সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আরও উদ্যোগ দরকার

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৭ জুলাই থেকে রাজধানীর তিন সড়কে রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত হলেও এতে তেমন সুফল মিলবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা। তারা বলছেন, ঢাকায় যানজটসহ সড়কে দুর্ভোগ সৃষ্টিতে এককভাবে রিকশাকে দোষারোপ করা যাবে না। নগরীর সার্বিক সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় যে ত্রুটি দেখা দিয়েছে তা নিয়ে বিশদভাবে ভাবতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা ট্রাফিক কন্ট্রোল (ডিটিসি) অথোরিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবতলী থেকে আজিমপুর (মিরপুর রোড), সায়েন্স ল্যাব থেকে শাহবাগ ও কুড়িল থেকে খিলগাঁও হয়ে

 সায়েদাবাদ পর্যন্ত সড়কে ৭ জুলাই থেকে আর রিকশা চলবে না। ঢাকার প্রধান সব সড়কে ক্রমান্বয়ে রিকশা চলাচল বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে আমরা আস্তে আস্তে বড় সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ করব। ২২টি রুটে বিভক্ত করে ৬টি কোম্পানির মাধ্যমে গণপরিবহনব্যবস্থা চালু করা হবে।’

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হিসাবে, রাজধানীজুড়ে রিকশার সংখ্যা মাত্র ৮৭ হাজার। এ দুই সিটির মোট অধিবাসীর সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখের মতো। তবে বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য বলছে, ঢাকা শহরে রিকশার সংখ্যা ১১ লাখের ওপরে। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ।

‘শুধু রিকশাকে দোষারোপ করে ঢাকার আধুনিক চরিত্র ফিরিয়ে আনা যাবে না’ মন্তব্য করে নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ড. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শহর যখন গড়ে ওঠে, তখন এর প্রধান দুটি বিষয়ের প্রতি নজর দিতে হয়। পরিবহন নেটওয়ার্ক ও পরিবহনের সংখ্যা। ঢাকায় যে ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে তা বিজ্ঞানসম্মত নয়। এখানে ট্রাংক রোড, সেকেন্ডারি রোড, লোকাল রোড সঠিক কায়দায় হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, ঢাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এখানে যে সড়ক আছে তাতে বড় বাস চলাচলের জায়গা নেই। দুনিয়ার আধুনিক শহরগুলোতে বহুমুখী পরিবহনব্যবস্থা হয়। গরিব দেশ হিসেবে ঢাকায় হাঁটা, বাইসাইকেল, ট্রাইসাইকেল ও মোটরযান মিলিয়ে এক ভালো সম্ভাবনার শহর গড়ে তোলা যেত। সেটা নষ্ট হয়েছে দায়িত্বশীল কর্র্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে।’

বিলসের জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক ও পরামর্শক খোন্দকার আবদুস সালাম বলেন, ‘বিমানবন্দর সড়কে রিকশা চলে না, কিন্তু সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট হচ্ছে। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে রিকশা ওঠে না, তবু চানখাঁরপুল মোড় পার হতেই ২০ মিনিটের বেশি সময় লাগে। এর মানে রিকশা না থাকলেও যানজটের সমস্যা আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদিও দ্রুতগতির যানের সঙ্গে স্বল্পগতির রিকশা একই রোডে চলাচল ঠিক নয়। রিকশাওয়ালারা দুর্বল তাই তাদের ওপরই সব দোষ চাপানোর চেষ্টা চলে।’ ঢাকায় রিকশা কমাতে হলে শহর ও গ্রামীণ অর্থনীতির বৈষম্য কমানোর ওপর জোর দেন খোন্দকার আবদুস সালাম।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এ শহর একই সঙ্গে যান চলাচলের উপযোগী ও পদচারীবান্ধব করে সাজানো উচিত ছিল। সেখানে রিকশা স্বল্প দূরত্বের যান হিসেবে খুব ভালোভাবে টিকে থাকতে পারত।’ ঢাকার পরিস্থিতি কারও নিয়ন্ত্রণে নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘দারিদ্র্যের কারণে লাখ লাখ মানুষ রিকশা চালাতে শহরে আসছে। তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যে সিটি করপোরেশনের হাতে ছিল তারা ব্যর্থ হয়েছে।’ রিকশা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে বলে মত দেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আদর্শ নগরীর মোট ২৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হয় সড়কের জন্য। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় সড়ক আছে মাত্র ৭ শতাংশ। সংস্থাটি আরও বলছে, ১৯৯৭ সালে ঢাকার রাস্তায় গড়ে গাড়ি চলত ঘণ্টায় ২৭ কিলোমিটার। ২০১৫ সালের পর থেকে এ হার নেমে এসেছে মাত্র ৬ কিলোমিটারে। এতে প্রতিদিন কয়েক লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।