খলিফার শাব্দিক অর্থ ন্যায়পরায়ণ ও সঠিকভাবে পথনির্দেশপ্রাপ্ত নেতা। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সহচরদের মধ্যে চারজনকে এই বিশেষ সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। তারা নবীজির মৃত্যুর পর ইসলামের নেতৃত্ব দেন। ইসলামের তৃতীয় খলিফাকে নিয়ে লিখেছেন আন্দালিব আয়ান
ইসলামের তৃতীয় খলিফা
হযরত উসমান (রা.)-এর পিতার নাম আফ্ফান। আর মাতা ছিলেন আরওরা বিনতু কুরাইয। ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে কুরাইশ বংশের উমাইয়া গোত্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন উসমান (রা.)। এ হিসেবে নবী করিম (সা.)-এর চেয়ে তিনি ছয় বছরের ছোট। তবে তার জন্মসাল নিয়ে মতভেদও রয়েছে।
হযরত উসমান (রা.) ছিলেন মধ্যমাকৃতির সুঠাম দেহের মানুষ। তার ছিল মেদহীন গ-দেশ, ঘন দাড়ি, উজ্জ্বল ফর্সা, ঘন কেশ, বুক ও কোমর চওড়া, কান পর্যন্ত ঝোলানো যুলফি, পায়ের নলা মোটা, পশম ভরা লম্বা বাহু, মুখে বসন্তের দাগ, মেহেদি রঙের দাড়ি এবং স্বর্ণখচিত দাঁত।
হযরত উসমানের জীবনের প্রাথমিক অবস্থা অন্যান্য সাহাবির মতো জাহিলি যুগের অন্ধকারেই রয়ে গেছে। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের অন্যতম কুষ্টিবিদ্যা বিশারদ। কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাসেও ছিল তার গভীর জ্ঞান। তার প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, সৌজন্য ও লৌকিকতাবোধ ইত্যাদি গুণাবলির জন্য সব সময় তার পাশে মানুষের ভিড় জমে থাকত। জাহিলি যুগের কোনো অপকর্ম তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। লজ্জা ও প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ ছিল তার মহান চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। যৌবনে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মতো ব্যবসা শুরু করেন। সীমাহীন সততা ও বিশ্বস্ততার গুণে ব্যবসায়ে অসাধারণ সাফল্য লাভ করেন। মক্কার সমাজে একজন বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।
প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণ
হযরত উসমান (রা.)-কে বলা হয় ‘আস-সাবেকুনাল আওয়ালুন’ অর্থাৎ প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী। তিনি সেই ছয়জন শ্রেষ্ঠ সাহাবির মধ্যে অন্যতম যাদের প্রতি হযরত মুহাম্মদ (সা.) আমৃত্যু খুশি ছিলেন। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক ছিল। তারই তাবলিগ ও উৎসাহে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতের সূচনা পর্বেই তার দাওয়াতে সাড়া দেন এবং আজীবন জান-মাল ও সহায় সম্পত্তি দ্বারা মুসলমানদের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.), হযরত আলী (রা.) এবং যায়িদ বিন হারিসের পর ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন হযরত উসমান।
ইতিহাসে উল্লেখ আছে, উসমান (রা.)-এর খালা সু’দা ছিলেন সে যুগের একজন বিশিষ্ট ভবিষ্যদ্বক্তা। তিনি নবী করিম (সা.) সম্পর্কে উসমানকে কিছু কথা বলেন এবং তার প্রতি ইমান আনার জন্য উৎসাহ দেন। খালার উৎসাহেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
