দুদকের সংশোধিত বিধিমালায় প্রথম মামলাটি হচ্ছে পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি (উপমহাপরিদর্শক) মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। গতকাল রবিবারই দুদকের সংশোধিত বিধিমালা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হয়েছে। এই বিধিমালায় এখন থেকে দুদকের মামলা থানার পরিবর্তে দুদকের ২২টি সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে (সজেকা) করা হবে। এরই মধ্যে ডিআইজি মিজানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান প্রতিবেদন
কমিশনে জমা দিয়েছেন নতুন তদন্ত কর্মকর্তা দুদক পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ।
এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিআইজি মিজানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের প্রতিবেদন এরই মধ্যে কমিশনে জমা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত নেবে না কমিশন।’
ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে সাড়ে ৩ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক। সেখানে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলার সুপারিশ রয়েছে। বিষয়টি গতকাল কমিশনের সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে কমিশন মামলার অনুমোদন দেয়নি।
দুদকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপপরিচালক দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল দুদক বিধিমালা ২০০৭-এর সংশোধনীর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। সংশোধিত বিধিমালা অনুসারে এখন থেকে দুদক নিজস্ব সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা করবে। আর ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধেই প্রথম মামলাটি হচ্ছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতির দায়ে কুখ্যাতি পাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষক আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের বিরুদ্ধেও প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধেও সজেকা ঢাকা-১-এ মামলা করবে দুদক।
অন্য এক কর্মকর্তা জানান, গতকাল সকালে কমিশন বৈঠকের আগপর্যন্ত ওই প্রজ্ঞাপন হাতে পায়নি কমিশন। তাই বিষয়টি কার্যকর করা যায়নি। তাছাড়া মামলার ক্ষেত্রে সজেকাগুলোতে কিছু দাপ্তরিক প্রস্তুতিও রয়েছে। সেগুলো সম্পন্ন করে এসব মামলার কাজ শুরু হবে। সে হিসেবে দুয়েক দিনের মধ্যেই ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক।
ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে পুলিশের উচ্চপদে থেকে তদবির, নিয়োগ, বদলিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয় ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি। প্রায় দেড় বছর অনুসন্ধান করে তার নামে-বেনামে সাড়ে ৩ কোটিরও বেশি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য-প্রমাণ পায় দুদক। স্থাবর-অস্থাবর এসব সম্পদ ডিআইজি মিজানের মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও ভোগদখলে রয়েছে, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ দুদক পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম মিজানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করে। এর আগে বিষয়টি অনুসন্ধান করেন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। তার আগে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অনুসন্ধান করেন উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী।
দুদক ডিআইজি মিজানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, তার নামে-বেনামে ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬০ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে। তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর বেইলী রীটজ নামক ভবনের চতুর্থ তলায় ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট, একই ভবনের নিচে কার পার্কিংয়ের স্পেসসহ ৫৫ দশমিক ৫১ অজুতাংশ জমি, রাজধানীর কাকরাইলে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের একটি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট, সিটি ব্যাংকের ঢাকার ধানম-ি শাখায় নিজের অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা।
