বাংলাদেশের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম সক্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গতকাল রবিবার ৭০ বছর পূর্ণ করল। দীর্ঘ এই পথচলায় দলটির সাফল্য ও অর্জন ঈর্ষণীয়। পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতৃত্ব দেওয়ার গৌরব আওয়ামী লীগেরই। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই দলকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করেছেন তার নজির ইতিহাসে বিরল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও কারাগারের পাঠ পর্যন্ত সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠেছিলেন। এভাবে জনগণের আস্থা অর্জন করার কারণেই বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আর সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার বিষয়টি অভিন্ন হয়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক সাতই মার্চে স্বাধীনতার ডাক দেওয়া বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ থেকে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ লাখো-কোটি জনতার উদাত্ত সেøাগানে পরিণত হয়ে একাত্তরের রণাঙ্গনে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় আর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে।
পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক কাঠামোয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক আর শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৩ সালে মুজিব দলের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণের মধ্য দিয়ে এই দলের অসাম্প্রদায়িক যাত্রাপথের কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন তিনি। বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে ধারণ করতে পেরেছিলেন বলেই শেখ মুজিব আওয়ামী লীগকে জাতির নেতৃত্ব দিতে তৈরি করতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে এ কথাও স্মর্তব্য যে নেতৃত্বের অনন্যসাধারণ গুণে গুণান্বিত মুজিব কেবল নিজেই নেতা ছিলেন না, তিনি কয়েক সারিতে অনেক নেতাও তৈরি করেছেন। তাদের মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারাই বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন।
রাজনীতি নিরন্তর সৃজনশীলতা আর দূরদর্শিতার বিষয়। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করা জনগণকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়। রাজনীতির পথ কখনই কুসুমাস্তীর্ণ নয়; বন্ধুর। উপনিবেশই হোক কিংবা স্বাধীন দেশ, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর মোকাবিলা করেই রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। পরাধীন দেশের সংগ্রামী জননেতা শেখ মুজিব আর পরাধীন দেশের সংগ্রামী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিব এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পর্যালোচনা এই পরিপ্রেক্ষিতে খুবই জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন আর দেশ-বিদেশের শত্রুদের নানা চক্রান্তে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল মুজিবের সরকার। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বীরোচিত উত্থানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার মহানায়কে পরিণত হন, তেমনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তার জীবনের ট্র্যাজিক পরিসমাপ্তি ঘটে।
পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ড কেবল আওয়ামী লীগকে নয়, পুরো বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বেই শুরু হয় মুজিব-পরবর্তী আজকের আওয়ামী লীগের অভিযাত্রা। দল পুনর্গঠন করে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগে। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংসদের বিরোধী দল আর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে ২১ বছর পর আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। রাজনীতিতে অগুনতি সাফল্যের পাশাপাশি বারবার যে চক্রান্ত ও হত্যাযজ্ঞের শিকার আওয়ামী লীগকে হতে হয়েছে তা মুজিব-যুগের মতো হাসিনা-যুগেও বর্তমান। বিরোধী দলে থাকাকালে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এর ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
২০০৯ সাল থেকে এক দশক ধরে টানা ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। এর আগের দফায় পঁচাত্তরের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের মতোই এই দফায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারসহ অনেক রাজনৈতিক কৃতিত্ব অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাম্প্রতিক গতিধারা এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, নারীশিক্ষা, গড় আয়ু ও গড় আয় বৃদ্ধিসহ গর্ব করার মতো অনেক সাফল্য রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজ দলের সত্তর বছর পেরিয়ে আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সমালোচনাটি কী? সমালোচনাটি হচ্ছেÑঅসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে আদর্শিক ভিত্তি নিয়ে দলটি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল; এখন সেখান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে তারা। একদিকে, সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে রাজনীতির মাঠে ধর্মীয় রাজনীতির কাছে নতিস্বীকার এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সংস্কারের বদলে উল্টো পাঠ্যসূচি পরিবর্তনে যার দৃষ্টান্ত স্পষ্ট। আরেক দিকে, সীমাহীন দুর্নীতি সামাল দিতে না পারা এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিকভাবে গড়ে তুলতে না পারা, সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করে ফেলা।