অভ্যন্তরীণ বিরোধের মীমাংসা না হওয়ায় বিএনপির চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলা কমিটি শিগগির হচ্ছে না। মেয়াদোত্তীর্ণ এ দুটি কমিটি গঠনে বেশ কিছু দিন ধরে প্রক্রিয়া চললেও তা অনেকটা থমকে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উভয় কমিটির থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। বিভিন্ন সময় তা সংঘাত-সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। তাই আগে এসব কোন্দল নিরসন করেই নতুন কমিটি দিতে চায় কেন্দ্র।
চট্টগ্রামে বিএনপির তিনটি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে মহানগরের বাইরে রয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ জেলা কমিটি। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই এখানে চলছে দলীয় কার্যক্রম। আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের অনুপস্থিতিতে উত্তর জেলায় পাঁচ বছর আগে গঠিত আহ্বায়ক কমিটির কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির। এ ছাড়া গ্রুপিংয়ের কারণে প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে পাল্টাপাল্টি কমিটি। আর আট বছর আগে গঠিত দক্ষিণ জেলা কমিটিতে সভাপতির নেতৃত্বে মাঝেমধ্যে কিছু সাংগঠনিক কর্মসূচি পালিত হলেও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫১ সদস্যের কমিটির অধিকাংশই সেখানে থাকেন না। দক্ষিণের সাত উপজেলার অধিকাংশেই রয়েছে দুটি করে কমিটি।
দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, উত্তর জেলা বিএনপির দুই সাবেক সভাপতি গোলাম আকবর খোন্দকার ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে দ্বিধাবিভক্ত। ২০১৪ সালের এপ্রিলে গোলাম আকবর খোন্দকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আসলাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ আবদুল্লাহ আল হাসানকে সদস্য সচিব করে গঠন করা হয় উত্তর জেলা বিএনপির ৯৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি। তাদের ৪৫ দিনের মধ্যে থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু উপজেলায় কমিটি করতে গিয়েই পুরনো দ্বন্দ্ব নতুন করে চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেন। এর ফলে উপজেলা পর্যায়ে গঠিত হয় পাল্টাপাল্টি কমিটি। দলীয় কর্মসূচিও পালিত হতে থাকে পৃথক ব্যানারে। ২০১৬ সালের ১৫ মে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ কানেকশনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন আসলাম চৌধুরী। এরপর থেকে তিনি কারাগারে। অন্যদিকে গত বছর জানুয়ারিতে মারা যান সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল হাসান। এরপর থেকেই উত্তর জেলা বিএনপির কার্যক্রম অনেকটা স্থবির। গত সংসদ নির্বাচনে এখানকার প্রতিটি আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী থাকলেও নির্বাচনী কার্যক্রমে দলীয় নেতাকর্মীদের দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা ছিল না।
অন্যদিকে ২০০৯ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে জাফরুল ইসলাম চৌধুরীকে সভাপতি ও অধ্যাপক শেখ মো. মহিউদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদককে ঘোষণা করা হয় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটি। কিন্তু আহমদ খলিল খানকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট ইফতেখার হোসেন মহসিনকে সাধারণ সম্পাদক করে পাল্টা কমিটি গঠন করে দলের একটি অংশ। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপে কমিটি পুনর্গঠন করে জাফরুল ইসলামকে সভাপতি ও শাহজাহান জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু উপজেলা কমিটি গঠন নিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীদের মধ্যে পুরনো কোন্দল চাঙা হয়ে ওঠে। কয়েকটি উপজেলায় গঠিত হয় পৃথক কমিটি। একদিকে হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়; অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দলÑ এ দুয়ে মিলে দলীয় কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের ৩ মে পটিয়ায় আয়োজন করা হয় দক্ষিণ জেলা বিএনপির কর্মী সম্মেলন। নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে সেই সম্মেলন প- হয়ে যায়।
দলীয় সূত্র জানায়, একাদশ সংসদ নির্বাচনের পরপরই মেয়াদোত্তীর্ণ দুই জেলা কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্র। এ ব্যাপারে দায়িত্ব দেওয়া হয় বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীমকে। তিনি জেলার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্র থেকে নতুন কমিটি গঠনের আগে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান করতে চাই। আগামী ৩০ মে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী পালন ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। আশা করছি এতে সবাই অংশ নেবে।’ তিনি বলেন, ‘কেন্দ্র যেভাবে চাইবে সেভাবেই কমিটি হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে।’
নতুন কমিটি গঠন প্রসঙ্গে উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এম এ হালিম বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুসারে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। নিজেদের মধ্যে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো দূর করতে কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্তরা কাজ করছেন। আশা করি শিগগির নতুন কমিটি হবে।’
এদিকে বিগত সংসদ নির্বাচনের পরপরই মেয়াদোত্তীর্ণ দুই জেলা কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি। তখন এ ব্যাপারে দায়িত্ব দেওয়া হয় দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীমকে। তিনি জেলার শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্র থেকে নতুন কমিটি গঠনের আগে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু মাঝখানে তিনি ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরব চলে যাওয়ায় প্রক্রিয়ায় কিছুটা ভাটা পড়ে। গত সোমবার তিনি দেশে ফিরেছেন।
দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে মাহবুবুর রহমান শামীম বলেন, ‘সংগঠনের কাজে গতি আনতে আমরা উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছি। জেলার শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে এ নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। আমরা চাচ্ছি, আগে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিরসন করতে। এরপরই কমিটি গঠনের কাজে হাত দেব।’