ভালো-মন্দে উত্থান: শাকিব খানের ২০ বছরের আমলনামা (১)

[ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলায় ১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ ঢাকাই ছবির জনপ্রিয় তারকা শাকিব খান জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আব্দুর রব ছিলেন একজন সরকারি দপ্তরের কর্মচারী ও মাতা নূরজাহান একজন গৃহিণী। ১৯৯৯ সালে ‘অনন্ত ভালোবাসা ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে রূপালি জগতে তার অভিষেক ঘটে। যদিও আফতাব খান টুলু পরিচালিত ‘সবাইতো সুখী হতে চায়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায় ২০০০ সালে। এতে তার বিপরীতে ছিলেন আরেক নবাগত কারিশমা শেখ। ২৮মে এই তারকার অভিনয় জীবনের ২০ বছর পূর্ণ হলো। শাকিব খানের অভিনয় জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে দেশ রূপান্তরের বিশেষ আয়োজন। আজ থাকছে তার প্রথম পর্ব।]

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশককে বাংলা সিনেমার সোনালি যুগ বলা হয়। সেই সোনালি দশকের শেষ বছরে ঢাকাই সিনেমায় এক নতুন নায়কের আগমন ঘটে। তার নাম শাকিব খান। শুধু শাকিব নয়, তার সঙ্গে নায়িকা ইরিন জামানেরও অভিষেক ঘটে (চিত্রনায়িকা মৌসুমীর ছোট বোন ইরিন জামান সিনেমায় নিয়মিত হননি)। ১৯৯৯ সালের ২৮ মে মুক্তি পায় এই নবাগত জুটির প্রথম ছবি ‘অনন্ত ভালোবাসা’। পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। নতুন নায়ক-নায়িকার ছবি হওয়ায় ‘অনন্ত ভালোবাসা’ আলোচনাতেও ছিল। কিন্তু ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফলতা পায়নি। ছবিটি সফলতা না পেলেও নায়ক শাকিব খান থেমে যাননি। দৌড়াতে থাকেন একের পর এক পরিচালকের দোয়ারে। হ্যাংলা পাতলা গড়নের একজন সুদর্শন তরুণ দৌড়াতে দৌড়াতে পায়ের জুতোর তলা ক্ষয় করছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছেন না। কীভাবেই বা পারবেন, তখন ঢাকার রূপালি পর্দায় উজ্জ্বল নক্ষত্রদের ছড়াছড়ি। চারদিকে গ্ল্যামারের জয়জয়কার। শাকিল খান-পপি, শাবনূর-রিয়াজ, ফেরদৌস-পূর্ণিমা, মান্না-ডিপজল, রুবেল, রাজীব, ডন, ইলিয়াস কাঞ্চন, হ‌ুমায়ূন ফরিদী, রাজ্জাক, আলমগীর- প্রতিটি ক্ষেত্রে নক্ষত্রদের ছড়াছড়ি। সেই প্রবল প্রতিযোগিতার মাঠে শাকিব খান কেবলই একটা নাম মাত্র।

অস্তিত্বের লড়াই

নতুন ছেলে। না আছে অভিজ্ঞতা, না আছে মামার জোর। ফলে মূল নায়ক তো দূরের কথা অনেক সময় সাইড নায়ক হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হতো শাকিব খানকে। নানা কাঠখড় পুড়িয়েও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা দায়।

প্রথম বছরে তেমন কিছুই হলো না শাকিবের। দ্বিতীয় বছরে মানে ২০০০ সালে এসে শাকিব খান অভিনীত বেশ কয়েকটা ছবি মুক্তি পায়। বেশ কয়েকটা ছবি মুক্তির ফলে পরিচালক প্রযোজকেরা শাকিব খানের নানা মাত্রিক অভিনয় প্রতিভার দেখা পেলেন। বিশেষ করে শাকিব খানের নাচ পছন্দ হলো পরিচালকদের। হাতে আসতে থাকল আরও ছবি। ২০০০-২০০৪, এই পাঁচ বছরকে শাকিবের অস্তিত্ব রক্ষার সময় বলে গণ্য করা যেতে পারে। এই সময় তিনি যেমন পপি, পূর্ণিমার মতো জনপ্রিয় নায়িকার সঙ্গে অভিনয় করলেন তেমনি মুনমুনের মতো নায়িকার সঙ্গে অশ্লীল ছবিতেও দেখা গেল তাকে। এই সময়ে এসে শাকিব খানের প্রয়োজন ছিল অস্তিত্ব রক্ষা করা। ফলে বাছ বিচার না করে প্রস্তাব পেলেই সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হতে থাকেন তিনি। এ সময় আমিন খান, ফেরদৌস, আলেক জান্ডার বো, মান্না অভিনীত ছবিতে তাকে সাইড নায়কের চরিত্রে দেখা যায়। একই সঙ্গে বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে শাবনূরের মতো জনপ্রিয় নায়িকার সঙ্গেও কাজ করারও সুযোগ পান শাকিব। মূলত শাবনূরের সঙ্গে জুটি গড়ার বদৌলতে শাকিব খানের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এই সময়ে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলোর দিকে নজর দেওয়া যাক-

