জেনে নিন বিশ্বকাপের ১১ ভেন্যুর আদ্যোপান্ত

আবারো ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফিরেছে খেলাটির আতুর ঘর ইংল্যান্ডে। কুড়ি বছর পর! ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চ সফল আয়োজনে প্রস্তুতির বিন্দুমাত্র কমতি নেই ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের। দশ দলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই দেখতে এগারো ভেন্যুতে থাকবে সবার চোখ। আসুন জেনে নেই সবুজ ঘাসে মোড়ানো ঐতিহ্যে ভরা এসব ভেন্যুর আদ্যোপান্ত।

 

দ্য ওভাল

দর্শক ধারণক্ষমতা: ২৫ হাজার; নির্মাণ: ১৮৪৫ সাল

স্টেডিয়ামটির পরতে পরতে ক্রিকেটের ঐতিহ্য! কত কিছুরই না সাক্ষী টেমস নদীর তীর ঘেষা ভেন্যুটি। সারে ক্রিকেট ক্লাবের এই মাঠেই ১৮৮০ সালে হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম টেস্ট ম্যাচ। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার ওই লড়াইয়ে হার মেনেছিল ইংলিশরা। সেই থেকে ভেন্যুটিতে হয়েছে একশোর উপরে টেস্ট ম্যাচ। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাকিস্তানের পেসার সাকলাইন মুশতাকের হ্যাটট্রিকের কীর্তি গড়েছিলেন এই ওভালে। স্টেডিয়ামটির নান্দনিক গ্যালারি ও মাঠের সবুজ মুগ্ধ করবে যে কাউকেই। ইংল্যান্ডের প্রথম ফুটবল ম্যাচটিও হয়েছিল এই মাঠে, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে!

৩০ মে ওভালেই হবে এবারের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ। ইংল্যান্ড খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। উদ্বোধনী ছাড়াও টুর্নামেন্টের আরো চারটি ম্যাচ হবে এখানে। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ২ জুন বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশনও শুরু হবে ওভালে।

লর্ডস

দর্শক ধারণক্ষমতা: ২৮ হাজার ৫০০; নির্মাণ: ১৮১৪

ক্রিকেটের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ভেন্যু। ক্রিকেটারদের স্বপ্নের মাঠ। বিশ্ব ক্রিকেটের তীর্থস্থান! লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত স্টেডিয়ামটি স্থাপিত হয় প্রয়াত ইংলিশ ক্রিকেটার টমাস লর্ডসের নামানুসারে। বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ক্রীড়া জাদুঘর (এমসিসি জাদুঘর) এখানে অবস্থিত। ১৮৬৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের অনেক স্মারক রয়েছে এখানে। ২০১০ সালে এই ভেন্যুতে পর পর দুই টেস্টে ইংলিশ বোলারদের বিপক্ষে দাপুটে সেঞ্চুরি হাকান বাংলাদেশের তামিম ইকবাল। অসাধারণ এই কীর্তিতে নাম তোলেন লর্ডসের অনার্স বোর্ডে। এমন অনেক কীর্তির সাক্ষী এই লর্ডস। ফাইনালসহ এবারের বিশ্বকাপের পাঁচটি ম্যাচ হবে এই ভেন্যুতে। এখানেই হবে বাংলাদেশ-পাকিস্তান মধ্যকার লড়াই। এর আগে ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৮৩ ও ১৯৯৯ সালের বিশ^কাপ আসরের ফাইনালও হয়েছিল এই লর্ডসে। বিশ্বকাপের ম্যাচে এই মাঠে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ ৪ উইকেটে ৩৩৪ রান।  ১৯৭৫ সালের বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে এই কীর্তিটি গড়েছিল স্বাগতিক ইংল্যান্ড।

এজবাস্টন

দর্শক ধারণক্ষমতা: ২৪ হাজার ৫০০; নির্মাণ: ১৮৮৬

ওয়ারউইকশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের মাঠটি অনেক ঐতিহ্যসম্পন্ন। ঐতিহাসিক অনেক মুহূর্তের সাক্ষী। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে এখানেই ব্রায়ান লারা অপরাজিত ৫০১ রানের স্মরণীয় ইনিংসটি খেলেছিলেন। এর আগে এই ভেন্যুতে চারবার বিশ্বকাপের আসর বসেছে। এর মধ্যে ১৯৭৯, ৮৩ ও ৯৯ আসরে এখানে সেমি-ফাইনাল ম্যাচও হয়েছে। এবারের বিশ্বকাপেও এখানে একটি সেমিফাইনাল লড়াইসহ হবে পাঁচটি ম্যাচ। বাংলাদেশ ও ভারত মধ্যকার লড়াইটি হবে এই ভেন্যুতেই।

