ক্যাচ ফেললেই শতরান নিশ্চিত রোহিতের!

‘গব্বর’ নেই, আছেন ‘শানা’। হিন্দি ‘শানা’কে বাংলায় ‘সেয়ানা’ বলতে পারেন। অর্থ প্রায় একই। একটু বেশিই চালাক। প্রয়োজনে মুখের সঙ্গে হাতও চলতে পারে, শব্দটা শুনলে একটা এমন ভাবমূর্তি উঁকি দিয়ে যায়। শুনে ধন্দ বাড়তে পারে, কারণ, সচরাচর খুব বেশি কথা বলেন না রোহিত শর্মা। তার ডাকনাম কেন এমন? রোহিত নিজেই জানিয়েছিলেন, তাকে এই নামটা দিয়েছিলেন যুবরাজ সিং। ২০১১ বিশ্বকাপে ব্যাটে-বলে ভারতের সেরা ক্রিকেটারের মনে হয়েছিল, ভারতীয় সাজঘরে রোহিতই একমাত্র যাকে ডাকা যায় ‘শানা’!

তো, সেয়ানা হোক বা হিটম্যান, রোহিতের ব্যাট থেকে রান আটকানো যাচ্ছে না ২০১৯ বিশ্বকাপে। ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যাচ্ছেন আর বেঁচে গেলেই শতরান যেন নিশ্চিত! ইংল্যান্ড ম্যাচে জো রুট ফেলেছিলেন, বাংলাদেশে সেই ভূমিকায় তামিম ইকবাল। ফলে, নতুন রেকর্ডের সঙ্গে যুক্ত হলো

রোহিতের নাম। একটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ চারটি শতরানের রেকর্ড ছিল কুমার সাঙ্গাকারার, যা তিনি করেছিলেন গতবার অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে। এবার সপ্তম ম্যাচে তাকে ধরে ফেললেন মুম্বাইয়ের রোহিত। সাঙ্গাকারার চার শতরান ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। আর রোহিত পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড এবং বাংলাদেশের সঙ্গে। ইংল্যান্ড আর বাংলাদেশ, দুটি নাম ‘কমন’, দুজনের শতরান তালিকায়। রোহিতের হাতে অন্তত শ্রীলঙ্কা ম্যাচ তো আছেই। ভারত সেমিফাইনালে পৌঁছাচ্ছে ধরে নিলে, বাড়তি আরও একটি। সাঙ্গাকারার রেকর্ড ছুঁয়েছেন, ভেঙে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

একটি বিশ্বকাপে শচীন টেন্ডুলকারের রেকর্ড আছে সর্বোচ্চ ৬৭৩ রানের। দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারত পৌঁছেছিল ফাইনালে। শচীন খেলেছিলেন ১১ ম্যাচ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০০৭ বিশ্বকাপে ১০ ম্যাচে ম্যাথু হেডেনের ৬৫৯। আপাতত সাত ম্যাচে রোহিতের রান ৫৪৪, এই লেখার মুহূর্তে সর্বোচ্চ। গড় ৯০.৬৬। চারটি শতরান ও একটি পঞ্চাশ মিলিয়ে পঞ্চাশের ওপর ইনিংস পাঁচটি। তার মুম্বাইয়ের শচীন সেই ২০০৩ বিশ্বকাপেই সাতবার পঞ্চাশোর্ধ রান করেছিলেন। রোহিত তো সেই রেকর্ডের দিকেও দৌড়াচ্ছেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের ম্যাচ ভেস্তে গিয়েছিল। না হলে আরও একটি ইনিংস পেতেন। কী হতো তখন, বলা মুশকিল।

