এই বিশ্বকাপে সবকিছু ছাড়িয়ে গেছেন সাকিব

এত এত ক্রিকেটারের মাঝে খুব কম ক্রিকেটার পারে নিজেকে তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। তবে কঠিন সময়ে নিজেকে ভেঙে গড়তে না পেরে, প্রমাণে ব্যর্থ হয়ে অনেকে হারিয়ে যায়। পাওনা তারকাখ্যাতি নিমিষে চুরমার হয়ে যায়। এদিকে কিছু দুর্ভাগা ক্রিকেটার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে। কিন্তু সবার দৃষ্টি কাড়তে পারে না। কারণ সর্বোচ্চ শৃঙ্গের কাছাকাছি পৌঁছলেও তা অধরা থেকে যায় তাদের।

তবে একদম গুটিকয়েক আছে অভিজাত শ্রেণির। যারা দলের অবস্থা বিবেচনা করে ব্যাটিং অথবা বোলিংয়ে অসাধারণ খেলে যে, নিজের পারফরম্যান্স প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যায়। এদের মধ্যে এমন কেউ আছে যারা ব্যাটে-বলে দুটোতে একই সঙ্গে দ্যুতি ছড়াতে পারে। যেমন, সাকিব আল হাসান। ২০১৯-এর এই ইংলিশ সামারে সবকিছু ছাড়িয়ে গেছেন। অবিশ্বাস্য সুন্দর ক্রিকেট উপহার দিয়ে চলছেন। একজন ক্রিকেটার মাঠে সম্ভব যা করতে পারে সব করছেন।

সাকিব এই গ্রীষ্মে অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্সে এতটাই দ্যুতি ছড়িয়েছেন যে, বিশ্বকাপের মঞ্চে এই চূড়ায় আগে কেউ পৌঁছতে পারেনি। এই চূড়ায় পৌঁছতে গিয়ে তাকে কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয়েছে এর গভীরতা মাপা কারও পক্ষে সম্ভব কি?

এবারের আসরে তার এখন পর্যন্ত কাটানো খারাপ দিনেও ১০০ স্ট্রাইকরেটে ৪১ রান করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। সাকিবের স্বাভাবিক খেলাতে অর্জিত সফলতাই হার মানছেন সবাই। এমনকি সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদে তার সঙ্গী রশিদ খানও আশার ভাষায় ভেসেছেন। তবে জিততে পারেননি সাকিবের সঙ্গে যুদ্ধে। ভারতের বিপক্ষে নিজেকে খুঁজে পাওয়া রশিদের বড় সাফল্য ছিল সাকিবের বিপক্ষে এলবিডব্লিউতে উইকেট পাওয়া! উহু, তা রিভিউতে বাতিল হয়ে যায়।

বল হাতে সাকিব যেন প্রতিদিন নতুন করে দেখানোর প্রত্যয়ে মাঠে নামেন। আফগানিস্তানের খেলোয়াড়দের ফাঁদে ফেলে এদিন দারুণ বোলিং নৈপুণ্যে ৫ উইকেট তুলে নেন। প্রতিপক্ষকে রানরেটের চাপে ফেলে উইকেট তুলে জয়ের পথ সুগম করেন। প্রথম স্পেলের দুই ওভারের পর দলীয় ২৫তম ওভার শেষে দ্বিতীয় স্পেলে বোলিংয়ে আসেন সাকিব। এই স্পেলে আফগানিস্তানকে গুঁড়িয়ে দেন। তিন বলের ব্যবধানে ২ উইকেটের পাশাপাশি ১৫ বলেই ৩ উইকেট তুলে নেন এই স্পেলে। রান তাড়ায় আফগানরা এ সময়ে এতটাই পিছিয়ে পড়ে যে, টাইগারদের জয় তখন মনে হচ্ছিল সময়ের ব্যাপার।