বিস্টল কাউন্টি গ্রাউন্ড

দর্শক ধারণক্ষমতা: ১১ হাজার; নির্মাণ: ১৮৮৯

ইউরোপিয়ান গ্রিন ক্যাপিটাল হিসেবে খ্যাত দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল নগরী। পাশেই প্রবাহমান অ্যাভন নদী। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্রিকেটার ডব্লিউ জি গ্রেস এ মাঠটি ১৮৮৯ সালে কিনেছিলেন। এরপর থেকেই গ্লুস্টারশায়ার কর্তৃপক্ষ ভেন্যুটি ব্যবহার করে আসছে। এখানে ১৯৮৩ বিশ্বকাপে একটি ও ১৯৯৯ বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এবারের আসরে হবে তিনটি ম্যাচ। এর মধ্য রয়েছে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার লড়াইটিও। ২০১৭ সালে নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপে আটটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ব্রিস্টলে।

কার্ডিফ ওয়েলস স্টেডিয়াম

দর্শক ধারণক্ষমতা: ১৫ হাজার ২০০; নির্মাণ: ১৮৫৪

দক্ষিণ ওয়েলসের উপকূল ঘেঁষা বন্দর নগরী কার্ডিফে অবস্থিত স্টেডিয়ামটি সোফিয়া গার্ডেন্স নামেও পরিচিত। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গত দুটি আসরের বেশ কয়টি ও ১৯৯৯ সালের বিশ^কাপের একটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় এই ভেন্যুতে। স্থানীয় গ্ল্যামরগান কাউন্টি ক্লাবের মাঠটিতে এবার চারটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ও স্বাগতিক ইংল্যান্ড মধ্যকার লড়াইটিও। এই ভেন্যুতে ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তানের জয়টি এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে।

দ্য রিভারসাইড গ্রাউন্ড

দর্শক ধারণক্ষমতা: ১৪ হাজার; নির্মাণ: ১৯৯৫ সাল

উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডে অবস্থিত ডারহাম কাউন্টিতে অবস্থিত স্টেডিয়ামটি অন্যগুলো থেকে অনেকটা নবীন। উপত্যকা ও উপকূলের মিশেলে তৈরি হয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক এক সৌন্দর্য্য। স্টেডিয়ামটি নগরীর ঐতিহাসিক চেস্টার-লি-স্ট্রিটের পাশেই অবস্থিত। এই মাঠে এর আগে বিশ্বকাপের মোট পাঁচটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সবগুলো ম্যাচ ছিলো ১৯৯৯ সালের আসরের। ভেন্যুটিতে এবারের আসরে তিনটি ম্যাচ হবে। এখানে বাংলাদেশের কোনো খেলা পড়েনি।

হেডিংলি

দর্শক ধারণক্ষমতা: ১৮ হাজার ৩৫০; নির্মাণ: ১৮৯০

ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা পর্যটন নগরী লিডস। উদযাপনের সবই আছে এখানে। ইয়র্কশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের হোম গ্রাউন্ড এটি। হেডিংলিতে এর আগে ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৮৩ ও ১৯৯৯ বিশ্বকাপ আসরেরও অনেকগুলো ম্যাচ হয়েছে। এবার হবে চারটি ম্যাচ। ২০১৭ সালে এই ভেন্যুতেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বিশ^কাপের ম্যাচে তারা এখানে মুখোমুখি হবে আফগানিস্তানের। এই ভেন্যুতেও লিগ পর্যায়ে কোনো ম্যাচ নেই বাংলাদেশের।

