সেমিফাইনালে ভারতের অন্য ধর্মযুদ্ধ

সেমিফাইনালে একমাত্র এশীয় দেশ হিসেবে থেকে গিয়েছে ভারত। বাকি তিন শ্বেতাঙ্গ দেশের কাছে যা মোটেও সুখের কথা নয়। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বিদায় নিয়েছে গ্রুপ লিগ থেকেই। এশিয়ার পড়ে-থাকা প্রতিনিধি ভারতই শুধু। ইংল্যান্ডের ব্রডশিটগুলো তো এখনই লিখতে শুরু করে দিয়েছে, আয়োজকদের

খেলতে হবে না ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে, এটা সুখবরই। মাঠে অন্তত ইংরেজ সমর্থক বেশি থাকবে অস্ট্রেলীয়দের তুলনায়। চিৎকার-চেঁচামেচিও কম হবে। ঘুরিয়ে বোঝানোর কী ‘শিক্ষিত’ প্রচেষ্টা যে, ‘সভ্য’ শ্বেতাঙ্গরা মাঠে চিৎকারটা কম করেন, এশীয়রা তুলনায় তো ‘অসভ্য’ই! এই শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত বিশ্বকাপ নকআউট দুনিয়ার বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল তাই অন্য ধর্মযুদ্ধও, বিরাট কোহলিদের। সুধীর চৌধুরী, চারুলতা প্যাটেলদের গ্যালারিতে সঙ্গী করেই।

যদিও ৭-১ ফল নিয়ে গ্রুপ লিগে শীর্ষেই শেষ করেছে ভারত, একটিই ম্যাচ হেরেছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, কিন্তু, ভারতীয় প্রথম একাদশ নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই, সেমিফাইনালের আগেও। তিন পেসারই কি খেলবেন ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে? হার্দিক পান্ডিয়াকে ধরলে তো চারজন তখন। স্পিনার কি তাহলে একজনই? ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট অবশ্য এক স্পিনার নিয়ে খেলাটা বিশেষ পছন্দ করছে না। শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রবীন্দ্র জাদেজা ভালো খেলে ফেলার পর সমস্যা বেড়েছে। জাদেজা থাকা মানে ব্যাটিংয়ে কিছু রান আশা করাই যাবে হার্দিক আর জাদেজার কাছে। তখন, নিউজিল্যান্ডের বাঁহাতিদের বিরুদ্ধে চায়নাম্যান-বোলার কুলদিপ যাদব না ডানহাতি লেগ স্পিনার যুজবেন্দ্র চাহাল? চাহাল বেশি উইকেট নিয়েছেন, কুলদিপ ততটা ছন্দে নেই বলেই মনে হয়েছে। চাহালের বল বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের অফ স্টাম্পের বাইরে থেকে ভেতরে আসবে, কুলদিপের ক্ষেত্রে লেগ স্টাম্পের বাইরে থেকে। চাহাল আর জাদেজা খেললে, একই দিক থেকে বল আসবে বাঁহাতিদের জন্য। সমস্যা অনেক।

আরও বেশি সমস্যা, ভুবনেশ্বর কুমার না মোহাম্মদ শামি? উইকেট বেশি পেয়েছেন শামি, মারও তুলনায় একটু বেশিই খেয়েছেন। শেষ ম্যাচে ভুবনেশ্বর রান না দিয়ে ফেললে হয়তো নিশ্চিতভাবেই এগিয়ে যেতেন। এখন অবস্থা সঙ্গীন ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের।

প্রথম এগারো বেছে নিতে আরও সমস্যা ব্যাটসম্যানদের কথা ভাবলে। দিনেশ কার্তিক কি থাকবেন? দুটি ম্যাচের একটিতে ব্যাট পাননি, অন্যটিতে এমন সময় এসেছিলেন, বেশি কিছু করার ছিল না। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও কি ঋষভ পান্তের মতো অনভিজ্ঞ থাকবেন চার নম্বরে? আবার, এমন ম্যাচে ব্যাটিং অর্ডার বদলে ফেললে মানসিক দিক দিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কি উড়িয়ে দেওয়া যায়?

বিপক্ষে নিউজিল্যান্ড, আপাতদৃষ্টিতে যাদের ব্যাটিংয়ে এখন একমাত্র ভরসা অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন। ভারতের বিপক্ষে তার রেকর্ড দুর্দান্ত। অবশ্য, কোন দেশের বিপক্ষেই বা নয়! তিনি রান পাননি বলে শেষদিকের ম্যাচে নিউজিল্যান্ড ব্যাটিংকেও ভঙ্গুর দেখিয়েছে। ভারতের বিপক্ষে অবশ্য নিউজিল্যান্ডের রেকর্ড বেশ ভালোই। উল্টে, কিউই জোরে বোলারদের বিরুদ্ধে ততটা ভালো দেখাচ্ছে না ভারতের ব্যাটিং-পারফরম্যান্স। বিশ্বকাপের ঠিক আগে ট্রেন্ট বোল্টরা বড় হার উপহার দিয়েছিলেন। বিশ্বকাপের গ্রুপ লিগে এই ম্যাচটা বৃষ্টিতে ভেস্তে গিয়েছিল। দু’দলই তাই পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পাচ্ছে এবং সেমিফাইনাল থেকে কিন্তু রিজার্ভ ডেও রাখা হয়েছে। নকআউট বৃষ্টিতে ভেসে গেলে তা কোনো দেশের পক্ষেই যেমন সুবিচার নয়, খেলাটার প্রতিও নয়।

হঠাৎ আরও একটি চিন্তাও উঠে আসছে। গ্রুপ পর্যায়ে আট ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুটি ম্যাচে (আফগানিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ) রান পাননি রোহিত ‘সেঞ্চুরি’ শর্মা। ভারতীয় ব্যাটিং কিন্তু এখনো রোহিত-বিরাট নির্ভরও, সে যতই লোকেশ রাহুল শেষ ম্যাচে শতরান করুন না কেন। ইনিংসের শুরুতে রোহিতের নড়বড়ে ভাব নিউজিল্যান্ড মাথায় রাখবে না ভাবলে বিরাট ভুল। কিউইরা জানেন খুব ভালো করেই যে, রোহিত-বিরাটকে তাড়াতাড়ি আউট করতে পারলে, ম্যাচ হাসতে হাসতে জিতে যাওয়া সম্ভব হতেই পারে, ২০১৫-এর পর আবারও ফাইনালে যেতেই পারে নিউজিল্যান্ড।

আগে থেকে ভেবে নেওয়ার চেষ্টা থাকে মানুষের। ভারত-অস্ট্রেলিয়া ফাইনালের দিকেই ঝুঁকে আছেন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ। যার মানে দাঁড়াচ্ছে, নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড এই দুটি সেমিফাইনালে আন্ডারডগ। সত্যিই কি? কয়েকজন তো ফাইনালে আবার ইংল্যান্ড বনাম নিউজিল্যান্ডই দেখছেন, যা হলে নিশ্চিত হয়ে যাবে, বিশ্বকাপ এবার পাবে নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। তবে, তার জন্য মঙ্গল আর বৃহস্পতিবার অপেক্ষার পালা।

কয়েক মাস আগের বিরাট হলে কী হতো এমন পরিস্থিতিতে, ভেবে নেওয়া কঠিন। বিশ্বকাপে ভারতের অধিনায়ক অবশ্য সচেতনভাবেই নিজের ‘ভালো ছেলে’ ইমেজটা তুলে ধরছেন। আউট না হয়ে ফিরে যাচ্ছেন নিজে থেকেই, তাও পাকিস্তানের বিপক্ষে! অস্ট্রেলীয় স্টিভ স্মিথের সমর্থনে এগিয়ে আসছেন, নিজের দেশের সমর্থকদের বারণ করছেন স্মিথকে টিটকিরি দিতে। বার দুই নিজের আক্রমণাত্মক মানসিকতার পরিচয় দিলেও আট ম্যাচের হিসাবে তা নগণ্য। প্রতিযোগিতার একেবারে শুরুতে তাকে ‘অপরিণত ক্যাপ্টেন’ বলার পরও কাগিসো রাবাদাকে পাল্টা কিছু শুনতে হয়নি। সেমিফাইনাল পুরনো আগ্রাসী বিরাটকে বের করে আনবে কি না শৃঙ্খলার মোড়ক ছিঁড়ে, সেটাও তো বড় প্রশ্ন!