কসবায় যুবলীগ নেতাকে পিটিয়ে কুপিয়ে হত্যা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার যমুনা গ্রামে এক যুবলীগ নেতাকে পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। তার নাম মো. শওকত হোসেন জসিম। গত শুক্রবার দুপুরে তাকে বাড়ি থেকে ফোনে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে গুরুতর অবস্থায় একটি স্কুলের কক্ষ

থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। রাত দেড়টার দিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শওকতের মৃত্যু হয়। শওকত হোসেন মেহারী ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের সদস্য ও যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকা- হতে পারে বলে ধারণা করছে এলাকাবাসী। 

পরিবারের অভিযোগ, মেহারী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশারফ হোসেন মোর্শেদ ও উপজেলা বিএনপির নেতা জাকিরের লোকজন শওকত হোসেন জসিমকে ডেকে নিয়ে যায়।

হাসপাতালে মৃত্যুর আগে শওকত হোসেন জসিমের সাক্ষাৎকারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তিনি হামলাকারীদের নাম বলেন। সেখানে জাকির মাস্টারের ছেলে ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মোর্শেদ, জাকির, ওয়াসিম, অনন্ত জসীমসহ বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে।

তবে মেহারী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশারফ হোসেন মোর্শেদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি শুক্রবার আইনমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে সৈয়দাবাদে একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ঢাকায় ফিরে আসি। গভীর ষড়যন্ত্রের কারণে আমার বিরুদ্ধে তারা অভিযোগ করছে। যারা শওকত মেম্বারকে ডেকে নিয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তারা ও শওকত মেম্বার একই গ্রুপের।’

নিহত শওকতের মেয়ে জিদনি আক্তার জানান, শুক্রবার দুপুরে কে বা কারা শওকতকে ফোন করে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। রাত সোয়া ৮টার দিকে শওকত বাড়িতে ফোন করে জানান বাড়ি আসছেন। এর কিছুক্ষণ পর খবর পাওয়া যায় শওকতকে মারধর করে যমুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে ফেলে রাখা হয়েছে।

শওকতের ছোট ভাই ওয়াসিম জানান, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে এলাকার জহিরের ছেলে ওয়াসিম, আলী আজগরের ছেলে অনন্ত জসীম, মোবারক, সামদানী শওকতকে যমুনা বাজার থেকে ডেকে স্কুলে নিয়ে যায়। এ সময় বিষয়টি সন্দেহ হলে তাদের পিছু পিছু যান ওয়াসিম। যমুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে দেখেন, তার ভাই শওকতকে একদল মানুষ ঘেরাও করে মারধর করছে আর শওকত চিৎকার করছেন। এ সময় ওয়াসিম তাদের কাছে গিয়ে ভাইকে বাঁচাতে চেষ্টা করলে তাকেও ধরে মারতে শুরু করে তারা। এ সময় তিনি দৌড়ে রাস্তায় এসে চিৎকার করতে থাকেন। এ সুযোগে হামলাকারীরা তার ভাইকে আধামরা অবস্থায় স্কুলের একটি কক্ষে রেখে চলে যায়। এলাকার কয়েকজন এগিয়ে এলে ওয়াসিম স্কুলকক্ষের তালা ভেঙে ভাইকে উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার মৃত্যু হয়।

ওয়াসিম আরও বলেন, ‘আমার ভাইকে যারা ডেকে নিয়েছিল তারা সবাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশারফ হোসেন মোর্শেদ ও তার বড় ভাই উপজেলা বিএনপির নেতা জাকিরের লোকজন। আমার ভাইকে মারার সময়ও মোর্শেদ আর তার ভাই উপস্থিত ছিলেন।’ কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শওকত মেম্বার একটি ভিডিওতে আওয়ামী লীগ নেতা মোর্শেদ, তার ভাই জাকিরসহ আটজনের নাম বলেছে বলেও ওয়াসিম জানান।

মেহারী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশারফ হোসেন মোর্শেদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আমি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী। আমাকে ঠেকাতে আর কোনো অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে এবার হত্যার সঙ্গে জড়িত করার চেষ্টা চলছে। শওকত মেম্বার ৮-৯টি মামলার আসামি। হাসপাতালে শওকতকে চিকিৎসা না করিয়ে জোর করে ভিডিওতে সাক্ষ্য নিয়ে নাম বলানো হয়েছে। ভিডিওটি আমি দেখেছি। তাকে দিয়ে জোর করে আমাদের ও আমাদের বাবার নাম বলানো হয়েছে।’

ভিডিও ধারণকারী ইউপি বঙ্গবন্ধু পরিষদ সভাপতি এসএম শামীম বলেন, ‘কসবা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর শওকত মেম্বার বলেনÑ আমাকে যেভাবে মারা হয়েছে আমি নাও বাঁচতে পারি। তোমরা আমার একটা বক্তব্য রেকর্ড করে রাখ। আমার জবানবন্দি নিয়ে রাখ। তখনই আমি তার কথাগুলো রেকর্ড করি।’

কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার এসআই মোর্শেদ জানান, শওকতের মাথার ডান পাশে গুরুতর জখম সেলাই করা, বাম পাশে কানের কাছে গভীর ক্ষতযুক্ত আঘাত, দুই পায়ের হাঁটুর নিচে ভাঙার ব্যান্ডেজ, পিঠের নিচে মাজায় বড় আঘাতসহ দুই হাতের কয়েকটি স্থানে এবং শরীরের নানা জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

কসবা থানার ওসি (তদন্ত) আসাদুল ইসলাম জানান, এলাকায় শোনা যাচ্ছে দুটি দলের পূর্ব বিরোধের জের ধরেই শওকত মেম্বারকে খুন করা হয়েছে। এলাকায় পুলিশ টহল দিচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত আছি। এ ঘটনায় শনিবার বিকেল পর্যন্ত কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তবে এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্কুলের নৈশপ্রহরী যমুনা গ্রামের আবু সাঈদের ছেলে ইয়া নূরকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজাউল কবীর ও কসবা-আখাউড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল করিম। এএসপি আবদুল করিম জানান, হামলার খবর পাওয়ার পরই এলাকায় পুলিশ পাঠানো হয়। ধারণা করা হয়েছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এ হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছি।