সংগ্রামী নারী নরসুন্দর শেফালী শীল

ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা দোগনা বাজারের একমাত্র নরসুন্দর শেফালী রানী শীল (৫০)। প্রায় দেড় যুগ ধরে এলাকার লোকজনের চুল কাটছেন তিনি। প্রতিদিন সকালে শেফালী চুল কাটার যন্ত্রপাতি নিয়ে হাজির হন দোগনা বাজারের এক প্রবাসীর ঘরের বারান্দায়। সেখানেই তিনি নরসুন্দরের কাজ করেন।

তার কাছে তরুণ-যুবক এবং বৃদ্ধরা পর্যন্ত নিজেদের রুচি অনুযায়ী চুল কাটাচ্ছেন। সামান্য আয়ে এখনও অভাব-অনটন কাটেনি শেফালীর। তার স্বপ্ন, আর্থিক সহায়তা মিললে তিনি দোগনা বাজারে একটি আধুনিক সেলুন করবেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় শেফালীর বিয়ে হয় দোগনা বাজারের পাশের গ্রামের বাসিন্দা বিশ্ব নাথ শীলের সঙ্গে। স্বামী বিশ্বনাথ শীলের দোগনা বাজারে সেলুন ছিল। অন্যের চুল-দাড়ি কেটে স্বামী যা আয় করতেন, তা দিয়ে কোনো রকম সংসার চলত তাদের। এরপর একে একে শেফালী ও বিশ্ব নাথের ঘরে জন্ম নেয় চার মেয়ে ও এক ছেলে।

প্রায় দেড় যুগ আগে জটিল রোগে আক্রান্ত হয় স্বামী বিশ্বনাথ। বন্ধ হয়ে যায় শেফালীর সংসারের আয়। নিজের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে না পেরে এক সময় নিরুদ্দেশ হয়ে যান বিশ্বনাথ। এরপর শুরু হয় শেফালীর সংগ্রামী জীবন। বর্তমানে শেফালীর মেজ মেয়ে বিথিকা বিএ তৃতীয় বর্ষে পড়া ছাড়াও অন্যান্য ছেলে-মেয়েরাও পড়ালেখা করছে।

স্থানীয়রা জানায়, নারী নরসুন্দর শেফালীর পুরুষের চুল-দাড়ি কাটার কাজ প্রথমে অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। সে সময় খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো তাকে। আস্তে আস্তে সেই বাধা দূর হয় শেফালীর। দেড় যুগ ধরে জীবিকার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন শেফালী রানী। এরই মধ্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে তাকে জয়িতা সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট একটি টিনশেড ঘরের বারান্দায় শেফালী রানীর সেলুন। বাড়ির মালিক সৌদি প্রবাসী দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী বিনা মূল্যে শেফালীকে সেলুন করার জন্য বারান্দাটি দিয়েছেন। সেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চুল ও দাড়ি কাটার কাজ করেন শেফালী। শিশু থেকে বয়স্করা পর্যন্ত চুল দাড়ি কাটেন শেফালীর সেলুনে। চুল-দাড়ি কেটে যে যা দিচ্ছে তাই নিয়েই সন্তুষ্ট শেফালী।

দোগনা বাজারের রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শেফালী দিদি সাধারণ চুল কাটা ছাড়াও মেসি, নেইমার, রোনাদলো বা রক স্টাইলে চুলের কাট দিতে পারে। অল্প টাকায় শেফালী দিদি আমাদের চুল কেটে দেন। আমরা তার কাছেই চুল কাটি।’

শেফালী রানী শীল বলেন, ‘আমি চুল কেটে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা রোজগার করি। তাছাড়া এখানকার দোকানে দোকানে পানি টেনে যা পাই তা দিয়ে দুই মেয়ের বিয়ে দেওয়া ছাড়াও  অন্য ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াসহ সংসারের খরচ চালাচ্ছি। আমাকে একটি সেলুন ও বসতঘর তৈরি করে দিলে অন্তত বাকি জীবন ভালোভাবে কাটাতে পারতাম।’

কাঁঠালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকন্দ মোহাম্মদ ফয়সাল উদ্দীন বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই দোগনা বাজারের শেফালীর থাকার জায়গা পরিদর্শন করেছি এবং তাকে সেলুনের যন্ত্রপাতি কিনতে দশ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের ঘর দেওয়া ছাড়াও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান এমপি তার পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।