গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি

চলতি মৌসুমে দেশের ভেতর থেকে গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি সরকার। গত রবিবার সংগ্রহের শেষ দিন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১১ হাজার টন গম কম সংগ্রহ হয়েছে। এবার ২৮ টাকা কেজি দরে ৫০ হাজার টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাজমানারা খানুম গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারিনি। তারপরও বিদেশ থেকে না এনে এই গম দেশের ভেতর থেকেই সংগ্রহ করা হবে। আরও ১৫ দিন সময় বাড়ানো হয়েছে গম সংগ্রহের জন্য। আমাদের মজুদ সন্তোষজনক। মাসিক চাহিদা ও বিতরণ পরিকল্পনার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ আছে। এই মুহূর্তে খাদ্যশস্যের কোনো ঘাটতি নেই বা ঘাটতির কোনো আশঙ্কাও নেই। এসব কারণে আমরা বিদেশ থেকে না এনে দেশের ভেতর থেকেই সংগ্রহের সময় বাড়িয়েছি।’

কৃষকদের উৎপাদিত গমের প্রণোদনামূলক মূল্য প্রদান নিশ্চিত করার জন্য প্রতি বছরই অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে গম সংগ্রহ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সরকারের মজুদ গড়ে তোলাও এই সংগ্রহ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। তবে দেশের ভেতর থেকে গত বছর কোনো গম সংগ্রহ করা হয়নি। ২০১৭ সালে দেশের ভেতর থেকে এক লাখ টন গম কেনা হয়। তার আগের বছর কেনা হয়েছিল দুই লাখ টন গম।

গত বছর দেশে সাড়ে ১২ লাখ ৮৭ হাজার টন গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ ৮৭ হাজার   টন কম গম উৎপাদন হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬১ হাজার হেক্টর কম জমিতে গমের চাষ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৬ শতাংশ কম। এই অবস্থায় দেশের ভেতর থেকে সরকার ৫০ হাজার টন গম কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। গম সংগ্রহ অভিযান শুরু হয় গত ১ এপ্রিল। প্রতি কেজি গমের দাম ধরা হয় ২৮ টাকা কেজি।

খাদ্য অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের ভেতর থেকে যে গম কেনা হয় তার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক বেশি। যে গম দেশের ভেতর থেকে ২৮ টাকা কেজিতে সংগ্রহ করা হয় রাশিয়া থেকে সেই গম বাংলাদেশে আনা যায় ২৪ টাকা কেজি দরে। কিন্তু তারপরও আমরা দেশের ভেতর থেকে গম কিনতে চাই দেশের কৃষকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার জন্য।

তিনি জানান, বাংলাদেশি গম দেশের ভেতরের অনেক নামিদামি বেকারি সংগ্রহ করে। কারণ বাংলাদেশের গমে পর্যাপ্ত গ্লুটিন (আঠালো পদার্থ) রয়েছে। তা ছাড়া এই গমের টেস্টওয়েটও তুলনামূলক অনেক বেশি।

গতকাল পর্যন্ত সরকারের গুদামে ১৬ লাখ ২৯ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ ছিল। এর মধ্যে ২ লাখ ৭৫ হাজার টন গম, অবশিষ্ট ১৩ লাখ ৫৬৪ হাজার টন চাল। গত বছর এই সময় সরকারের খাদ্যশস্যের মজুদ এর তুলনায় তিন লাখ টন কম ছিল।

গমের আন্তর্জাতিক বাজার দর স্থিতিশীল রয়েছে। গত বছর এই সময় গড়ে প্রতিটন রাশিয়ান গমের দাম ছিল ১৯৯ ডলার। গতকাল রাশিয়ান গমের দাম ছিল টনপ্রতি ১৯৬ মার্কিন ডলার।

গত কয়েক বছর ধরে দেশের কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসলের নায্য দাম পাচ্ছেন না। বিশেষ করে ধানের দাম পাচ্ছেন না। এ বছর ধানের যে উৎপাদন খরচ, তার চেয়ে অনেক কম দামে কৃষককে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। কৃষি উপকরণের উচ্চ দামের পাশাপাশি শ্রমিক সংকট ছিল তীব্র। এই অবস্থায় কৃষক নিজের ধানক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। নজিরবিহীন এ ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থায় সরকার সংগ্রহ নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে সরকার দেশের মোট ধান-গমের তিন থেকে চার শতাংশ সংগ্রহ করে। আগামী বছর থেকেই সেই সংগ্রহ বাড়াতে ১০০ সাইলো গুদাম নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সাইলোগুলো দেশের ধান উৎপাদনকারী প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্মাণ করা হবে। এসব সাইলোতে ধান শুকানোর ড্রায়ার মেশিনও থাকবে।

গত ২৫ এপ্রিল থেকে বোরো সংগ্রহ অভিযানও শুরু করেছে সরকার। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এ সংগ্রহ অভিযান অব্যাহত থাকবে। গতকাল পর্যন্ত ৭৯ হাজার ৪৫৯ টন বোরো ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫১৫ টন। আতপ চাল সংগ্রহ হয়েছে ৫৫ হাজার ৯৭১ টন। গত বছরের একই মৌসুমে খাদ্য অধিদপ্তর ১৩ লাখ ৯৫ হাজার ৪২৬ টন বোরো চাল সংগ্রহ করেছিল।