চোখ ঝাপসা হয়ে যায় সন্তানের জন্য

ঈদ মানেই আনন্দ। বছর ঘুরে আসা আনন্দের এই দিনটি উদ্যাপনে প্রত্যেকেই সাধ্যমতো উদ্যোগ নেন। শহরের চাকরিজীবীরা পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়ি পাড়ি জমান। গ্রামের বাড়িতে থাকা বাবা-মায়ের আনন্দ বাঁধ ভাঙে সন্তানকে কাছে পেয়ে। সন্তানও সুখ পান বাবা-মায়ের হাসিমাখা মুখ দেখে। তবে কিছু বাবা-মায়ের ঈদের দিনটি কাটে একেবারেই আটপৌরে দিনের মতো। ঈদ উপলক্ষে তাদের নেই কোনো ব্যস্ততা, নেই আনন্দ ভাগাভাগির ভাবনাও। যাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করবেন সেই প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গেই দেখা হয় না দীর্ঘদিন, অনেকের নেই যোগাযোগও। বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মাঝেই রাত-দিন হয় তাদের। কখনো কখনো সন্তানদের কথা মনে পড়ে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বিশেষ দিনগুলোতে সেই ঝাপসা চোখে কেবল স্মৃতি হাতড়েই কাটে তাদের।

সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম হোসেন গোলাপ তেমনই একজন। নিজের সন্তান, আত্মীয়-স্বজন সবই আছে। তবুও রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রবীণ নিবাসই তার এখনকার ঠিকানা। সন্তান-স্বজন রেখে একা একা ঈদ করতে কেমন লাগেÑ এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন তিনি। তার নিষ্পলক চোখের কোণটা ভিজে ওঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, ঈদ মানেই তো আনন্দ। আমার নাতি-নাতনি আছে, ছেলেমেয়ে আছে। তারা কাছে থাকলে ঈদটা সত্যিকারের ঈদ হয়ে উঠত। তারা কেউ আমার সঙ্গে নেই। আমার আবার ঈদ কীসের?

নিজের ছেলের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ঈদের আগে ছেলেটা ঢাকায় আসছিল। আমি বললামÑ আমার এখানে এসে একটু দেখা করে যা। একসঙ্গে ইফতার করি। ছেলে আমাকে বলল, তার হাতে সময় নেই। সে ব্যস্ত।

গোলাপের মতোই মুজিবুল হকের ছেলেমেয়েদেরও সময় নেই তার জন্য। বারান্দায় বসে অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে সময় কাটে তার। কখনো কখনো নিজের সঙ্গেই কথা বলে কাটান তিনি। ছেলে ও মেয়ে দুজনেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ২০ বছর ধরে প্রবীণ নিবাসে থাকা ৮০ বছর

 বয়সের এই কলেজশিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের আনন্দ ছিল তখন যখন নতুন একটা কাপড় পেতাম। ঈদ তখন আসতেই চাইত না। এখন তো খুব তাড়াতাড়ি ঈদ চলে আসে। এখনকার ছেলেমেয়েদের মতো ঈদও ব্যস্ত।’ কথাটা বলে নিজে নিজেই হেসে ওঠেন তিনি।

এরপর নিজের ছেলের কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে তার। তিনি বলেন, ওকে নিয়ে যখন মসজিদে যেতাম তখন অনেকেই ওকে পেছনের কাতারে পাঠাতে বলতেন। তাতে ছেলেটা খুব কষ্ট পেত। আমি বলতাম, আমার ছেলে আমার সঙ্গেই থাকবে।

মুজিবুল হক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানান, সেই দিনগুলোও তার খুব মনে পড়ে। ছেলের ছোট্ট হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার স্মৃতি বারবার উঁকি দেয় মনের জানালায়। গেল বিশ বছর ধরে সেইসব স্মৃতি নিয়েই বেঁচে আছেন তিনি। ঈদের মতো বিশেষ দিনগুলোতে স্মৃতিগুলো বড্ড জ্বালায় বলে ঘুমিয়েই কাটান তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা গোলাপ কিংবা কলেজশিক্ষক মুজিবুল হকের মতো আরও অনেকেরই ঈদ কাটে এভাবে। প্রবীণ নিবাসের আরেক বাসিন্দা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আবু তৈয়ব বলেন, ঈদ বলতে বিশেষ কিছু নেই এখানে। ঈদের দিন এখানে ভালো খাওয়া-দাওয়া হয়, এই যা। সকালে সেমাই খেয়ে ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। বাকি দিনটা ঘুমিয়ে কেটে যাবে।

প্রবীণ নিবাসের ব্যবস্থাপক আমানউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওনাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তাই এখানে থাকেন। এই নিবাসে ৪৬ জনের মধ্যে ১০ থেকে ১২ জন রয়েছেন যাদের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ঈদের সময়। চার থেকে পাঁচজন আছেন যাদের পরিবারের সদস্যরা ঈদের আগে এসে নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেকে আছেন যাদের পরিবারের কেউ নেই। তবে আমাদের এখানে একটা পরিবারের মতোই সবার সময় কাটে। সবাই একসঙ্গেই ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছেন। নিজেদের মধ্যেই গল্প-গুজব করে কাটিয়েছেন।