ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের অবস্থা আমাকে আহত করে

যদি বর্তমান ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের তুলনা করেন?

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট? যদি বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে বলি, দুই দলেরই অনেক বিষয়ে কাজ করার আছে। তারা আইসিসি র‌্যাংকিংয়ের নিচের দিকে আছে। সেটা ব্যাপার না। র‌্যাংকিংয়ে যারা ওপরে আছে, তাদের হারিয়ে পয়েন্ট অর্জন করে সামনে এগোতে হবে।

আপনার দীর্ঘদিনের বোলিং পার্টনার কোর্টনি ওয়ালশ এখন বাংলাদেশের হয়ে কাজ করছেন। ব্যাপারটা কীভাবে দেখেন?

কোর্টনি ওয়ালশ একজন লিজেন্ড। তার বিশ্বকাপ সম্পর্কে অনেক জ্ঞান আছে, যেটা অবশ্যই বাংলাদেশকে সহায়তা করছে। আমি নিশ্চিত, তার অনেক কিছু দেওয়ার আছে। সে যদি সাধ্যমতো দিতে পারে এবং বোলাররা তা নিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ফাস্ট বোলারদের ওপর তার প্রভাব থাকবে। আশা করি, তাদের ফাস্ট বোলিং যেখানে আছে, সেখান থেকে আরও ভালো জায়গায় যাবে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের পতন আপনাকে কি আহত করে?

অবশ্যই আহত করে। একসময় আমরা বিশ্বের সেরা ক্রিকেট দল ছিলাম। তাও সেটা অনেক অনেক বছরের জন্য। সেখান থেকে আমাদের ক্রিকেট এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। খুব আহত হই, কারণ আমি এই দলের হয়ে খেলেছি। আমি জানি কীভাবে সেরা দল হতে হয়, সেরা দলে খেললে কেমন অনুভূতি হয়। দলে এখনো প্রতিভার অভাব নেই। আমাদের শুধু অবকাঠামোর উন্নয়ন দরকার, যাতে প্রতিভার যতœ নিতে পারি। অবকাঠামো ঠিক করার চেষ্টা চলছে। সেটা ঠিকঠাক হলে, আশা করি কয়েক বছরের মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ব ক্রিকেটে আবার দুর্বার শক্তি হয়ে উঠবে।

গত পাঁচ-ছয় বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পারফরম্যান্সকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেক উন্নতি করেছে, কোনো সন্দেহ নেই। যখন আমি তাদের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছি, তখনকার চেয়ে এখন অনেক পরিণত। বিশেষ করে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টিতে তারা এখন অনেক শক্ত প্রতিযোগী। কিন্তু টেস্টে উন্নতি করতে হলে আরও কিছু জায়গায় কাজ করতে হবে। পাঁচ দিন, অনেক লম্বা সময়। আশা করি, ওই জায়গাতেও তারা উতরে যাবে। আমার মনে হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে নয়টি ওয়ানডে খেলেছে, ভুল না হলে এর নয়টিও ওরা জিতেছে (এ কথা বলার সময় টনটনে দুই দলের বিশ্বকাপ ম্যাচ চলছিল)। এই তথ্যই প্রমাণ করে, তারা কতদূর এগিয়েছে। এখন তারা যেকোনো দলকেই হারানোর ক্ষমতা রাখে।

আপনার সময়ের চেয়ে ক্রিকেট এখন অনেক বদলে গেছে। টি-টোয়েন্টি বেশি খেলা হচ্ছে। অতিরিক্ত খেলা হওয়ার কারণেই কি সত্যিকার ফাস্ট বোলার এখন কম দেখা যায়?

না, আমি তা মনে করি না। যদি দলগুলোর দিকে তাকান, প্রায় প্রতিটি দলেই অন্তত দুজন ভালোমানের ফাস্ট বোলার আছে। সমস্যা হলো, এখন বেশিরভাগ পিচই ধীরগতির। যে কারণে বেশিরভাগ দলই স্পিনারদের দিকে ঝুঁকছে। এই বিশ্বকাপের কথাই ধরুন, আমরা আগে থেকেই জেনে এসেছি এই টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলোতে বড় স্কোর হবে। কিন্তু ওরকম হচ্ছে কি? পিচ থেকে তো ফাস্ট বোলাররাও মোটামুটি সহায়তা পাচ্ছে। বড় রানও হচ্ছে। এটা ভালো। ব্যাট এবং বলের ভালো লড়াই দেখা যায়। ফাস্ট বোলারের অভাব নেই। যদি পিচগুলো আরও ভালো হয়, তাহলে আমরা আরও ফাস্ট বোলার দেখতে পাব।

দ্রুতগতি বা সুইংয়ের জায়গায় আপনার সময়ের চেয়ে তো এখন সেøায়ার বলের ব্যবহার অনেক বেশি হচ্ছে। নাকি?

দেখুন, গ্রেট ফাস্ট বোলার হতে আপনাকে ঘণ্টায় ৯০ মাইল গতিতে বল করার দরকার নেই। আপনি ঘণ্টায় ৯০ মাইল গতিতে বল করলেন, কিন্তু লাইন-লেন্থ এলোমেলো থাকল, সেটা পুরোই সময়ের অপচয়। তারচেয়ে আপনি যদি ৮০ মাইল গতিতে বল করে সুইং করাতে পারেন, সিমের ব্যবহার করতে পারেন এবং উইকেট তুলে নিতে পারেন, সেটা অনেক ভালো। একজন গ্রেট ফাস্ট বোলারের মূল ভিত্তি গতি নয়। যদি গতি থাকে, সেটা সহযোগিতা করে। কারণ ব্যাটসম্যানরা বাড়তি সতর্ক থাকে। একজন ফাস্ট বোলারের মূল ভিত্তি হলো ধারাবাহিকভাবে ঠিক লাইন-লেন্থে বল করতে পারা। তাহলেই কেবল উইকেট পাওয়া যায়।

আপনার সময়ের চেয়ে ক্রিকেট কি তার আকর্ষণ হারিয়েছে, বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেট?

আমার মনে হয় না, লোকজন যতটা বলে, টেস্ট ক্রিকেট ততটা আকর্ষণ হারিয়েছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অ্যাডভেঞ্চার এনেছে এবং লোকজন এই ক্রিকেট দেখতে ভালোবাসে; উপভোগ করে। আমি তো দেখি নিয়মিতই দারুণ সব টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে। আমার মনে হয়, টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানো দরকার। খেলাটাকে আরও আকর্ষণীয় করা দরকার। দুই-তিন দিনে টেস্ট ম্যাচ শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার চার-পাঁচটা সেঞ্চুরি হচ্ছে, যে কারণে ম্যাচে ফল হচ্ছে না। স্কোরিং, ওভার এগুলোর ওপর নতুন কোনো নিয়ম খুঁজে নিয়ে তা চালু করে টেস্ট ক্রিকেটকে আরও আকর্ষণীয় করা উচিত। তাতে করে আমরা আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক টেস্ট ক্রিকেট দেখতে পাব।

ওয়েস্ট ইন্ডিজে এখন ক্রিকেটের সার্বিক অবস্থাটা কেমন?

ওয়েস্ট ইন্ডিজে ক্রিকেটের চিত্রটা যেরকম হওয়া উচিত, অতীতের সঙ্গে তুলনা করলে দুঃখজনক হলেও সত্যি ওরকম অবস্থায় নেই। অতীতে বিশ্ব ক্রিকেটকে আমরা দারুণ সব গ্রেট ক্রিকেটার উপহার দিয়েছি। এখন তরুণদের অন্য খেলাগুলোর দিকে ঝোঁক বেশি। ক্রিকেটের কাঠামোটা ঠিক করলে, সাফল্য পেলে আকর্ষণটা বাড়বে। সেজন্য ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট ঢেলে সাজানো উচিত, যেন তরুণদের দৃষ্টি ক্রিকেটে ফেরে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রতিভার অভাব কখনই ছিল না।

টি-টোয়েন্টি খেলতে পারলে কেমন লাগত?

হা হা হা। বেশ লাগত। কারণ আমাকে মাত্র চার ওভার বোলিং করতে হতো। হা হা হা... সিরিয়াসলি বলি, এটা খুব চ্যালেঞ্জিং হতো। কারণ টি-টোয়েন্টি সত্যি সত্যিই ব্যাটসম্যানদের খেলা। ছোট্ট বাউন্ডারি এবং সবাই এখানে চার-ছক্কা দেখতে আসে। খেলতে পারলে ভালোই হতো, কারণ আমি সবসময় চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি। এবং আমি অবশ্যই ভালো করতাম।

তো, আপনার মিউজিশিয়ান-জীবন কেমন চলছে?

মিউজিক? মিউজিক খুব ভালো চলছে তো। এখনো আমার ব্যান্ড অত বিখ্যাত হয়নি। প্রতিনিয়ত আমাদের ব্যান্ড ভালো করছে। আশা করি একদিন এটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাবে।

শুনেছি, স্যার কার্টলি অ্যামব্রোসের সাক্ষাৎকার নেওয়া তো খুব কঠিন...

না, এটা খুব কঠিন কাজ না। আমি যখন খেলতাম তখন সাংবাদিক এবং সাক্ষাৎকার থেকে দূরে থাকতাম। কারণ আমি আমার সম্পর্কে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। আমি বিশ্বাস করতাম, সাংবাদিক বলুন বা ভাষ্যকার, তারা তা-ই লিখবে বা বলবে যা আমি মাঠে করছি। সেটা আমি নিজে বলতে চাইতাম না। এখন আমি আর খেলছি না, এমনকি এখনো আমি ইন্টারভিউ দিতে পছন্দ করি না। আমার ব্যক্তিগত বিষয় না হলে, বর্তমান ক্রিকেট এবং ক্রিকেটার নিয়ে কথা বলতে চাইলে আমি সাক্ষাৎকার দিই।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাদে কোন চারটি দলকে নকআউট পর্বে দেখতে চান?

ওয়েস্ট ইন্ডিজ? তাদের জন্য সেমিফাইনালে যাওয়া খুব খুব কঠিন। আজ (সোমবার) তাদের বাংলাদেশকে হারাতেই হবে। বাংলাদেশকে বড় ব্যবধানে হারালে এবং আরও কিছু জয় নিজেদের করে নিতে পারলে সেটা সম্ভব হবে। তাদের জিতে যেতে হবে। যদি ক্রিকেটীয় দিক থেকে চিন্তা করি, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ডই সেমিফাইনাল খেলবে। তারা যেরকম ক্রিকেট খেলছে, তাতে তারাই সেমিতে খেলা প্রত্যাশা করে। কিন্তু আমি চাই কিছু অঘটন ঘটুক। অন্য কোনো দল নকআউটে আসুক। তাতে বিশ্বকাপটা আরও আকর্ষণীয় হবে। তবে আমরা মনে হয় না, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এই কাজটা করতে পারবে।

দুজনের মধ্যে কে তুলনামূলক ভালো বোলার, আপনি নাকি ওয়ালশ?

কী? হা হা হা... আমার আর কোর্টনির মধ্যে কে সেরা? আপনি কাকে সেরা মনে করেন?

আচ্ছা, ওয়ালশ আর আপনার সম্পর্কের ব্যাপারে কিছু বলুন।

ও আমার খুব ভালো বন্ধু। সবসময়ের জন্যই বন্ধু। বোলিং পার্টনারশিপের মাধ্যমেই বন্ধুত্বটা গড়ে উঠেছে। আমাদের জুটিটা সত্যিই গ্রেট ছিল। জানেন, আমরা আসলে ভাইয়ের মতো। যদি বোলিংয়ের কথা বলি, আমি ওর মতো বল করতে চাইতাম। ও আমার মতো বল করতে চাইত। তাই এ ব্যাপারে আর কিছু বলার নেই।

আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনাদেরও। ভালো থাকুন।

 

 

স্যার কার্টলি অ্যামব্রোস, বাংলাদেশ দলের বর্তমান পেস বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশের সঙ্গে মিলে যিনি গড়ে তুলেছিলেন কিংবদন্তি এক ফাস্ট বোলিং জুটি। ৯৮ টেস্টে ২০.৯৮ গড়ে ৪০৫টি টেস্ট উইকেটের মালিক তিনি। ১৭৬ ওয়ানডেতে নিয়েছেন ২২৫ উইকেট। খেলোয়াড়ি জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই তার সময়ের সেরা ফাস্ট বোলার হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের একজন অ্যামব্রোস এবার বিশ্বকাপে বিবিসির হয়ে কাজ করছেন। টনটনের কাউন্টি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের প্রেস বক্সের পাশেই কাজ করছিলেন তিনি। খেলোয়াড়ি জীবনে সাক্ষাৎকার দিতেন না, আত্মজীবনীর নাম ‘কার্টলি নেভার স্পিকস’। কিন্তু সাক্ষাৎকারের আবদার করতেই রাজি হয়ে গেলেন। তবে একটি শর্তে, তার ব্যক্তি-জীবন নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। পড়ুন, রুশা আহমেদকে দেওয়া স্যার কার্টলি অ্যামব্রোসের সাক্ষাৎকার...