সাকিবের খেলোয়াড়ি সত্তাকে যদি আমরা আড়াল করে দিই তবুও মাঠে সাকিবের গুরুত্ব অপরিসীম। মাত্র ২২ বছর বয়সে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম অধিনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অধিনায়কত্বের চাপ কাঁধে চাপা সত্ত্বেও খেলোয়াড় এবং নেতা হিসেবে সাকিব ছিলেন অন্যতম সেরা।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক আবেগের নাম মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। আফগানিস্তানের সঙ্গে খেলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাকিবের এই স্পিন কাজে লাগানোর পেছনে নেপথ্যের নায়ক ছিলেন মাশরাফী। তার কৌশলী অধিনায়কত্বে মাঠে পরাস্ত হয় আফগানরা। মাশরাফী শুরুর স্পেলে পাঁচ ওভারে ২৭ রান দেন। এ সময়ে দেখা যায়, মাঠে মাশরাফী খানিক জবুথবু হয়ে চলছেন। সম্ভবত পায়ের ব্যথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। তাই তখন লাইন-লেন্থে ভালো রাখতে পারেননি। পরবর্তী স্পেল করতে এসে রানআপ কমিয়ে দিয়েছেন, বলের গতি পড়ে গেছে। তবুও হার না মানা মাশরাফী দলের জন্য মাঠে ছিলেন।

যুদ্ধ করেছেন। ফিল্ডিংয়ে সর্বোচ্চ দিয়েছেন। আর এই কারণে ফিল্ডারদের মাঝে ভালো কিছু করার তাগিদ চলে এসেছে।

পৃথিবীর কোনো নিয়মে মাশরাফীর তখন মাঠে থাকার কথা নয়। কিন্তু এই মানুষটা এক যুগের বেশি সময় ধরে এই নিয়ে চলছেন, খেলছেন। আসলে অন্যরকম মানসিক শক্তি না থাকলে এতদিন খেলা সম্ভব নয়। যেখানে তিনি এত ইনজুরিকে হার মানিয়ে খেলে যাচ্ছেন সেখানে তার সময়কার অন্য সতীর্থরা করে মাঠের সঙ্গে পাট চুকিয়ে ফেলেছেন।

এই বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ কিছু খেলোয়াড় আছে। তাদের মধ্যে সাকিব, তামিম, মুশফিক নিজেদের অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। ২০০৭-এ ভারতকে হারিয়ে শুরু করা এই খেলোয়াড়রা দলের মধ্যমণি। তারপর আসতে হয় মাহমুদউল্লাহর কথায়। ২০১৫ বিশ্বকাপের নায়ক। এদিন ব্যাটিংয়ের সময় কাফ ইনজুরিতে পড়লেও মাঠ ছাড়তে চাননি। বরং এই অবস্থা নিয়ে মুশফিকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে টেক্কা দিয়েছেন।

আর মাশরাফী, নিজের মধ্যে হাজার রকমের অভিজ্ঞতা নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০০৩ সালে চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চোট দিয়ে শুরু। সেই থেকে ১৬ বছর কী অসামান্য নিবেদন নিয়ে ক্রিকেট মাঠে পড়ে আছেন। ব্রিলিয়ান্ট ক্রিকেট উপহার দিচ্ছেন। মাঠে থেকে সতীর্থদের অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। দুঃসাধ্য চেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দলের সবাইকে চাঙা করছেন।

এত কিছুর পরেও এই দলটির সেমিফাইনাল ভাগ্য এখনো ঝুলছে। ঝুলছে সামনের সপ্তাহে ভারত ম্যাচের ওপর। বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে ভারতের বিপক্ষে জয়ের শিকে খুলছে না বাংলাদেশের। তবে সাকিব যদি তার অদ্ভুত পাগলাটে ফর্ম ধরে রাখতে পারেন আর তার সঙ্গে যোগ দেয় মাশরাফীর বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্বÑ তাহলে যেকোনোভাবে এবার মিলে যেতে পারে ভারতের বিপক্ষে জয় নামক সেই সোনার হরিণ।

 

 অ্যান্ড্রু মিলার, ক্রিকইনফোর ইউকে এডিটর