আরও জানা যায়, হযরত উসমান একসময় সিরিয়া সফরে ছিলেন। একদিন তিনি ‘মুয়ান ও যারকার’ মধ্যবর্তী স্থানে বিশ্রাম করছিলেন তখন তন্দ্রালু অবস্থায় এক আহ্বানকারীকে বলতে শুনলেন, ‘ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তিরা, তাড়াতাড়ি করো। আহমাদ নামের রাসুল মক্কায় আত্মপ্রকাশ করেছেন।’ মক্কায় ফিরে এসে উসমান জানতে পারলেন, ব্যাপারটি সত্য। পরে হযরত আবু বকরের আহ্বানে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এসময় তার বয়স ছিল ত্রিশ বছরের ওপরে। ইসলাম গ্রহণের পর তার খালা সু’দা তাকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি কাসিদা রচনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে উসমান (রা.)-এর বোন আমিনা, সৎ ভাই বোন ওয়ালিদ, খালিদ, আম্মারা সবাই মুসলমান হয়েছিলেন।
জুন্নুরাইন উসমান
হযরত উসমান ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজকন্যা ‘রুকাইয়্যাকে’ তার সঙ্গে বিয়ে দেন। হিজরি দ্বিতীয় সনে মদিনায় রুকাইয়্যার ইনতিকাল হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তার দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। এ কারণে তিনি ‘যুন্নুরাইন’ বা ‘দুই জ্যোতির অধিকারী’ উপাধি লাভ করেন।
রুকাইয়্যা ছিলেন হযরত খাদিজার (রা.)-এর গর্ভজাত সন্তান। তার প্রথম শাদি হয় উতবা ইবন আবু লাহাবের সঙ্গে এবং উম্মু কুলসুমের বিয়ে হয় আবু লাহাবের দ্বিতীয় পুত্র উতাইবার সঙ্গে। কিন্তু আবু লাহাব ছিলেন আল্লাহর নবীর কট্টর দুশমন। পবিত্র কুরআনের সুরা লাহাব নাজিলের পর আবু লাহাব তার পুত্রদ্বয়কে নির্দেশ দেয় মুহাম্মদের কন্যাদের তালাক দেওয়ার জন্য। পরে উসমান (রা.) পর্যায়ক্রমে দুই বোনকেই বিয়ে করেন।
নবুওয়াতের পঞ্চম বছরে মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রথম যে দলটি হাবশায় হিজরত করেছিল তাদের মধ্যে উসমান ও তার স্ত্রী রুকাইয়্যাও ছিলেন। হাবশা অবস্থানকালে তাদের সন্তান আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন। রুকাইয়্যার সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন খুব সুখের হয়েছিল। লোকেরা বলাবলি করত, কেউ যদি সর্বোত্তম জুটি দেখতে চায়, সে যেন উসমান ও রুকাইয়্যাকে দেখে।
একমাত্র বদর ছাড়া সকল যুদ্ধে রাসুলুল্লাহর সহচর ছিলেন উসমান। রাসুল (সা.) যখন বদর যুদ্ধে রওনা হন, রুকাইয়্যা তখন রোগশয্যায়। রাসুলের নির্দেশে উসমান পীড়িত স্ত্রীর সেবার জন্য মদিনায় থেকে গিয়েছিলেন। বদরের যুদ্ধ বিজয়ের খবর যেদিন মদিনায় আসে সেদিনই রুকাইয়্যা মৃত্যুবরণ করেন।
রুকাইয়্যার ইনতিকালের পর রাসুল (সা.) রুকাইয়্যার ছোট বোন উম্মু কুলসুমকে উসমানের সঙ্গে বিয়ে দেন হিজরি তৃতীয় সনে। হিজরি নবম সনে কুলসুমও নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। কুলসুমের মৃত্যুর পর রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘আমার যদি তৃতীয় কোনো মেয়ে থাকত তাকেও আমি উসমানের সঙ্গে বিয়ে দিতাম।’
যেভাবে খলিফা নির্বাচিত হলেন
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.) ছুরিকাহত হয়ে যখন মৃত্যুশয্যায় তখন তার কাছে উত্তরাধিকারী নির্বাচনের দাবি করা হয়। এ সময় তিনি ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন, যাদের মধ্য থেকে খলিফা নির্বাচিত হবে। তারা ছিলেন হযরত আলী (রা.), হযরত উসমান (রা.), আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.), আল-জুবাইর (রা.) ও তালহা (রা.)। তার মৃত্যুর তিন দিনের মাথায় তারা যেন নিজেদের মধ্য থেকে খলিফা নির্বাচিত করেন এমনটাই বলে গিয়েছিলেন উমর (রা.)। এ সময় তিনি কমিটির সদস্যদের জিজ্ঞেসও করেন, কে কাকে ভোট দেবেন। আলী (রা.) কোনো উত্তর না দিলেও উসমান (রা.) জানালেন, তিনি আলী (রা.)-কে ভোট দেবেন। জুবাইর (রা.) বললেন, তিনি আলী (রা.) এবং উসমান (রা.)-এর মধ্য থেকে একজনকে ভোট দেবেন। আর সা’দ (রা.) বললেন, তিনি উসমান (রা.)- কে দেবেন।
হযরত উমর তার মৃত্যুর পর কমিটির সবাইকে একত্র করার দায়িত্ব দেন মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদকে। হযরত উমরকে দাফন করার পর মিকদাদ বিন আসওয়াদ সদস্যদের মিসওয়ার ইবনুল মাখরামা মতান্তরে হযরত আয়েশার হুজরায় একত্র করেন। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও তুমুল বাগ্বিত-ার এক পর্যায়ে আবদুর রাহমান ইবনে আউফ (রা.) বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন কে আছ, যে তার দাবি ত্যাগ করতে পার এবং তোমাদের উত্তম ব্যক্তিকে নির্বাচনের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পণ করতে পার? আমি আমার খিলাফতের দাবি ত্যাগ করছি।’ হযরত উসমান সর্বপ্রথম এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে আবদুর রাহমানের হাতে তার ক্ষমতা ন্যস্ত করলেন। তারপর অন্য সকলে তার পথ অনুসরণ করলেন। এভাবে খলিফা নির্বাচনের গোটা দায়িত্বটি আবদুর রহমানের ওপর এসে বর্তায়। তিনি দিন-রাত রাসুলুল্লাহর অন্যসব সাহাবি, মদিনায় অবস্থানরত সকল সেনা কর্মকর্তা, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গসহ সকল স্তরের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। কখনো ব্যক্তিগতভাবে, কখনো সম্মিলিতভাবে। এসব আলোচনায় প্রায় সবাই হযরত উসমানের পক্ষে তাদের মতামত ব্যক্ত করেন।
যেদিন সকালে উমর নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হবে, সে রাতে আবদুর রাহমান প্রথমে যুবাইর ও সা’দকে ডেকে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এভাবে উসমান ও আলীর সঙ্গেও ভোর হওয়ার আগ পর্যন্ত একান্তে আলাপ করেন।
এদিকে, মসজিদে নববী লোকে পরিপূর্ণ। শেষ সিদ্ধান্তটি শোনার জন্য সবাই ব্যাকুল। ফজরের নামাজের পর সমবেত মদিনাবাসীদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত এক ভাষণের পর আবদুর রাহমান খলিফা হিসেবে হযরত উসমানের নামটি ঘোষণা করেন। হিজরি ২৪ সনের ১ মহররম সোমবার সকালে খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন হযরত উসমান (রা.)। মক্কার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী গোত্র উমাইয়াদের মাঝে তার জন্ম। পিতার বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার হয়েছিলেন তিনি। মক্কা বিজয়ের কিছুকাল আগেও উমাইয়া গোত্র রাসুল (সা.) এর ঘোর বিরোধী ছিল। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন উসমান। প্রথম দিকেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ধনী ব্যবসায়ী উসমান তার সম্পদের বিশাল অংশ ইসলামের জন্য দিয়ে দিয়েছিলেন।
খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি রাজকোষ থেকে কোনো বেতন নিতেন না। কারণ তার নিজেরই যথেষ্ট অর্থ ছিল, আর কোনো অর্থ তার দরকার পড়ত না। তবে মানুষের দেওয়া উপহার তিনি খুশি মনেই গ্রহণ করতেন, যেমনটা করতেন নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
শাসনকাল
হযরত উসমান অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। সামরিক, আর্থ-সামাজিক এবং কুরআন সংকলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
উসমান (রা.) ক্ষমতা নেওয়ার পর জনগণের ভাতা পূর্বের তুলনায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছিলেন। হযরত উমরের আমলে বিজিত অঞ্চলে জমি কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকলেও, উসমান (রা.) এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং ব্যবসার সুযোগ বাড়িয়ে দেন। তার আমলে ইসলামি বিশে^র অর্থনৈতিক অবস্থাও ছিল সমৃদ্ধ।
