মানবেতর জীবন কাটছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য মো. লুৎফর রহমানের। প্রায় ৬ মাস যাবৎ ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত তিনি। তার পারিবারিক জীবনেও নেমে এসেছে বিপর্যয়। কিন্তু লুৎফর রহমানের খবর কেউ রাখেনি।
জাতির এই সূর্যসন্তানের নিদারুণ কষ্টের দিনলিপি উঠে এসেছে সব্যসাচী ক্রীড়াবিদ ও কোচ কাওসার আলীর ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে। লুৎফর রহমানকে নিয়ে বিকেএসপির সাবেক চিফ হকি কোচ যা লিখেছেন তা দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। লেখার বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল তথা জাতীয় ফুটবল খেলোয়াড় মো. লুৎফর রহমানের খবর কেউ রাখি না: এমন শিরোনাম দিয়ে কাওসার আলী তার লেখাটা শুরু করেন। এরপর লিখেছেন-
‘‘গত ২০জুন ২০১৯ শ্রদ্ধেয় লুৎফর ভায়ের যশোর লোন অফিস পাড়ার বাড়ীতে উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত বেদনার্ত, মর্মাহত এবং লজ্জিত হলাম। দেখলাম জাতি তথা আমাদের যশোরের গর্ব “স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল“ এবং জাতীয় ফুটবল খেলোয়াড় লুৎফর ভাই গত প্রায় ৬মাস যাবৎ ব্রেণ স্ট্রোক এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু শয্যায় শায়িত। তাঁর এ অসুস্থতার সাথে শরীরের মধ্যে যুক্ত হয়েছিল আরও এক মরণ ব্যাধী ডায়াবেটিস। ব্রেণস্ট্রোক এর ঔষধের সাথে সাথে প্রতিদিন ৩বার ইনসুলিন নিয়ে বেঁচে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্টায় ৬৮ বছর বয়সে লুৎফর ভায়ের প্রতিটি ক্ষণ। কি বিচিত্র আমাদের সমাজ আর দুর্ভাগ্য লুৎফর ভায়ের যে এই বেদনার খবর তার পরিবার ছাড়া যশোর তথা দেশের কেউ রাখিনা বা জানিনা। দুর্ভাগা চিত্রটা আরও প্রকট হয়ে উঠলো যখন জানা গেল মাস্টারস পাস করা একমাত্র মেয়ে ফারহানা শারীরিক ও মানসিক অসুস্থ হয়ে মা-বাবার কাছে আশ্রিত। তেমনি একমাত্র পুত্র তানভির ভাগ্যদোষে বেকার হয়ে অসহায়, বিব্রত এবং বিচলিত। গত কয়েক বছর হতেই লুৎফর ভায়ের একমাত্র আয়ের উৎস ব্যবসার ঝুলিও কপাল দোষে গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। অদৃশ্য অনটনের তাড়নায় যন্ত্রনা নিয়ে লুৎফর ভায়ের পরিবারের প্রতিটা সকাল শুরু হয় বটে তবে তা যেন শেষ হতে চায়না।’’
‘‘সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ মোঃ লুৎফর রহমান ১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ডাঃ বরকতুল্লাহ, মাতা মোছাঃ রাবেয়া বেগম। নিবাস লোন অফিস পাড়া, যশোর। মূল নিবাস ঘুরুলিয়া, তালবাড়িয়া, যশোর। মাতার নিবাস, তুলারামপুর, নড়াইল। লুৎফর রহমান নয় ভ্রাতা পাঁচ ভগ্নীর মধ্যে ষষ্ঠ। তিনি এইচ এস সি সম্পন্ন করেছেন। কর্মজীবনে তিনি ব্যবসা করতেন। ১৯৭৭ এ তিনি যশোরের হামিদপুরের সাজেদা রহমানকে বিবাহ করেন। তিনি এক কন্যা ও এক পুত্রের জনক।’’
‘‘লুৎফর রহমান ছোটবেলা থেকে ফুটবল এবং হকি খেলায় আগ্রহী এবং পারদর্শী ছিলেন। যশোর জিলাস্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন তিনি স্কুলের এক খেলায় শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের পুরষ্কার পান। তিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত যশোর জেলা ফুটবল দলের হয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া তিনি ১৯৬৮তে পূর্ব পাকিস্তান বোর্ড দলের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্মিলিত বোর্ডের বিরুদ্ধে খেলেছিলেন। ১৯৬৯তে ঢাকা ওয়ারী ক্লাবে” যোগ দেন এবং ১৯৭০এ দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ এ তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে রাশিয়ার মিনস্ক ডায়নামো ফুটবল দলের বিরুদ্ধে খেলায় অংশ গ্রহণ করেন।’’
‘‘মোঃ লুৎফর দেশ তথা আমাদের যশোরের গর্বিত সন্তান তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের পক্ষে অংশ নিয়ে বিশ্বের দরবারে ক্রীড়ার মাধ্যমে দেশকে মহান স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।’’
‘‘যশোর তথা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের গর্বিত সন্তান মোঃ লুৎফর রমানকে তাঁর প্রাপ্য সম্মাননা আমরা আজও দিতে পারিনি। কেবলমাত্র ১৯৯৭এ লুৎফর রহমানকে যশোর চাঁদের হাট কর্তৃক পদক প্রদানের মাধ্যমে সম্মনিত করা হয়। তিনি যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার ফুটবল উপ-পরিষদের সদস্য ছিলেন।’’