ডেঙ্গু প্রতিরোধে সতর্কতা

রাজধানী ঢাকায় স্বল্প সময়ের মধ্যেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুজ্বর। বছরের প্রায় শুরু থেকেই ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব বাড়তে দেখা গেছে এবং বিগত ছয় মাস ধরেই ডেঙ্গু আক্রান্তরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।  তবে গত দুই মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ইতিমধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক নারী চিকিৎসকসহ তিন জন মারা গেছেন। এ অবস্থায় গত দুই সপ্তাহে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ব্যাপকহারে বাড়তে থাকায় এবার ডেঙ্গু মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।    

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্যানুযায়ী, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ২ হাজার ২৭৭ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৮, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, মার্চে ১৭, এপ্রিলে ৫৮, মে তে ১৯৩, জুনে ১ হাজার ৬৯৯ এবং জুলাই মাসের প্রথম তিন দিনে ২৫৪ রোগী আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন ১ হাজার ৯৩৯ জন এবং এখনো বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩৩৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত। 

 

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি আরেকটি উদ্বেগও বেড়েছে এবার। সেটি ডেঙ্গুজ্বরের নতুন প্রকরণ ‘শক সিনড্রোম’ যুক্ত ‘সেরোটাইপ-৩’ বেড়ে যাওয়া। এতদিন বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ‘সেরোটাইপ-১’ ও ‘সেরোটাইপ-২’ এর প্রকোপ ছিল। প্রথমটি সাধারণ ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু। দ্বিতীয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হেমোরেজিক (রক্তক্ষরণ) ডেঙ্গু। সাধারণত ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু রোগী দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে হেমোরেজিক ডেঙ্গু দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে রোগীর শরীরের ভেতর বা বাইরে রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু গত বছর থেকে ডেঙ্গুর নতুন ধরন ‘সেরোটাইপ-৩’ দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে রোগীদের শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণের পাশাপাশি ‘শক সিনড্রোম’ দেখা দেয়। তবে, এটা শুরুতেই জানা গেলে রোগীদের চিকিৎসা এবং মৃত্যুঝুঁকি রোধে ভূমিকা রাখা সম্ভব। আশঙ্কার বিষয় হলো, এবার যে ডেঙ্গু রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই ‘সেরোটাইপ-৩’-এ আক্রান্ত।  

 

ডেঙ্গুর এই নতুন প্রকরণ ‘শক সিনড্রোম’ যুক্ত ‘সেরোটাইপ-৩’ এর লক্ষণ ও প্রতিকারের বিষয়টি দেশ রূপান্তরের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম শামসুজ্জামান। তিনি বলেছেÑ শক সিনড্রোমের উপসর্গ হলো শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়া কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া। ত্বক শীতল হয়ে যাওয়া। অবিরাম অস্বস্তি, ত্বকের ভেতরের অংশে রক্তক্ষরণের কারণে ত্বকের ওপরের অংশে লাল ছোপ সৃষ্টি হওয়া। বমি, মল কিংবা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, প্রচণ্ড পেটব্যথা ও অনবরত বমি হওয়া, নাক ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ ও অবসাদ। এ উপসর্গগুলো চোখে পড়লে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

 

দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব যে ক্রমান্বয়ে বাড়ছেই তা বোঝা যাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকক্ষের হিসাব থেকেও। ২০১৫ সালে দেশে ৩ হাজার ১৬২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আর ২০১৮ সালে এই সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়ে উন্নীত হয়েছে ১০ হাজার ১৪৮ জনে। এদিকে, রাজধানীতে ডেঙ্গু বাড়ার যে কারণগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে অন্যতম ঢাকায় ব্যাপক নির্মাণযজ্ঞ। নগরের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণকাজের কারণে খানাখন্দ ও মাটিকাটা থাকায় উন্মুক্তস্থানে সহজে পানি জমে মশা বাড়ছে। এ ছাড়া সার্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণেও মশা বেড়ে গেছে। থেমে থেমে বৃষ্টি ও তাপমাত্রার পরিবর্তন এডিস মশা জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।  

 

অবস্থাদৃষ্টে এটা প্রতীয়মান যে, বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়তে

থাকলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি। বিশেষত রাজধানীতে নানা উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে সে বিষয়ে নজরই দেওয়া হয়নি। নির্মাণকাজের কারণে মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত যেসব খানাখন্দ তৈরি হয়েছে সেগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে হবে। এদিকে, বিগত বছরগুলোতে দুই সিটি করপোরেশনেরই মশা মারার বাজেট বাড়ানো হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ঢাকা মহানগরে মশা নিধনে মোট বাজেট ছিল ২১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তিন বছরের ব্যবধানে মশা মারার বাজেট দ্বিগুণ হয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ৪৯ কোটি টাকা হয়েছে। কিন্তু এতে রাজধানীর মশা পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। এ অবস্থায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে রাজধানীতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো এবং বিশেষ স্বাস্থ্য সতর্কতা নেওয়া অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি বাড়িঘরসহ নিজ নিজ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ডেঙ্গু মোকাবিলায় নাগরিকদের সচেতন হওয়া খুবই জরুরি।