২০০০ সালে মুক্তি পেল শাকিব খান অভিনীত ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’, ‘গোলাম’, ‘আজকের দাপট’, ‘দুজন দুজনার’, ‘বিষে ভরা নাগিন’, ‘হীরা চুনি পান্না’। ২০০১ সালে মুক্তি পায় শাকিব অভিনীত ‘ঠেকাও মাস্তান’, ‘হিংসার পতন’, ‘মায়ের জেহাদ’, ‘শিকারি’, ‘রাঙ্গা মাস্তান’, ‘মেজাজ গরম’, ‘ভালোবাসার দুশমন’, ‘বন্ধু যখন শত্রু’। ২০০২ সালে মুক্তি পায় ‘জুয়াড়ি’, ‘ফুল নেব না অশ্রু নেব’, ‘নাচওয়ালি’, ‘বিশ্ব বাটপার’, ‘আজকের ক্যাডার’, ‘স্ত্রীর মর্যাদা’, ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’।  ২০০৩ সালে মুক্তি পায় ‘স্বপ্নের বাসর’, ‘সাহসী মানুষ চাই’, ‘প্রাণের মানুষ’, ‘ক্ষমতার দাপট’, ‘সবার উপরে প্রেম’, ‘হিংসা প্রতিহিংসা’। ২০০৪ সালে  মুক্তি পায় ‘আজকের সমাজ’, ‘প্রেম সংঘাত’, ‘হৃদয় শুধু তোমার জন্য’, ‘নয়ন ভরা জল’, ‘নষ্ট’, ‘বস্তির রানী সুরিয়া’, ‘রুখে দাঁড়াও’, ‘ওরা দালাল’।

 

অশ্লীল যুগে শাকিব খান

আগেই বলেছি অস্তিত্বের লড়াইয়ের জন্য শাকিব খান বাছ-বিচার না করেই ছবি করতে থাকেন। বাংলা সিনেমায় অশ্লীলতার সূত্রপাতের সময় যদি ধরি ১৯৯৮ সাল, তাহলে তত দিনে অশ্লীলতা মধ্য গগনে চলে এসেছে। রিয়াজ, ফেরদৌসদের মতো জনপ্রিয় নায়কেরা তখন অশ্লীল ছবি করা থেকে বিরত থাকলেও শাকিব খান স্রোতে গা ভাসিয়ে দিলেন। অভিনয় করলেন মুনমুন, ময়ূরী, পলির মতো নায়িকাদের সঙ্গে। তাও আবার সেসব ছবিতে মুনমুন, ময়ূরী পলিরাই থাকতেন এগিয়ে। নায়ক শাকিব খানের নাম থাকত পেছনে। শাকিব খান মুনমুনের সঙ্গে ‘জানের জান’, ‘পাগলা বাবা’, ‘বিষে ভরা নাগিন’, ‘দুই নাগিন’, ‘বিষাক্ত নাগিন’, ‘নাটের গুরু’, ‘বড় মালিক’, ‘বোবা খুনি’, ‘ভণ্ড ওঝা’, ‘খল নায়িকা’, ‘গুরু দেব’, ছবিগুলোতে অভিনয় করেছেন।

ময়ূরীর সঙ্গে ‘পাল্টা হামলা’, ‘লোহার শিকল’, ‘মরণ নিশান’, ‘বাহাদুর সন্তান’, ‘যুদ্ধে যাব’, ‘কসম বাংলার মাটি’ ছবিতে অভিনয় করেন। নদীর সঙ্গে কাজ করেন ‘খুনি শিকদার’, ‘নগ্ন হামলা’, ‘সাত খুন মাফ’, ‘মায়ের হাতের বালা’ ছবিতে। সাহারার সঙ্গে ‘রুখে দাঁড়াও’, ‘লালু কসাই’, ‘ধর শয়তান’, ‘ভাড়াটে খুনি’, ‘নষ্ট ছাত্র’। পলির সঙ্গেও একাধিক ছবিতে কাজ করেন শাকিব খান।

