পেয়েছে ৪০ শতাংশ ভোট। ২০১৬-এর বিধানসভার নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। কট্টর দক্ষিণপন্থি গেরুয়া শিবিরের এই অগ্রগমনের পাশে বামপন্থিদের অস্তাচলের দৃশ্যটা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ৩৪ বছর বাংলা শাসনের পর রাজ্য রাজনীতিতে বামদের অস্তিত্বই এখন সংকটে। ২০১৪ থেকে ’১৯-এর নির্বাচনÑ পাঁচ বছরে তাদের ভোট শেয়ার কমেছে প্রায় ৩১ শতাংশ। বামদের ক্ষয় পুঁজি করেই কি দ্রুত উঠে আসছে বিজেপি? এই প্রশ্ন আজ অন্যতম চর্চার বিষয়। ২০১১-এ তৃণমূল বাংলায় ক্ষমতা দখলের আগে ২০০৯-এর লোকসভা ভোটে জিতেছিল ১৯টি আসন। এই নির্বাচনে বামদের আসন কমে হয়েছিল ১৫। গ্রামবাংলা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল তাদের থেকে। সেই ইতিহাসেরই কি পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে এবার। সদ্য বীরভূম কেন্দ্রে জয়ী কংগ্রেস প্রার্থী অধীর চৌধুরী এদিন এক তাৎপর্যবাহী মন্তব্য করেছেন। অন্যের ঘর ভাঙিয়ে নিজের ঘর গোছানোর রাজনীতিকে তিনি ‘পলিটিক্স অব পোচিং’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এই চোরাশিকারের রাজনীতি এতদিন তৃণমূল করেছে। এবার বিজেপি করবে।’