ভারতীয় ব্যাটিংয়ের ত্রিফলা বলা হয় শিখর ধাওয়ান, রোহিত শর্মা এবং বিরাট কোহলিকে। এই তিনজনের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ভারতের তথাকথিত বিশ্বসেরা ব্যাটিং। যা আরও পরিষ্কার এই বিশ্বকাপে রোজ। কোহলির রান ৪০৮। তাকে আর রোহিতকে সরিয়ে নিলে সত্যিই কঙ্কালসার এই প্রচারসর্বস্ব সেরা ব্যাটিংয়ের তকমা। না হলে, ব্রায়ান লারার পাঁচশোর মাঠে ২৯ ওভার ২ বলের মাথায় ভারত যখন প্রথম উইকেট হিসাবে হারাল রোহিতকে, রান ১৮০। ওয়ানডে ক্রিকেটের অলিখিত নিয়ম, ৩০ ওভারে যা রান থাকে, ৫০ ওভার শেষে তার দ্বিগুণের কাছাকাছি রান ওঠেই। ভারতীয় ইনিংস যথারীতি খেই হারাল শেষ পথে। দুর্দান্ত বোলিং বাংলাদেশের, নিঃসন্দেহে। কিন্তু, একদিনের ম্যাচে অমন ভয়ংকর শুরুর পরও ব্যাট করেই বিপক্ষকে ম্যাচের বাইরে পাঠানো যাবে না?

তাই, কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয় রোহিতের জন্য। সুনীল গাভাস্কারের অন্যতম প্রিয় ক্রিকেটার। মুম্বাইকার গাভাস্কার রোহিতের সঙ্গে তুলনা করেন বীরেন্দ্র শেবাগের। প্রধানত, বড় সেঞ্চুরির তাগিদের কারণে। ‘বীরুও থামতে চাইত না। সেঞ্চুরি করলে এগিয়ে যেতে চাইত। রোহিতের এই প্রবণতা আছে। সহজে সন্তুষ্ট হয় না।’ সে কারণেই হয়তো একদিনের ক্রিকেটে একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরির মালিক। এমনকি, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও সর্বোচ্চ চারটি আন্তর্জাতিক শতরান রোহিতের ঝুলিতে। একেবারেই দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। বাবার সামান্য চাকরি ভাইবোনদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারত না বলে কাকাদের কাছে মানুষ ছোটবেলায়।

সেখান থেকে উঠে আসার পথে এমন দিনও এসেছিল রোহিতের জীবনে যখন, অনুশীলনে গিয়েছিলেন একটি ছোট গাড়িতে, ফেরার পথে গাড়ি বদলে বিশ্বের সবচেয়ে দামি গাড়িগুলোর অন্যতম একটিতে চড়ে! সেই সময় মুম্বাই মহলে কান পাতলে শোনা যেত, পয়সার মুখ দেখে মাথা ঘুরে গিয়েছে ছেলেটার। একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা, এখন রোজ বুঝিয়ে যাচ্ছেন রোহিত। তিনি মাঠে মানে রোলস রয়েসে চড়ে এগোচ্ছে ভারতীয় ইনিংস, আউট হয়ে গেলে সেই ইনিংসই যেন ছ্যাঁকড়াগাড়িতে!

বাংলাদেশের জন্য কুর্নিশ তবু থাকছেই। শুরুতে রোহিত-লোকেশ রাহুলের ব্যাটে ম্যাচের বাইরে চলে গিয়েও ঠিক সময় ফিরে আসা, ভারতীয় ইনিংসকে আটকে রাখা ৩১৪ রানে, যা তারা তাড়া করতে সক্ষম। ভারতকে যে এভাবে বেঁধে ফেলা যায়, আবারও দেখালেন তারা। ৫৯ রানে মোস্তাফিজুরের পাঁচ উইকেট, একটি রান আউটেও অবদান থাকল। তাকে খেলতে সমস্যায় পড়ল ভারত। আর, সাকিব আল হাসান তো আবারও দুরন্ত। ধোনির ক্যাচ নিলেন, বিপজ্জনক হয়ে ওঠার মুখে ঋষভ পান্তের উইকেট, ১০ ওভারে মাত্র ৪১ রান দিয়ে। ২০০৩ বিশ্বকাপে ৬৭৩ রান করেও ট্রফি ওঠেনি শচীনের হাতে। বলা এবং লেখা হয়েছিল, আর কী করতে পারতেন শচীন, ভারতকে বিশ্বকাপ জেতাতে? এবার হয়তো সেই প্রশ্নটা নতুন করে উঠে আসবে সাকিবের জন্যও!