ওল্ড ট্র্যাফোর্ড

দর্শক ধারণক্ষমতা: ২৪ হাজার ৬০০; নির্মাণ: ১৮৫৭ সাল

বিশ্বকাপে এটি নতুন কোনো স্টেডিয়াম নয়। ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৮৩ ও ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে এই ভেন্যুতে বেশ কয়েকটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে এই ভেন্যুটি থাকবে সবচেয়ে ব্যস্ত। সবচেয়ে বেশি ছয়টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এখানে। এর মধ্যে একটি সেমিফাইনাল ম্যাচও এখানে অনুষ্ঠিত হবে। ভারত-পাকিস্তানের দ্বৈরথও এই স্টেডিয়ামে দেখতে পারবেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। এই ভেন্যুতেও লিগ পর্বে বাংলাদেশের কোনো ম্যাচ নেই।

ল্যাঙ্কাশায়ার ক্রিকেট ক্লাবের হোম ভেন্যুটিতে ইংল্যান্ড দুইবার বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনাল খেলেছে। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেলেও ১৯৮৩ সালের আসরে ভারতের কাছে হারতে হয়েছিল তাদের। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় পুড়াতন টেস্ট ভেন্যু ওল্ড ট্র্যাফোর্ড। ১৮৮৪ সাল থেকে এখানে টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে।

ট্রেন্ট ব্রিজ

দর্শক ধারণক্ষমতা: ১৭ হাজার; নির্মাণ: ১৮৪১

ঐতিহাসিক ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ১৯৭৪ সালে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৮৩ ও ১৯৯৯ বিশ্বকাপের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃ হয়। ২০১৯ বিশ্বকাপে এই মাঠে স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান লড়াইসহ মোট পাঁচটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। রয়েছে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া মধ্যকার লড়াইটিও।

ট্রেন্ট ব্রিজের এই মাঠে বিশ্বকাপে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের রেকর্ড বেশ ভালো। এই ভেন্যুতে ১৯৭৫ আসরে নিউজিল্যান্ড ও ১৯৯৯ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়ী হয়েছিল ইংলিশরা। সম্প্রতি এই মাঠে ওয়ানডে ক্রিকেটে ৬ উইকেটে ৪৮১ রানের রেকর্ড গড়ে ইংল্যান্ড। আ্যালেক্স হলস ও জনি বেয়ারস্টো উভয়েই সেঞ্চুরি করেন। ২০১৬ সালে এই মাঠেই ৩ উইকেটে ৪৪৪ রানের পূর্বেকার রেকর্ড গড়েছিল ইংল্যান্ড!

হ্যাম্পশায়ার বোল

দর্শক ধারণক্ষমতা: ১৭ হাজার, নির্মাণ: ২০০১

একবিংশ শতকের একেবারে শুরুর দিককার স্টেডিয়াম। সাউদাম্পটনের এই স্টেডিয়ামটি রোজ বোল নামেও পরিচিত। হ্যাম্পশায়ার বোলে এবারই প্রথম বিশ^কাপের বল গড়াবে। এই মাঠে গ্রুপ পর্বের মোট পাঁচটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান লড়াইও।

তবে হ্যাম্পশায়ারে এর আগে ১৯৮৩ এবং ১৯৯৯ সালেও বিশ্বকাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় ম্যাচগুলো হয়েছিল সাউদাম্পটনের নর্দল্যান্ডস রোড গ্রাউন্ডে।

ইংল্যান্ডের দক্ষিণ তীরবর্তী সাউদাম্পটনে অবস্থিত মাঠটি। ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার ওয়ানডে দিয়ে যাত্রা শুরুর পর এই মাঠে ক্রিকেটের তিন ফর্মেটেই আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০০৪ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পাঁচটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় এখানে।

কাউন্টি ক্রিকেট গ্রাউন্ড

দর্শক ধারণক্ষমতা: ৮ হাজার; নির্মাণ: ১৮৮২ সাল

সোমারসেট কাউন্টির আঞ্চলিক শহর টনটনে ১৮৮২ সালে নির্মাণ করা হয়। সোমারসেট কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের হোম গ্রাউন্ড এটি। শহরের কেন্দ্র থেকে আধা মাইল দূরে এর অবস্থান। অপরূপ সুন্দর এই শহর। এখানে হবে এবারের বিশ্বকাপের তিনটি ম্যাচ। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ মধ্যকার লড়াইও। এর আগে ১৯৮৩ বিশ্বকাপে একটি এবং ১৯৯৯ আসরে দুইটি ম্যাচে এখানে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৭ আইসিসি নারী বিশ্বকাপের সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় এই ভেন্যুতে।