এছাড়া উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৬ নম্বর রোডের ২৯ নম্বর ফ্ল্যাটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ১/এ নম্বরে ১৭৫০ স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাট, যার দাম ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, গুলশান-১-এর পুলিশ প্লাজায় লেভেল-৩-এ ৩১৪ নম্বর দোকান, যার দাম উল্লেখ করা হয়নি, উত্তরায় পলওয়েল কারনেশন নামক শপিং কমপ্লেক্সের লেভেল-৩- এর ৬ নম্বর দোকান, যার দাম ৭ লাখ ৪১ হাজার ৪১০ টাকা, পূর্বাচল নতুন শহরের ৮ নম্বর সেক্টরের ১০৭ নম্বর রোডের ৬৭ নম্বর প্লটে পাঁচ কাঠা জমি যার দাম ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা, সাভারের দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর মৌজায় পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির অ্যাডভান্স পুলিশ টাউনে ভবন-২ ডি-২ নম্বরে পাঁচ কাঠা জমির ওপর তৈরি ফ্ল্যাট; যার দাম ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা ও ঢাকার জোয়ার সাহারায় পুলিশ অফিসার বহুমুখী সমবায় সমিতি প্রকল্পে সাড়ে সাত কাঠা জমি, যার দাম ১৪ লাখ ২০ হাজার ৫৫০ টাকা। দুদক তার ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ ও এসব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করেছে। এছাড়া ডিআইজি মিজান তার ছোট ভাই মাহবুবুর রহমানের নামে রেখেছেন প্রায় ১ কোটি টাকার সম্পদ।
দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ডিআইজি মিজান এসব সম্পদের দাম দেখিয়েছেন অর্জনকালীন। প্রকৃত পক্ষে এসব সম্পত্তির বর্তমান বাজারদর অনেক বেশি। তাছাড়া ক্রয়ের সময়ও সেগুলোর অনেক কম দামে রেজিস্ট্রি দেখানো হয়েছে। বিষয়টি এরই মধ্যে কমিশনের গোচরে আনা হয়েছে।
ডিআইজি মিজানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে (সাময়িক বরখাস্ত) অনুসন্ধান করতে গিয়ে ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে দাবি করেন। তিনি এ সংক্রান্ত তিনটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেন। এরপরই ডিআইজি দুদক এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করে। আর মিজান-বাছির ঘুষ কেলেঙ্কারির বিষয়টি অনুসন্ধানে পৃথক একটি কমিটি করে দুদক।
স্ত্রী, ভাই ও ভাগ্নের সম্পদও অনুসন্ধান হবে : মিজানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পর তার স্ত্রী সোহেলিয়া আনা রতœা, ভাই মাহবুবুর রহমান স্বপন ও ভাগ্নে পুলিশের এসআই মাহমুদুল হাসান নোমানের অবৈধ সম্পদেরও অনুসন্ধান হবে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার স্ত্রীর নামে ৮৫ লাখ ৪৬ হাজার ৯৩৫ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। তার অসংগতিপূর্ণ সম্পদ ৭২ লাখ ৯০ হাজার ৯৫২ টাকার। তার নামে রাজধানীর উত্তরায় ৬৩ লাখ ৯০ হাজার টাকার ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে। সেগুনবাগিচা পাইওনিয়ার রোডের ফ্ল্যাটটি ডিআইজি মিজান কেনেন তার ভাগ্নে পুলিশের এসআই মাহমুদুল হাসান নোমানের নামে। ওই ফ্ল্যাটে বর্তমানে ‘কিসমত রেস্টুরেন্ট ও পার্টি সেন্টার’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বেইলি রোডের ফ্ল্যাটটি রেজিস্ট্রেশন করা হয় ডিআইজি মিজানুর রহমানের একমাত্র ছোট ভাই মাহবুবুর রহমান স্বপনের নামে। তিনি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ হাসপাতাল রোডে ‘আকবর মেডিকেল হল’ নামে ছোটখাটো ফার্মেসির দোকানি। এ ব্যবসা দেখিয়ে ঢাকায় আয়কর ফাইলও খুলেছেন তিনি। বিভিন্ন কৌশলে এই ট্যাক্স ফাইলে নিজেকে কোটিপতির বর্ণনা দিয়েছেন স্বপন।
বিতর্কিত ডিআইজি ২০১৭ সালে অস্ত্রের মুখে মরিয়ম ইকো নামের এক নারীকে তুলে নিয়ে বিয়ে ও নির্যাতনের খবর প্রকাশের পর তাকে ঢাকা মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে ন্যস্ত করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরে। এছাড়া ঘুষ দেওয়ার অভিযোগের পর তার বিরুদ্ধে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দুদক।