প্রণোদনার প্রভাব নেই পুঁজিবাজারে

বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য প্রণোদনায় চমক থাকবে গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে এমন আশ^াস দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী অ হ ম মুস্তফা কামাল। আর এই চমক ছিল তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোনাস লভ্যাংশ ও রিজার্ভের ওপর কর প্রদানের মাধ্যমে। মূলত বেশি পরিমাণে নগদ লভ্যাংশ যাতে কোম্পানিগুলো দেয়, তা নিশ্চিত করতেই এমন প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী। তবে পুঁজিবাজারে এর উল্টো ফল দেখা গেছে। বাজেট প্রস্তাবের পরবর্তী দুই কার্যদিবসেই সূচকের বড় পতন হয়েছে। দুই দিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক হারিয়েছে ৯৯ পয়েন্ট।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণের সহজ পদ্ধতি হচ্ছে বোনাস ইস্যু করা। একইভাবে পুঞ্জীভূত মুনাফাসহ যে রিজার্ভ, তাও ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হয়। অথচ নগদ লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে গিয়ে রিজার্ভ ও বোনাস লভ্যাংশের ওপর করারোপের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করা হয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। এ ক্ষেত্রে বোনাস ইস্যুতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নেওয়া পদক্ষেপই যুক্তিযুক্ত ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। পরবর্তীকালে বাজেট প্রস্তাবে বোনাস লভ্যাংশের ওপর করারোপ করায়, তা সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেকে।

এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বোনাস ইস্যুর ওপর এসইসি যে শর্তারোপ করেছিল তা অনেক বেশি যৌক্তিক ছিল। এখন বাজেটে বোনাস লভ্যাংশের ওপর করারোপ করায় তা তালিকাভুক্ত কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। আর রিজার্ভের ওপর কর বসানোর বিষয়টি দ্বৈতকরের পর্যায়ে পড়ে গেছে। কারণ নিট মুনাফার ওপর একবার কোম্পানি কর দিয়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে প্রণোদনার অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোনাস লভ্যাংশ ও পরিশোধিত মূলধনের অর্ধেকের বেশি রিজার্ভের অতিরিক্ত অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপ করা হয়। মূলত বেশি পরিমাণের নগদ লভ্যাংশ নিশ্চিত করতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ ছাড়া বাজেটে করমুক্ত লভ্যাংশ আয়ের সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। দ্বৈতকর পরিহারের কথাও বলেছেন। এ ছাড়া দর কষাকষির মাধ্যমে ও কিছুটা বিনিয়োগ সুবিধা দিয়ে তালিকাভুক্ত কোনো রুগ্ণ কোম্পানিকে সচ্ছল কোম্পানি কর্তৃক আত্তীকরণের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। নিবাসী ও অনিবাসী সব কোম্পানির ক্ষেত্রে ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর একাধিকবার করারোপ রোধ করার বিধান কার্যকর করা হবে। তবে আসন্ন বাজেটে প্রস্তাব দেওয়া এসব প্রণোদনার কোনো প্রভাব পড়েনি পুঁজিবাজারে। প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসে অধিকাংশ শেয়ারের দরপতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমে ৪৩ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট। আর গতকাল দ্বিতীয় কার্যদিবসে প্রায় ৬৭ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে সূচকটি কমে ৫৫ পয়েন্ট। বাজেট প্রস্তাবের আগে অর্থমন্ত্রী প্রণোদনায় চমক দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাজেট উপস্থাপনের পর তাতে বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়েছেন। বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে খাতওয়ারি কোনো প্রণোদনা না থাকায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের তা প্রভাবিত করতে পারেনি।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের দিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়, যা দিনশেষে অব্যাহত থাকে। খাদ্য, ব্যাংক, এনবিএফআই, প্রকৌশল, জ¦ালানি ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৫৩টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর হারিয়েছে ২৩৫টি,  বেড়েছে ৭৭টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ৪১টির দর। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) কেনাবেচা হওয়া ২৭০টি সিকিউরিটিজের দর বেড়েছে মাত্র ৬৯টির। বিপরীতে দর কমেছে ১৮০টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ২১টির। স্টক এক্সচেঞ্জটির নির্বাচিত খাতগুলোর সূচক কমেছে ৮২ পয়েন্ট। এদিকে দরপতন হলেও ডিএসইতে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

গতকাল লেনদেন ৫০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৫৩৫ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ৯৩ লাখ টাকা বেশি। সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে জীবন বীমা খাতে। গতকাল ডিএসইর মোট লেনদেনের ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। এ ছাড়া লেনদেনের ১৫ শতাংশ এসেছে বস্ত্র খাত থেকে। এর বাইরে ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রকৌশল, জ¦ালানি ও ব্যাংক খাতে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে।