চলতি রমজানের শেষ ১০ দিনে অবস্থান করছি আমরা। পবিত্র এই মাস শেষ হতে আর বেশি দিন বাকি নেই। রোজা শেষের উৎসব ঈদের প্রস্তুতিতে এখন ব্যস্ত প্রায় সবাই। এ অবস্থায় ঈদের কেনাকাটা ও ঈদ প্রস্তুতির পারিপার্শ্বিক চাপে নানা ধাপে মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এই ধৈর্যচ্যুতি যেন আমাদের জীবনে কোনো প্রভাব সৃষ্টি না করতে পারে, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। যেহেতু আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ ও রিপুর ওপর আত্মাকে জয়ী করার উপলক্ষ তৈরি হয় এ মাসে, তাই আত্মাকে জয়ী করার লক্ষ্যে ধৈর্য ধারণ করে এমন বিব্রতকর ও কঠিন মুহূর্তগুলো কাটাতে হবে। আত্মাকে জয়ী করার মানসে রমজানের অন্তর্নিহিত শিক্ষাসমূহ নিজের ভেতরে লালন করতে হবে। শুধু রমজান মাসে নয়, পুরো বছরজুড়ে এ অভ্যাসকে আত্মস্থ করতে হবে। এটাই শিক্ষা দেয় রমজান।
ধৈর্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখে আত্মসংবরণ করা, যে গুণের প্রভাবে বিপদের সময়ও অটলভাবে থাকা যায়। আর সহিষ্ণুতা হলোÑ সহ্য করার ক্ষমতা। ধৈর্য তিন প্রকার : মানসিক কষ্টের সময় ধৈর্যধারণ, আল্লাহতায়ালার প্রতি আনুগত্যের সময় ধৈর্যধারণ এবং আল্লাহতায়ালার অবাধ্যদের প্রতি ধৈর্যধারণ। এ বিষয়ে কোরআনে কারিমের সূরা আল আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘আর আল্লাহতায়ালার নির্দেশ মান্য করো এবং তার রাসূলের। তা ছাড়া তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হোয়ো না। যদি তা করো, তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের চিত্তের দৃঢ়তা বিলুপ্ত হবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা রয়েছেন ধৈর্যশীলদের সঙ্গে।’
ধৈর্য হলো একটি দেহের মাথাস্বরূপ। দেহের ক্ষেত্রে মাথার যে ভূমিকা মানবজীবনে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ধৈর্যের ভূমিকাও তেমন। মাথা না থাকলে যেমন দেহ মূল্যহীন, তেমনি ধৈর্য না থাকলে মানবসংসার থেকে বিশ্বাস-আস্থা বিলীন হয়ে অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ইমানের কাঠামো চারটি স্তম্ভের ওপর। এগুলো হলোÑ ধৈর্য, অকাট্য বিশ্বাস, ন্যায়পরায়ণতা ও জিহাদ। আর ধৈর্যের চারটি উপাদান হলোÑ ব্যগ্রতা, ভয়, ধর্মভীরুতা ও মৃত্যুর প্রত্যাশা। কাজেই যে ব্যক্তি রমজানের বরকত হাসিল করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বেহেশত লাভের জন্য উদ্গ্রীব তিনি সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ করবেন। ধৈর্যধারণ করে লোভ সংবরণ করবেন। কষ্ট স্বীকার করে ধর্মভীরুতার অনুশীলন করবেন। খুব সহজেই পার্থিব জীবনের সব দুঃখ, কষ্ট ও বেদনাকে ধৈর্যের চাদরে আবৃত করে নেবেন। তাই তো বলা হয়েছে, যখন কোনো ইমানদার বান্দা তার ওপর আপতিত যন্ত্রণা, দুঃখ বা কষ্টকে ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করে তখন তাকে হাজার শহিদের সমতুল্য পুরস্কার দেওয়া হয়।
ধৈর্য এমন একটি অসাধারণ আধ্যাত্মিক শক্তি ও গুণ, যা মানুষকে পৃথিবীর পথচলার পথকে সহজ করে দেয়। আখেরাতে মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী এবং কঠিন বিপদের মুহূর্তে তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। তবে এই গুণ রাতারাতি কারও পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। এই গুণ অর্জনের জন্য দরকার নিরন্তর সাধনা। যে সাধনা করা আমাদের প্রত্যেকের জন্য অবশ্য কর্তব্য। আলেমরা বলেন, যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করেন তিনি কখনোই সাফল্য লাভ করা থেকে বঞ্চিত হন না, হয়তো তার সাফল্য লাভ করতে সামান্য দেরি হতে পারে।
রমজানে আমাদের জীবনে এসবের অনুশীলন একান্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, রমজানে যদি আমরা এসব করতে না পারি, তাহলে হাদিসের উক্তি অনুযায়ী দুর্ভাগা হিসেবে আমাদের নাম লেখা হবে। এ বিষয়ে হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘দুর্ভাগা তারা, যারা রমজান পেয়েও মাগফিরাত বা ক্ষমা লাভ করতে পারল না।’
লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক।