এই অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের জন্য কতটা শক্তিশালী?

এক ম্যাচ হারলে অতল গহ্বর। রানরেট এগিয়ে রাখতে জয়টাও চাই একটু জুতসই। বৃহস্পতিবার এমন একটি ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে অস্ট্রেলিয়ার মতো দল, যারা বিশ্বকাপে শুধু পাঁচবার চ্যাম্পিয়নই হয়নি; ফাইনাল খেলেছে আরও দুইবার।

চলতি আসরে পাঁচ ম্যাচে একমাত্র ভারতের কাছে হারা এই অস্ট্রেলিয়া তাদের আগের দলগুলোর মতো অতটা পরাক্রমশালী না হলেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষমতা রাখে অনায়াসে। ব্যাট-বলের মৌলিক শক্তিমত্তা একপাশে সরিয়ে রেখে, শুধুমাত্র তাদের মানসিকতার কথাই বলা যায় আলাদা করে। এই ব্যাটিং উইকেটে একমাত্র ভারত ছাড়া কোনো দলকে তারা তিনশ রান করতে দেয়নি। নটিংহ্যামে বিকেল সাড়ে তিনটার ম্যাচে মাঠে নামার আগে বাংলাদেশের তাই মূল চিন্তা থাকবে তাদের বোলিং নিয়ে।

অস্ট্রেলিয়ান বোলাররা কী করতে পারেন, সেটি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দেখা গেছে। বেরিয়ে যেতে থাকা ম্যাচ মিচেল স্টার্ক এক স্পেলে নিজেদের দিকে টেনে আনেন। এভাবে প্রয়োজনের সময় ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার জন্য প্যাট কামিন্স, অ্যাডাম জাম্পারাও যথেষ্ট।

দিনের শুরুতে রোদ থাকলে বল মুভ করাতে অন্যদের কষ্ট হয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান পেসাররা সেটি করাচ্ছেন হরহামেশা। মুভ না পেলে বাউন্সার দিয়ে মাত করছেন। সহজাত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রথম স্পেলে স্টার্ক বাতাসে সুইংও করাচ্ছেন। ডেথ-ওভারে তার ইয়র্কারগুলোও প্রায় অপ্রতিরোধ্য। বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের জন্য এসব রীতিমতো ত্রাসের নাম। পাঁচ ম্যাচে এখনো পর্যন্ত ১৩টি উইকেট নিয়েছেন তিনি।

শেষ ছয় ম্যাচে ১৪ উইকেট নেওয়া কামিন্স আবার একটু ভিন্ন ঘরানার। স্টার্ককে সতর্কভাবে খেললে তাকে খেলতে হবে ‘মহা-সতর্কভাবে’। এই কন্ডিশনে এমন লেংথে বল করছেন, যা খেলতে টেকনিকের সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিতে হচ্ছে ব্যাটসম্যানদের। তার অধিকাংশ ডেলিভারি খুব একটা ‘শর্ট’ কিংবা অতটা ‘ফুল’ নয়। ব্যাটসম্যান ফ্রন্টফুটে যাবেন নাকি ব্যাকফুটে যাবেন ‘ন্যানো’ সেকেন্ডের ব্যবধানে সেটি ঠিক করতে দফারফা অবস্থা হয়। উচ্চতা কাজে লাগিয়ে হুটহাট আবার বাউন্সারও দিয়ে বসেন। টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানদের জন্য আরেক ‘বিশেষ’ ডেলিভারি সাজাতে ওস্তাদ তিনি। গালি এবং স্লিপে ফিল্ডার রেখে বেশ বাইরে বল করেন। লোভনীয় এসব বলে ঠিক মতো পা নিতে না পারলে নির্ঘাত বিপদ।

স্টার্ক, কামিন্সের চিন্তা করতে করতে আলোচনায় চলে আসতে পারেন মার্কাস স্টয়নিস। যে কোনো পজিশনে ব্যাট করতে পারেন। বল হাতে ডেথ-ওভারেও দারুণ কার্যকরী। ইনজুরির কারণে শেষ দুই ম্যাচ খেলতে পারেননি। ঝরঝরে স্টয়নিস বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলবেন বলে শোনা যাচ্ছে। ওদিকে আবার আরেক পেসার নাথান কোল্টার-নাইলও ফিরবেন।

উইকেট একটু স্পিন সহায়ক হলেই কেবল স্বস্তি মিলতে পারে বাংলাদেশ শিবিরে। কিন্তু অতটা ছাড় পাওয়া যাবে না। দলটির বিশেষজ্ঞ স্পিনাররা ইনজুরিতে থাকলেও পার্টটাইমাররা অভাব পুষিয়ে দিচ্ছেন।

লেগব্রেক বোলার অ্যাডাম জাম্পা ছিলেন না শেষ দুই ম্যাচে, এখনো মাঠে নামতে পারেননি অফব্রেক বোলার নাথান লায়ন। তারাও নাকি ফেরার দৌড়ে আছেন!

অস্ট্রেলিয়ার এমন বোলিং খেলতে হলে বিরাট কোহলি, জো রুটের মতো টেকনিক সমৃদ্ধ ব্যাটসম্যান প্রয়োজন। ওই লেভেলের না হলেও সাকিব, তামিম যথেষ্ট অভিজ্ঞ। পার্থক্য শুধু ধারাবাহিকতায়। সাকিব ফর্মের তুঙ্গে। তামিম বড় ইনিংস খেলতে না পারলেও ছন্দে আছেন। আর পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে সৌম্যর স্বাভাবিকতা তো থাকলই। শেষ ম্যাচে শর্ট বলের বিপক্ষে লিটন দাসকেও নির্ভার মন হয়েছে।

এ তো গেল বোলিংয়ের কথা। ব্যাটিংয়ে রয়েছেন দুই বিশ্বমানের মহারথী। একজন ডেভিড ওয়ার্নার। পেস এবং স্পিনের বিপক্ষে ‘প্রায় নিখুঁত’ বলা হয় তাকে। শর্টবল করে পার পাওয়া কঠিন। পুলের মতো ড্রাইভ কিংবা কাটেও দক্ষ। ভারতের বিপক্ষে ৫৬ রানের ইনিংস খেলার পর পাকিস্তানের বিপক্ষে শতক হাঁকান। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটু দ্রুত ফিরে যান। নিশ্চয়ই সেই ঝাল মেটাতে চাইবেন বাংলাদেশের বিপক্ষে!

আরেক জন রয়েছেন ‘অস্থির মানব’ স্মিথ। উইকেটে এত মুভ করেন যে তার বিরুদ্ধে বল করা নিতান্ত দুরূহ কাজ। সব দিকে শট খেলতে পারেন। সিঙ্গেল নিয়ে নিয়ে যেভাবে ম্যাচের ভিত গড়েন, তাতে প্রতিপক্ষ অধিনায়কের বিরক্ত হওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। এসব দক্ষতার কারণে আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান বলা হয় তাকে। ওয়ার্নারের সঙ্গে টেম্পারিং কাণ্ডে অভিযুক্ত হওয়ার আগে ছিলেন আগুনে ফর্মে। তাকেই বলা হতো কোহলির একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। স্মিথের সেই দিন না থাকলেও কম যাচ্ছেন না। ভারতের বিপক্ষে ৬৯ রান করে ম্যাচ প্রায় বেরই করে ফেলেছিলেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে অল্পতে ফেরার পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৭৩ রানের ইনিংস খেলেন।

এত সব চ্যালেঞ্জের ভিড়ে বাংলাদেশের আশা কোথায়?

অস্ট্রেলিয়ার গত দুই দিনের অনুশীলনের খবর রাখলে সেটি খুঁজে পাওয়া যায়। একজন বিশ্বসেরাকে সামলাতে তারা বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার যাকে বলছেন, ‘নিবিড় গবেষণা’

নিজের দিনে সেরা ফিজের সঙ্গে আছেন একজন অধিনায়ক। এই বিশ্বকাপে তিনি একমাত্র পেসার, যিনি ২০০৩ সালের টুর্নামেন্টে খেলেছেন। অধিনায়ক আর ওই বিশ্বসেরার সঙ্গে আছেন আরও দুইজন, তারা এই বিশ্বকাপে দশ দলের সেই ১১ জনের অংশ, যারা খেলেছেন ২০০৭ বিশ্বকাপে।

তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম।