আগুনে পুড়িয়ে মারার নৃশংসতা থামান

নোয়াখালীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা দেশের মানুষকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। এ ঘটনার নৃশংসতায় শিউরে উঠেছে অনেকে, প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, সোনাগাজী হত্যার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও এক স্কুলছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলো। এবারের ঘটনাটি রাজবাড়ী জেলার সদর ইউনিয়নের পাচুরিয়া গ্রামের। শুধু পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা নয়, এ ঘটনায় একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। প্রথমে ছাত্রীটিকে একজন নারী প্রতিবেশীর সহায়তায় লাঞ্ছিত করা হয়েছে। জোর করে আপত্তিকর ছবি তুলে অনলাইনে প্রকাশ করার হুমকি দেওয়া হয়েছে এরপর। ওই সব ছবি প্রকাশের হুমকি দিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টার পর তাকে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এতগুলো অপরাধ সংঘটিত করার পরে ঘটনার সঙ্গে জড়িত রাজু নামক ওই দুর্বৃত্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি প্রদান করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

 

নুসরাত হত্যার পর এমন আরেকটি পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুললো। হঠাৎ যেন নৃশংসতা ও পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। বিকৃত রুচির একশ্রেণির মানুষের বিকৃতি থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরাও। ঘর-বাইরে সব স্থান নারী ও শিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে ৩৯৬ জন নারী ও মেয়েশিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৩৯টি এবং হত্যা মামলা হয়েছে ৩৫১টি। বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারা দেশে ৪৭ শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ৪৭ শিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩৯ জন।

 

গণপরিবহনেও যৌন হয়রানির ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে চলন্ত বাসে ধর্ষণ এবং হত্যা করে ফেলে দেওয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে। রূপা আক্তার, জরিনার পর সর্বশেষ কটিয়াদীতে তানিয়া নামের একজন নার্সকে ধর্ষণের পর হত্যা করে বাস থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনা সারা দেশে আলোচিত হয়েছে। একসময় অ্যাসিড সন্ত্রাসের মাধ্যমে নারীর প্রতি ভয়াবহ নৃশংসতা চালানো হতো। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে জোরালো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া এবং সামাজিক প্রতিরোধের ফলে এই ধরনের পাশবিক অপরাধের হার অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। চলন্ত বাসে ধর্ষণ-হত্যার ধরনকেও এ রকম কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে রোধ করা যেতে পারে। পাশাপাশি, এ ধরনের অপরাধের এবং এমন মনোবৃত্তির অন্তর্নিহিত সামাজিক কারণ অনুসন্ধান এবং তার প্রতিকারে করণীয় ঠিক করতে হবে।

 

নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনাটিকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করায় এর তদন্ত ও বিচারকার্যের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগশন বা পিবিআই ১৬ জন আসামিকে তদন্তের ভিত্তিতে অভিযুক্ত করেছে। ১০ জুন আদালতে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। এই মামলার বিচারকাজ ১৮০ দিন বা ৬ মাসে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। এখন নুসরাত হত্যার বিচার এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি প্রদানের ব্যাপারটি যত দ্রুত নিষ্পন্ন করা যাবে ততই তা ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মতো আরও যেসব ঘটনা ঘটেছে বা ঘটছে সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। কিন্তু নুসরাতের ঘটনায় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তার পালিয়ে যাওয়া নিরাশ করার মতো ঘটনা।

 

রাজবাড়ীর পাচুরিয়াতে একজন ছাত্রীকে যেভাবে নুসরাতের মতো করে হত্যা করার চেষ্টা হলো, যেভাবে তাকে নির্যাতন ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে হলো তা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। যেকোনো মূল্যে এ ধরনের অপরাধ রোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা যেমন দরকার তেমনি দরকার আইনের কঠোর প্রয়োগ। দ্রুততম সময়ে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে এ ধরনের অপরাধের বিহিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।