ইংল্যান্ডের বনেদি ও পুরনো এক শহর ব্রিস্টল। বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত গ্রাফিতি আর্টিস্ট বাংকসি এখানে জন্মেছেন। সে কারণেই কি না, ব্রিস্টল শহরের প্রায় প্রতিটি দেয়াল রঙিন, আঁকিবুঁকিতে ভরা। বাংকসির শহর আরও একবার বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে রাঙিয়ে দিতে পারে। এবারের বিশ্বকাপে টাইগারদের চার নম্বর ম্যাচটি এখানেই, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। যে ম্যাচটি টুর্নামেন্টে দলের অবস্থান বিবেচনায় মহাগুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিস্টল থেকে বাংলাদেশের দুটি পয়েন্ট চাই-ই চাই। আগের সেরা অর্জন ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার যে লক্ষ্য, শ্রীলঙ্কার কাছে পয়েন্ট হারালে তা ফিকে হয়ে যাবে। বৃষ্টি চোখ রাঙাচ্ছে, তাতে পুরো দলে দুশ্চিন্তা বেড়েছে। ওভালে নিউজিল্যান্ড ম্যাচের আগের দিন সোমবারের স্বস্তি ছিল বদ্ধ ঘরের বাইরে এসে মাঠে অনুশীলন করা। আবহাওয়ার কারণে ওভালে নিউজিল্যান্ড ম্যাচের আগে এবং কার্ডিফে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচ খেলার আগে সেন্টার উইকেটে অনুশীলন করতে পারেনি বাংলাদেশ। দুটি ম্যাচেই হার জুটেছে। সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে গতকাল পুরো দলই চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় অনুশীলন করেছে। বিশেষ করে তামিম ইকবালের প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কার্ডিফ থেকে ফিরে রবিবার দল বিশ্রামে ছিল। কিন্তু তামিম প্রায় দুই ঘণ্টা সময় কাটিয়েছেন ইনডোরের নেটে। গতকাল পুরো দল মাঠে আসার অনেক আগেই ব্যাটিং কোচ নিল ম্যাকেঞ্জিকে নিয়ে অনুশীলনে এসেছেন তামিম। এক ঘণ্টারও বেশি সময় সেন্টার উইকেটে নানারকম বোলিংয়ের বিপক্ষে ব্যাট করেছেন, ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে নিজের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার কারণও আছে। এই বিশ্বকাপে এখনো পর্যন্ত তামিমের রান মাত্র ৫৯, গড় উনিশের সামান্য বেশি। এটি এই বাঁহাতি ওপেনারের চতুর্থ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে ২৪ ইনিংসে তামিমের রান মাত্র ৫৪২; তিনটি ফিফটি থাকলেও সেঞ্চুরি নেই। যেখানে তার ওয়ানডে গড় ৩৬; ২০১৫ বিশ্বকাপের পর এবারের আসর শুরুর আগ পর্যন্ত চার বছরে গড় ৫৪-এর ওপরে। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১১টি সেঞ্চুরির ৭টিই পেয়েছেন এই সময়ে। তাই তামিম ইকবালের রানের মধ্যে না থাকা দলের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও কম দুশ্চিন্তার জোগান দিচ্ছেন না। তাদের প্রতি অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার সম্পূর্ণ আস্থা আছে, ‘তামিম গত চার বছরে আমার মনে হয় দলের সেরা ব্যাটসম্যান। এখন শেষ তিন ম্যাচে ওর সেরাটা আমরা পাইনি। আমি নিশ্চিত যে, এজন্য ওরই সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগছে। আর তামিম যদি অনুশীলন নাও করত, সে যে ড্রেসিংরুমের জন্য আদর্শ না, তাও ঠিক না। আমি নিশ্চিত যে, সে বের করার চেষ্টা করছে কীভাবে সে বড় রান করতে পারবে। আমার মনে হয় সবাই সবার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।’
ব্রিস্টলে শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি আরেক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা দিয়েছে আবহাওয়া। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ দলের বড় শত্রু এখানকার ভেজা আকাশ। সোমবার দুপুর পর্যন্ত মেঘ-রোদের লুকোচুরি খেলা ছিল। দুপুর ২টার পর শুধুই মেঘের রাজত্ব। যে রাজত্ব থেকে বৃষ্টির সঙ্গে হাড় কাঁপানো শীতের উৎপত্তি। ঠাণ্ডা হাওয়া চোরা কাঁটার মতো এসে হাড়ে বিঁধে যায়। ব্রিস্টলে পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা ম্যাচের পয়েন্ট ভাগাভাগি হয়েছে। আজ দিনভরই বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। তিনটি করে ম্যাচ শেষে লঙ্কানদের পয়েন্ট ৩, বাংলাদেশের ২। টুর্নামেন্টের যে পরিস্থিতি, পয়েন্ট হারালে ক্ষতি। বাংলাদেশ অধিনায়ক চান ম্যাচটা হোক, ‘ম্যাচটা না হলে আমাদের জন্য সমীকরণটা অনেক কঠিন হবে। আগের দুটির একটি জিতলে এতটা প্রয়োজন হয়তো থাকত না। কিন্তু এখন খুবই প্রয়োজন ম্যাচটা হওয়ার, আমরা খুব চাচ্ছি ম্যাচটা যেন হয়। কিছু বিষয় আমাদের বিপক্ষে থাকতে পারে, কিন্তু দিন শেষে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন আমরা জিততে পারি। তাই প্রথম বল থেকেই আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।’