ভদ্রপল্লিতে শাকিব খান

২০০৫ সালকে বলা যেতে পারে শাকিব খানের বোধোদয়ের বছর। অশ্লীলতার দুষ্টচক্র থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে থাকেন শাকিব খান। এই বছর মুক্তি পায় তার অভিনীত ‘আমার স্বপ্ন তুমি’, ‘ঢাকাইয়া পোলা বরিশালের মাইয়া’, ‘সিটি টেরর’, ‘সমাধি’, ‘এক বুক জালা’, ‘বাধা’, ‘ভালোবাসার দুশমন’। এই ছবিগুলোর মধ্যে হাসিবুল ইসলাম মিজান পরিচালিত ‘আমার স্বপ্ন তুমি’ ছবিতে শাবনূর-ফেরদৌসের সঙ্গে শাকিব খানের অভিনয় সবার নজর কাড়ে। এই ছবির মাধ্যমে শাকিব খান নিজেকে জাত অভিনেতা হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন। একই বছরে মুক্তি পাওয়া ‘ঢাকাইয়া পোলা বরিশালের মাইয়া’ ছবিটিও ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়। এই ছবিতে শাকিবের নায়িকা ছিলেন শাবনূর। মূলত ২০০৫ সাল থেকেই শাবনূরের সঙ্গে জুটি গড়ে তোলে একের পর এক ছবিতে অভিনয় করতে থাকেন শাকিব খান। শাবনূরের সঙ্গে অভিনয়ের কল্যাণে ভদ্রপল্লির দর্শকরাও শাকিব খানকে চিনতে শুরু করে।

শাকিবের ঘুরে দাঁড়ানো

শাবনূরের সঙ্গে জুটি বেঁধে কাজ করার বদৌলতে শাকিব খান তখন বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু ক্রেডিট শাকিব খানের চেয়ে শাবনূরেরই বেশি। শাকিব খানের অভিনয় প্রশংসিত হওয়ায় তার জনপ্রিয়তা বাড়লেও তার নিজস্ব দর্শক তখনো তৈরি হয়নি। মূলত শাবনূরের ওপর ভর করেই তখনো শাকিব খান চলছিলেন।

২০০৬ সাল। শাকিব খান বেরিয়ে আসতে চাইছিলেন শাবনূরের বলয় থেকে। এত দিনের জনপ্রিয়তাকে সম্বল করে পরিচালকরাও শাকিবকে নিয়ে ঝুঁকি নিতে রাজি হলেন। ফলস্বরূপ এফ আই মানিক পরিচালিত ‘কোটি টাকার কাবিন’ ছবিতে শাবনূরের পরিবর্তে নতুন নায়িকার আগমন ঘটল। তিনি অপু বিশ্বাস। এর আগে অপুর কাজের তালিকায় মাত্র ১টি ছবি। আমজাদ হোসেনের কাল সকালে। যদিও শাকিব খানের গায়ে অশ্লীল তকমা থাকাই অপু চাইছিলেন না শাকিবের সঙ্গে অভিনয় করতে। তার পছন্দ ছিল রিয়াজ। কিন্তু পরিচালক এফ আই মানিক শাকিবের সঙ্গেই নতুন নায়িকাকে নিয়ে ঝুঁকি নিলেন। ফলাফল ডিপজল প্রযোজিত ‘কোটি টাকার কাবিন’ ছবি হিট। প্রথমবারের মতো শাকিব খানের খাতায় উঠল এককভাবে ছবি হিটের ক্রেডিট। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শাকিব খানকে। শাকিব খান-অপু বিশ্বাস জুটি জনপ্রিয় উঠল। পরিচালক প্রযোজকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়লেন এই জুটিকে নিয়ে ছবি বানানোর জন্য।

২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলো হচ্ছে- ‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘চাচ্চু’, ‘দাদিমা’, ‘পিতার আসন’, ‘ভণ্ড ওঝা’, ‘সুভা’, ‘মায়ের মর্যাদা’। ২০০৭ সালে মুক্তি পায় ‘আমার প্রাণের স্বামী’, ‘কপাল’, ‘কাবিননামা’, ‘ডাক্তার বাড়ি’, ‘তোমার জন্য মরতে পারি’, ‘মা আমার স্বর্গ’, ‘রসের বাইদানী’, ‘স্বামীর সংসার’।

২০০৮: মান্নার মৃত্যু, শাকিবের বর লাভ

কথায় বলে কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। ২০০৮ সালে নায়ক মান্না ও শাকিব খানের জন্য এই প্রবাদটি বাস্তব হয়ে ধরা দিল……(চলবে)

[বি:দ্র: শাকিব খানকে নিয়ে বিশেষ আয়োজনের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হবে বৃহস্পতিবার।]