প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে উপজেলা ভোট বিএনপিসহ নিবন্ধিত বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল বর্জন করায় ভোটারদের তেমন সাড়া মেলেনি। পাঁচ ধাপে ৪৫৩ উপজেলায় ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন’ ভোটে বেশির ভাগ জায়গায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন দলটির নেতারাই। এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে গড়ে ৪০ দশমিক ২২ শতাংশ। বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ২৩৩ জন। আর ৩৩ উপজেলায় চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান অর্থাৎ তিন পদের কোনোটিতেই ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটাররা জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ও বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়া নিয়ে খোদ নির্বাচন কমিশনাররাও (ইসি) শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়া উচিত।
প্রথম ধাপে গত ১০ মার্চ ৭৮ উপজেলায় ভোট হয়; ভোট পড়ে ৪৩ শতাংশ, বিনা ভোটে নির্বাচিত হন ২৮ জন। দ্বিতীয় ধাপে ১৮ মার্চ ১১৬ উপজেলায় ভোট হয়; ভোট পড়ে ৪১ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা প্রথম ধাপের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ কম এবং বিনা ভোটে নির্বাচিত হন ৪৮ জন। তৃতীয় ধাপে ২৪ মার্চ ১১৭ উপজেলায় ভোট পড়ে ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ, বিনা ভোটে নির্বাচিত হন ৫৫ জন। চতুর্থ ধাপে ৩১ মার্চ ১২২ উপজেলায় ভোটের হার সবচেয়ে কম ৩৬ দশমিক ৫০ শতাংশ; বিনা ভোটে নির্বাচিত হন ৮৮ জন। শেষ ধাপে ২০ উপজেলায় বিনা ভোটে নির্বাচিত হন ১৪ জন; ১৮ জুন এ ধাপে ভোট পড়ে ৪০ শতাংশ। পাঁচ ধাপে গড় ভোটের হার ৪০ দশমিক ২২ শতাংশ।
৪৫৩ উপজেলার মধ্যে ১৪৫টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নৌকার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেছেন। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) ৩টিতে ও ১৪ দলের শরিক জাতীয় পার্টি (জেপির) প্রার্থী একটি উপজেলায় জয়ী হয়েছেন। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও বান্দরবানের একটি উপজেলায় বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারা স্বতন্ত্র হিসেবে জয় পেয়েছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১০টির মতো উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলো জয়লাভ করেছে। বাকি উপজেলায় একচেটিয়া নৌকার প্রার্থীরা বিজয়ী হন।
এ বিষয়ে ইসি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, যদি কোনো একটা দল না আসে তখন কম্পিটিশন হবে না। তখন নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা হয়। এসব কারণেই ভোটার উপস্থিতি কম। বিনা ভোটে নির্বাচিতদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজ করতে হবে বলে মত দেন এই নির্বাচন কমিশনার।
শেষ ধাপে উপজেলা ভোটের পরদিন গত বুধবার ইসি মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এবারের উপজেলা নির্বাচনে সবচেয়ে আশঙ্কার দিক হচ্ছে, ভোটারদের নির্বাচনবিমুখতা। নির্বাচনবিমুখতা জাতিকে গভীর খাদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ। এই অবস্থা কখনো কাম্য হতে পারে না।’ এর আগে গত ১৮ মার্চ দ্বিতীয় ধাপের ভোটের দিন উপজেলায় বিনা ভোটে জয়ীদের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেছিলেন, ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ীদের ইলেকটেড না বলে সিলেকটেড বলা যেতে পারে।’
স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া ভেঙে পড়েছে। মানুষের ভেতর ভোটের কোনো আগ্রহ নেই। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন পুরো ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে। এর ফলে মনোনয়নের মান কমে যায়। দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বৃদ্ধি না পেয়ে আমরা দেখলাম তা ভঙ্গ হয়। দলের আইন অমান্য করে মন্ত্রী-এমপিরা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের হয়ে কাজ করেছেন।’ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় করা জরুরি বলেও মত দেন তিনি।
ইসির অতিরিক্ত সচিব মোখলেছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে, সেটা ভিন্ন জিনিস। তবে নির্বাচন নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। প্রার্থীদের প্রচারণায় ঘাটতি থাকতে পারে বলে ভোটার কম হতে পারে।’ প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে উপজেলা নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টা যারা আইন প্রণয়ন করেন তাদের। আইন প্রণয়ন যেভাবে হবে, সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে।’
৩৩ উপজেলায় সবাই বিনা ভোটে নির্বাচিত : ৩৩ উপজেলায় ৩টি পদের সবাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথম ধাপে জামালপুরের মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ এবং নাটোর সদরে সবাই ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় ধাপে ৬টি উপজেলায় সবাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হন; এগুলো হলো নওগাঁ সদর, পাবনা সদর, ফরিদপুর সদর, নোয়াখালীর হাতিয়া, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও রাউজান। তৃতীয় ধাপে আরও ৬ উপজেলার সবাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হন; উপজেলাগুলো হলোÑবরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া; মাদারীপুরের শিবচর; শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ; নরসিংদীর পলাশ এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা। চতুর্থ ধাপে সবচেয়ে বেশি ১৫টি উপজেলায় ৩টি পদের সবাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। এগুলো হলো ভোলা সদর, মনপুরা, চরফ্যাশন; যশোরের শার্শা; ময়মনসিংহের গফরগাঁও; ঢাকার সাভার, কেরানীগঞ্জ; কুমিল্লার লাকসাম, নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জ, দেবিদ্বার, চৌদ্দগ্রাম; নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা এবং ফেনীর পরশুরাম। সর্বশেষ পঞ্চম ধাপে ৩ উপজেলার সবাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। উপজেলাগুলো হলোÑকুমিল্লার সদর আদর্শ, সদর দক্ষিণ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর।