বিশ্বব্যাপী জনকূটনীতি প্রসারিত করুন

বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার যাত্রাপথে রয়েছে তখন গলায় কাঁটা হয়ে বিঁধেছে রোহিঙ্গা-সংকট। বাংলাদেশের উন্নয়নে এই সংকট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। উৎপত্তি এবং প্রকৃতির দিক থেকেই রোহিঙ্গা-সংকট একটি আন্তর্জাতিক সংকট বিধায় বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে এই সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সমাধানের পর্যায়েও নেই। মিয়ানমারে গণহত্যার মধ্যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ নিজেদের সাধ্যের সর্বোচ্চ করে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ কত দিন এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার চাপ বহন করে যাবে? ফলে, সংকট সমাধান করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় সহায়তা আদায়ে সোচ্চার হতে হবে বাংলাদেশকে।

 

সম্প্রতি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে জাতিসংঘের এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএন-এসকাপ) বার্ষিক সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা নেওয়ার বিষয়ে তাগিদ দেন। একই সঙ্গে তিনি ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয়দান করা এবং তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ওপর সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের বিষয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। প্রায় একই সময়ে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে বসতিসংক্রান্ত জাতিসংঘ সম্মেলনে (ইউএন-হ্যাবিটেট অ্যাসেম্বলি) গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণ ও পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর সাহায্য-সহযোগিতা পর্যাপ্ত নয় বলে মন্তব্য করেন। গণপূর্তমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণে রেখেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যাপ্ত সহায়তা ছাড়া যে বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে এই চাপ বেশি দিন বহন করা সম্ভব নয়, বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে তিনি সেই উৎকণ্ঠা ব্যক্ত করেছেন।

 

রোহিঙ্গা-সংকট মিয়ানমারের সৃষ্টি। এর সমাধানও মিয়ানমারের হাতে। দেশটির রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে নানা রকমের নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার রোহিঙ্গারা। নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নেওয়াসহ ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে ১৯৭৮ সাল থেকে দফায় দফায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। বিগত দেড় দশকে কয়েক দফায় রোহিঙ্গারা বিপুল সংখ্যায় বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করলেও সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটে ২০১৭ সালের আগস্টে। সে সময় রাখাইনে গণহত্যার মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। যাদের সিংহভাগই কক্সবাজার জেলার কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে খুন-ধর্ষণ-চাঁদাবাজি এবং মাদকের কারবার ও চোরাচালানসহ নানা রকম সংঘাত-সহিংসতা দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গা-সংকট দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে।

 

দেশ রূপান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে প্রণীত জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে যে অনুদান পাওয়া যাচ্ছে, তা প্রয়োজনের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ মাত্র। প্রতিবেদনগুলোয় রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ কমারও ইঙ্গিত রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ভরণপোষণের ব্যয় মেটাতে দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ পড়ছে এবং তা দেশের খাদ্য-পরিস্থিতিতেও ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা পর্যাপ্ত মাত্রায় উন্নীত করার জন্য দৃঢ় কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

 

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মারাত্মক আকার লাভ করা এই রোহিঙ্গা-সংকট নিয়ে সংকটের উৎস-রাষ্ট্র মিয়ানমার এখনো নির্বিকার। এখনো রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা এবং অমানুষিক নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য দায়ী গোষ্ঠী ও ব্যক্তিরা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো আদালতেই বিচারের মুখোমুখি হননি। এমনকি এই সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছে না মিয়ানমার। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত ও চীনও রোহিঙ্গা-সংকট সমাধানে এগিয়ে আসছে না। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় তৎপরতা জোরদার করাটা জরুরি। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং সংকট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় করতে এখন বিশ্বব্যাপী জনকূটনীতি প্রসারিত করার পথে এগোতে হবে বাংলাদেশকে।