সিমিং কন্ডিশনে দুজন মিনি অলরাউন্ডারসহ নয় ব্যাটসম্যান খেলানোর রক্ষণাত্মক চিন্তা নিয়েই গত তিনটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। যা নিয়ে অল্প-বিস্তর সমালোচনাও হয়েছে। ব্রিস্টলে রুবেল হোসেন বেশ সময় নিয়ে নেটে বোলিং করেছেন, সাব্বির রহমান নেট করার পরে এসে নক করেছেন। একাদশে পরিবর্তন হলে এ দুজনকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে একাদশে পরিবর্তন নিয়ে অবশ্য মাশরাফী তেমন কিছু বলেননি, ‘একাদশে পরিবর্তন আমার একার সিদ্ধান্ত না। সেটা টিম ম্যানেজমেন্টের সবাই মিলে আলোচনার ব্যাপার। একাদশ পরিবর্তন সবসময় টিমের জন্য ভালো কিছু হয় না। প্রয়োজন হলে সবাই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।’
সাকিব আল হাসান ছাড়া কোনো বোলারই ধারাবাহিক পারফর্ম করতে পারছেন না। বিশ্বকাপে এখনো পর্যন্ত মাশরাফী নিজের ছায়া হয়ে আছেন। প্রথম দুই ম্যাচে ১০ ওভারের কোটা পূরণ করেননি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তুলনায় যথেষ্ট ভালো করেছেন। কিন্তু বোলার মাশরাফীকেও দলের বড্ড প্রয়োজন। তিনি কি ‘নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন’ হিসেবে খেলছেন বা তার ভূমিকা কী? প্রশ্নটা করেছিলেন একজন শ্রীলঙ্কান সাংবাদিক। উত্তরে মাশরাফী বলেছেন, ‘গত চার-পাঁচ বছরে অধিনায়কত্ব করার সময় অনেক ম্যাচেই আমি আমার ওভার শেষ করতে পারিনি। এটা নির্ভর করে মাঝামাঝি সময়ে কে ভালো করছে সেটার ওপর। প্রথম দুই ম্যাচে ওই সময় মোসাদ্দেক দলের জন্য ভালো করছিল। সেটাই ছিল মূল বিষয়। গত ম্যাচে শেষ দুই ওভার ছাড়া মনে হয় বোলার হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।’
এক সময় শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের জন্য প্রবল প্রতিপক্ষ ছিল। সাঙ্গা-মাহেলা যুগের পর সেই চিত্র মোটামুটি বদলে গেছে। এ সময়ে বাংলাদেশই বেশি দাপট দেখাচ্ছে। গত এশিয়া কাপেও মুশফিকুর রহিমের বীরত্বপূর্ণ সেঞ্চুরিতে বাঘের থাবায় সিংহরা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। বর্তমান লঙ্কান হেড কোচ চন্ডিকা হাথুরাসিংহে চার বছরেরও বেশি সময় বাংলাদেশ দলের কোচ ছিলেন। তিনি এই দলের প্রত্যেকের সবল এবং দুর্বল দিক সম্পর্কে অবগত। যা শ্রীলঙ্কাকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। তিনি শ্রীলঙ্কার কোচ হওয়ার পর দুই দল চারটি ওয়ানডে খেলেছে। যাতে জয়-পরাজয় সমানে সমান। আজকের ম্যাচে বর্ষীয়ান পেসার লাসিথ মালিঙ্গার দিকে তাকিয়ে আছে শ্রীলঙ্কা। সংবাদ সম্মেলনে এ কথাই জোর দিয়ে বলছিলেন দলটির ইংলিশ ব্যাটিং কোচ জন লুইস। তারা বড় পারফরম্যান্স আশা করছে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস, থিসারা পেরেরাদের কাছ থেকেও, ‘অবশ্যই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলোতে বাংলাদেশই দাপট দেখিয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের ম্যাচের চাপ অন্যরকম। আশা করি লাসিথ আর অ্যাঞ্জেলোর মতো পারফরমাররা বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।’ টাইগারদের বিপক্ষে খেলতে নামার আগে লঙ্কানদের কাছে বড় আঘাত হয়ে এসেছে একটি ইনজুরি। অনুশীলনের সময় ডানহাতি পেসার নুয়ান প্রদীপের আঙুলের হাড় ভেঙে গেছে। যে কারণে এ ম্যাচে খেলতে পারবেন না আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৪ উইকেট নিয়ে জয়ের অন্যতম নায়ক প্রদীপ।
ব্রিস্টলের কাউন্টি ক্রিকেট গ্রাউন্ট বাংলাদেশের জন্য স্মরণীয় এক ভেন্যু। টাইগাররা এখানে যেকোনো পর্যায়ের ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয় পেয়েছিল। ২০১০ সালে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে ইংল্যান্ড সফরে আসে বাংলাদেশ। তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ২৩৬ রানের সংগ্রহ নিয়েও ৫ রানের জয় এসেছিল। অধিনায়ক হিসেবে ওটাই ছিল মাশরাফীর প্রথম জয়। ব্যাট হাতে ২২ রান করার পর ৪২ রান খরচায় ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন তিনি। ম্যাচসেরা হওয়ার পেছনে অধিনায়কত্বেরও বড় অবদান ছিল। সেই মাশরাফী অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন অধিনায়ক হিসেবে আরও পরিণত। গত চার বছরে বাংলাদেশকে বিশ্ব ক্রিকেটে সমীহের চোখে তাকানোর মতো দল তিনিই গড়ে তুলেছেন। সবসময় পারফরম্যান্স দিয়েই নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করেছেন। ব্রিস্টলে সেরকম কিছুরই অপেক্ষায় আছেন তিনি। বাংলাদেশও নয় কি?