বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ও এর সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধে চীনের ব্যবসায়ী লিও ঝুয়াং লিফেংয়ের বাংলাদেশে পোশাক ব্যবসায় প্রবেশ ও এর পরবর্তী অবস্থাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়। নিবন্ধে বলা হচ্ছে, ‘মেড ইন চায়না’ যুগের স্থানে এখন শুরু হয়েছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ যুগের।
১৯৯৭ সালে ঝুয়াং যখন ঢাকায় ব্যবসা শুরু করেন, তখন বাংলাদেশে চীনা মালিকানাধীন কারখানার সংখ্যা ছিল ২০ থেকে ৩০টি। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা প্রায় ৪০০ ছাড়িয়েছে। চীনের ঋণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এক দশক ধরে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বেড়েছে ৬ শতাংশ, যা চলতি বছরে ৮ দশমিক ১ শতাংশ ছাড়াতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থায় থাকার কারণে প্রশাসনের পক্ষে
ঋণ সামলানো সম্ভব। তথ্যমন্ত্রী আরও পরিষ্কার করে বলেন, বাংলাদেশ কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না। তবে কোনো দেশ বাংলাদেশের উন্নয়নকে সমর্থন করতে চাইলে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের চমৎকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে। যে পরিস্থিতিই হোক আমরা চীনের ঋণ পরিশোধ করতে পারব। বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ চীনের কথিত ঋণ-ফাঁদ এড়াতে সক্ষম হয়েছে অন্য দেশের সঙ্গে (বিশেষ করে ভারত) অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের মধ্য দিয়ে।
প্রতিদ্বন্দ্বী জাকার্তা, ম্যানিলা ও নমপেনের তুলনায় ঢাকার অবকাঠামো কিছুটা দুর্বল। কর্মব্যস্ত দিনে ঢাকার রাস্তায় ৫০ কিলোমিটার যেতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। কিন্তু তারপরও হংকংয়ের ফেলিক্স চ্যাং ইয়ো চংয়ের মতো ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। চ্যাং বলেন, ‘১০ বছর আগে আমার দেশে শ্রমমূল্য বেড়ে যাওয়ায় এশিয়ার কোথাও কারখানা স্থানান্তরের চিন্তা আসে। এটা শুধু শ্রমমূল্য অধিকের বিষয় নয়, পাশাপাশি সামাজিক সুবিধাও, যা আমাদের শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজন।’
বাংলাদেশে একজন পোশাকশ্রমিককে মাসে ন্যূনতম ৯৫ ডলার বেতন দিতে হয়, যা এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। কম্বোডিয়ায় মাসে ১৮২, হ্যানয় ও হো চি মিন সিটিতে ১৮০ ও মিয়ানমারে ১০৮ ডলার দিতে হয়। বাংলাদেশে এখন ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাকশিল্প বিকাশ করেছে, যা দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশ। তবে শ্রমমূল্য বৃদ্ধির দাবিতে দেশের পোশাকশ্রমিকরা গত জানুয়ারিতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তখন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেক শ্রমিক আহত হন।
চীনা ব্যবসায়ীরা কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে বিনিয়োগে আগ্রহী নন। এই দুই দেশে বাংলাদেশের তুলনায় শ্রমমূল্য বেশি এবং শ্রমিক ইউনিয়ন বেশ শক্তিশালী। কম্বোডিয়ায় জনসংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ প্রায়। আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি, এদের মধ্যে ৫৭ শতাংশেরই বয়স ২৫ বছরের নিচে। বাংলাদেশের শ্রমিকরা তুলনামূলক অদক্ষ হলেও এরা বয়সে তরুণ, যা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আকর্ষণ করে।
হংকংয়ের ব্যবসায়ী ডেভিড ল্যাম মিং হেউং বলেন, ‘১৯৭০ সালের চীনের মতো অবস্থা এখন বাংলাদেশের। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ চীনা মডেল অনুসরণ করছে।’ ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সফরের পর বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ৫০৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক অধ্যাপক ব্রহ্ম চেল্লানির মতে, বাংলাদেশের মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১৪ শতাংশের সমান। ঋণের এমন মাত্রা সহনীয়। বাংলাদেশ এটা নিশ্চিত করতে চায় যে তাদের ঋণের মাত্রা সব সময়ই পরিশোধ করার সক্ষমতার মধ্যে থাকবে। তাই বাংলাদেশ চীনের অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক ডেভিড লুইস বলেন, বাংলাদেশ তার রপ্তানি কৌশলের কারণে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। রপ্তানির ওপর ভিত্তি করে দেশটি গত কয়েক বছরে বেশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, বিশেষ করে পোশাক খাতে। এ ছাড়া রেমিট্যান্স থেকেও দেশটি ভালো আয় করা ছাড়াও ভারতের শক্তিশালী অর্থনীতির কারণেও সুবিধা পাচ্ছে।
চীনের পরই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ। চলতি বছর বাংলাদেশ ৩৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির আশা করে। ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায় দেশটির সরকার।