উসমান (রা.)-এর আমলে মুসলিম সাম্রাজ্য বিরাট বিস্তৃতি লাভ করে। জানা যায়, হযরত উমর (রা.)-এর আমলে সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানকে নিযুক্ত করেছিলেন। মুয়াবিয়া ছিলেন উসমান (রা.)-এর চাচাতো ভাই। উসমান (রা.)-এর শাসনামলে মুয়াবিয়া বিশাল এক মুসলিম নৌবাহিনী গড়ে তোলেন এবং সেই বাহিনীতে মুসলিম ছাড়াও মিসরীয় ও সিরীয় খ্রিস্টানরা যোগদান করে। এই নৌবাহিনী ৬৫৫ সালে দুর্দান্ত রোমান বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীকে ভূমধ্যসাগরে পরাস্ত করে। এতে মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রসারে নতুন এক পালক যুক্ত হয়। আর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিদায়ঘণ্টা বেজে ওঠে।
৬৫১ সালে উসমান (রা.) আব্দুল্লাহ ইবন জুবাইর ও আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দকে প্রেরণ করেন মাগ্রেবে। সেখানে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের আত্মীয় গ্রেগরির লক্ষাধিক সেনার একটি বাহিনীর মুখোমুখি হয় মুসলিম বাহিনী। এই বিশাল বাহিনী মুসলিমদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। কোণঠাসা মুসলিম বাহিনী যখন পরাজয় এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে তখন ইবন জুবাইর দেখতে পেলেন, ঘোড়ার গাড়ির ওপর গ্রেগরি বসে আছেন। তখন ইবনে সা’দকে তিনি ওদিকে যেতে বলেন। একটা ছোট দল ইবনে সাদের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রেগরির ওপর। গ্রেগরি মারা যেতেই বাইজেন্টাইন বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা পরাজিত হয়ে প্রস্থান করে।
উসমান (রা.)-এর আমলে তিনি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন কমান্ডারদের নিজস্ব স্টাইলে অভিযান এগিয়ে নিয়ে যাওযার। ইবনে সা’দের নেতৃত্ব উত্তর আফ্রিকা এবং স্পেনের কিছু অংশ জয় করে নেয়। স্পেনের আন্দালুসেও তারা অভিযান চালিয়েছিলেন।
শাসন ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কুরআন সংকলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হযরত উসমান (রা.)। নবী করিম (সা.)-এর মৃত্যুর পর দুই বছরের মধ্যেই কুরায়শি ভার্সনে কুরআনের প্রধান কপি তৈরি করা হয়। এই কপিটি হাফসা (রা.)-এর কাছে ছিল। কিন্তু কুরআনের বিভিন্ন আয়াত বিভিন্ন উপভাষায়ও উচ্চারিত হতো। মুহাম্মদ (সা.) নিজেই এর বৈধতা দিয়ে গিয়েছিলেন। একই কুরআন কুরাইশি, সাকিফি, হাওয়াজিনি, কিনানাই, তামিমি, হুজাইলি আর ইয়েমেনি এই সাত আরবি উপভাষায় নাজিল হয়েছিল। উসমান (রা.)-এর শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্য দূর-দূরান্তে বিস্তার লাভ করে। নতুন অনেকেই মুসলিম হয়। তারা তাদের পছন্দের উপভাষায়ই কুরআন তিলাওয়াত করত। কিন্তু যেহেতু অনেকেই এই সাত ভার্সনের বৈধতার কথা জানতেন না, তাই কেউ কেউ দাবি করতে লাগলেন তাদেরটা সঠিক, অন্যেরটা ভুল।
কুরআন নিয়ে এই মতবিভেদ ঠেকাতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন উসমান (রা.)। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নবী করিম (সা.)-এর মাতৃভাষা কুরাইশি মাস্টার কপিটি রেখে বাকি সবগুলো কুরআনের কপি সরিয়ে ফেলবেন যেন এ নিয়ে তর্কের আর কোনো অবকাশ না থাকে। এজন্য তিনি আহ্বান করেন সকলে যেন অন্য কপিগুলো দিয়ে যায়। সেগুলো শরিয়ত মোতাবেক তিনি পুড়িয়ে ফেলেন, এবং পুরো বিশ^জুড়ে এক ও অভিন্ন কুরাইশি ভার্সনের কুরআন প্রচলিত করেন।
দানা বাঁধে বিদ্রোহ
উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে একসময় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলা হয়। বলা হচ্ছিল, তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ দিয়েছিলেন প্রধানত তার উমাইয়া গোত্রীয় আত্মীয়দের। তবে, যাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন তাদের সক্ষমতা নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন তুলতে পারেনি। তবুও নিরপেক্ষতা বজায় না রাখবার জন্য ব্যাপারটা অনেকেই ভালোভাবে নেননি। খিলাফতের প্রথম পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে তেমন অভিযোগ শোনা যায় না। তবে শেষের দিকে বসরা, কুফা, মিসর প্রভৃতি অঞ্চলে তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে। মূলত এ অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে বিশেষ ভূমিকা রাখে পরাজিত ইহুদি শক্তি। ধীরে ধীরে তারা সংঘবদ্ধভাবে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং মদিনার খলিফার বাসভবন ঘেরাও করে। মদিনার বেশিরভাগ তখন হজ করতে মক্কায় অবস্থান করছিল। এই সুযোগটিকেই কাজে লাগায় বিদ্রোহীরা।
বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিল না। তারা খলিফাকে হত্যার হুমকি দিয়ে পদত্যাগ দাবি করে। খলিফার বাসগৃহের খাদ্য ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। মসজিদে নামাজ আদায়ে বাধা সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে তারা হিজরি ৩৫ সনের ১৮ জিলহজ (১৭ জুন, ৬৫৬ সাল) শুক্রবার আসর নামাজের পর খলিফার বাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং রোজা অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতরত বৃদ্ধ খলিফাকে সজোরে মাথায় আঘাত করে। উসমান (রা.)-এর স্ত্রী নাইলা খলিফাকে রক্ষা করতে হাত উঁচু করে তরবারির আঘাত ঠেকাতে গেলেন। নাইলার আঙুলগুলো কেটে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এর পরের আঘাতেই শহীদ হন উসমান (রা.)। তার দাসেরা তাকে বাঁচাতে গেলে একজন নিহত হয়, আর আরেকজন এক বিদ্রোহীকে মারতে সক্ষম হয়। উসমান (রা.)-এর রক্তে ভেজা কুরআন তাসখন্দের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
হত্যার পর বিদ্রোহীরা খলিফার লাশ বিকৃত করার চেষ্টা করে। বিদ্রোহীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় ধনী উসমান (রা.)-এর বাড়ি লুট করে যায়। টানা তিন দিন তার লাশ পড়ে ছিল বাসায়। স্ত্রী নাইলা তখন কয়েকজন সমর্থকের সহায়তায় তার দাফন করার চেষ্টা করেন। মাত্র ১২ জন কাছের মানুষ পাওয়া গেল। সন্ধ্যায় লাশ নিয়ে যাওয়া হলো, কোনো কফিন বা খাটিয়া পাওয়া যায়নি। তাকে কোনো গোসল দেওয়া হয়নি, কারণ ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী শহীদদের কোনো গোসল নেই। কাফনের কাপড়ও পরানো হয়নি। যে কাপড়ে তিনি মারা যান, সে কাপড়েই তাকে কবরে নিয়ে যাওয়া হয়।
আলী (রা.), হাসান (রা.), হুসাইন (রা.) ও অন্যরা লাশ বহন করেন। নাইলার সঙ্গে একমাত্র অন্য যে নারী ছিলেন তিনি আয়েশা (রা.)।
মদিনার জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে পৌঁছানোর পর দেখা গেলো বিদ্রোহীরা টের পেয়ে সেখানে হাজির। তারা মুসলিম কবরস্থানে উসমান (রা.)-কে দাফন করতে দেবে না। নিরুপায় হয়ে তাকে দাফন করা হলো পেছনের ইহুদি কবরস্থানে। যুবাইর ইবন মুতঈম (রা.) তার জানাজার ইমামতি করেন। কাবুল থেকে মরক্কো পর্যন্ত বিশাল খিলাফতের কর্ণধারের জানাজায় মাত্র সত্তরজন লোক অংশগ্রহণ করেছিলেন।