ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ ঘিরে মোটেও ক্রিকেট-দুনিয়া বিভক্ত হয় না। সে যতই ছাইযুদ্ধ নিয়ে টন টন নিউজপ্রিন্ট খরচ হোক না কেন!
যেহেতু ক্রিকেট বিশ্বে ইংরেজি ভাষা বহুল প্রচলিত, সাধারণত আমাদের প্রবণতা রয়েছে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার কাগজে কী লিখল, পড়ে দেখার। কোনো এক ইংরেজ ক্রিকেট লিখিয়ে সখেদ লিখেছিলেন, ক্রিকেটে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার এই দ্বৈরথ হারিয়েছে তার আকর্ষণ। সেই জায়গা নিতে উঠে এসেছে ভারত-পাকিস্তান।
ভুল লিখেছিলেন সেই কলমচি। অ্যাশেজের ইতিহাস ঘিরে তৈরি হওয়া সেই তাত্ত্বিক যুদ্ধ উপমহাদেশের সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের কি আদৌ আকৃষ্ট করে? গত শতাব্দীর সাত বা আটের দশকে তা-ও হয়তো খানিকটা বাড়তি আগ্রহ ছিল। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের আকর্ষণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি, চিরকালীন।
আর সেই আকর্ষণের ব্লকবাস্টার তালিকায় দুই নম্বরে থাকবে সেই দুই দেশের লড়াই, যা দেখা যাবে লন্ডনে রবিবার। ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া। যেহেতু ভারত এবং
পাকিস্তান এখন আর টেস্ট সিরিজ খেলে না,
ভারত আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে টেস্ট সিরিজ এখন ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচ্য এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয়, কোনো সন্দেহই নেই। শেষবার ভারত যখন গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া সফরে এবং ফিরেছিল জিতে, সেই সিরিজ নিয়ে যতটা ব্যস্ত থাকতে দেখেছিলাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মাধ্যমকে, কমই দেখেছি তার আগে বা পরে। অনেকটা তেমনই পাওয়া গিয়েছিল স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সৌরভ গাঙ্গুলির ভারতের দুটি সিরিজে, ভারতে এবং অস্ট্রেলিয়ায়। বলতে দ্বিধা নেই, উপরোক্ত তিনটি টেস্ট সিরিজে যতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ পেয়েছিলাম, কাছাকাছি আনন্দদায়ক তেমন আর পাইনি বললেই ঠিক।
বিশ্বকাপে, মানতে দ্বিধা থাকা উচিত নয় কারও, অস্ট্রেলিয়া অনেকটাই এগিয়ে আছে ইতিহাসের বিচারে। ১১ ম্যাচে আট জয়, পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে সব। কিন্তু পরিসংখ্যান যেমন পুরোটা বলে না, অস্ট্রেলিয়ার ওই দুই জয়ের মধ্যে আছে সাতাশিতে চেন্নাই এবং বিরানব্বইতে ব্রিসবেনে ১ রানে জয়। দুটি ম্যাচই জিততেই পারত ভারত, ব্রিসবেনে তো অস্ট্রেলিয়াকে জিতিয়েছিল রিচি বেনোর সেই রেইন-রুল, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাঙালিরাও যাকে ‘বেনোজল’ হিসেবেই মনে রাখতে চেয়েছে।
আর মনে থেকে যাবে জোহানেসবার্গ, চিরকাল। বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, সৌরভ গাঙ্গুলির হোটেলের ঘরে ম্যাচশেষে ভারতীয় সাংবাদিকদের একত্রিত হওয়া, নীরব নিথর শোক পালন।
কেউ কেউ যে এখনই বলছেন, ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের মহড়া দেখতে চলেছে লন্ডন রবিবার, খুব একটা ভুল বলছেন কি?
অস্ট্রেলিয়া গতবারের চ্যাম্পিয়ন। ভারত গতবারের সেমিফাইনালিস্ট, হেরেছিল সেই অস্ট্রেলিয়ার কাছেই, সিডনিতে। এবার ভারতের অধিনায়ক বদলেছে, কিন্তু সেই অধিনায়ক এখনো আছেন প্রচ্ছন্নভাবে সেই ভূমিকাতেই। সাজঘরে যা-ই ঘটুক না কেন, মাঠে বিরাট কোহলি এবং মহেন্দ্র সিং ধোনির রসায়ন দেখার মতোই। ‘সিনিয়র’ এবং বিশ্বজয়ী অধিনায়ক ধোনিকে সেই সম্মান দেন কোহলি, নিঃশর্ত। নিজের প্রথম বিশ্বকাপে (২০১১) বিরাট ছিলেন বিশ্বজয়ী দলের সদস্য এবং সেই দলের সবচেয়ে বর্ষীয়ান সদস্য শচীন তেন্ডুলকারকে কীভাবে সম্মানিত করেছিলেন সেই দলের সদস্যরা, বিরাট দেখেছিলেন। কোনো নশ্বর মানুষের পক্ষেই হয়তো শচীন হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রভাবে ভারতের এই দলে ধোনির জায়গাটাও অনেকটাই তেমন, হয়তো আরও বেশিই।
সঙ্গে বিরাটের জয়ের সুতীব্র ইচ্ছে, যা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছিল ইংল্যান্ডে, অস্ট্রেলিয়ায়Ñ টেস্ট সিরিজে, যা তাকে এখন তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিশ্বকাপে। প্রথম ম্যাচে তার ব্যাট থেকে তত বেশি রান আসেনি, ঠিক। কিন্তু প্রতিযোগিতা তো আর শুধু প্রথম ম্যাচটাই নয়। এবার তো আরও বেশি। কারণ, নয় ম্যাচের গ্রুপ লিগে ঘুরে দাঁড়ানো এবং ফিরে আসার যথেষ্ট সুযোগই আছে। ম্যাচটা শুরুর দিকে হয়ে যাওয়ায় তাই সুবিধা দুই দলেরই।
ভারতীয় দলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলাই ঠিক। ভুবনেশ্বর কুমারই আবারও সম্ভবত খেলবেন মহম্মদ সামির পরিবর্তে, আকাশ মেঘলা থাকার সুবিধা নিতে। অস্ট্রেলিয়া আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, শেষ এক দিনের সিরিজে ভারতের মাটিতে ০-২ পিছিয়ে থেকেও ৩-২ জয়, তা-ও ডেভিড ওয়ার্নার আর স্টিভেন স্মিথকে ছাড়াই, বল-বিকৃতি বিতর্কে যারা নির্বাসিত ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সেই সময়। ভারতীয়রা তেমনই তুলে আনছে ব্রেনফেড বিতর্ক, স্মিথকে ঘিরেই।
বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকুক বা না, রবিবারের ম্যাচে যা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী নির্ভুল প্রমাণিত হবেই, উত্তেজনার উপস্থিতি। এই মুহূর্তে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে ক্রিকেট মাঠে ভারত আর অস্ট্রেলিয়া মুখোমুখি হলে যা অনিবার্য!