শেষ দেখা হলো না মঞ্জুর হত্যা মামলার

টানা নয় বছর সামরিক শাসক থাকাকালে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে। গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর তাকে পড়তে হয় মামলাজটে। ৪৩টি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। গত তিন দশকে এর মধ্যে ৪২টি মামলা থেকে মুক্তি পেলেও শেষ অবধি একটি হত্যা মামলার আসামি হয়েই চিরবিদায় নিতে হলো এরশাদকে। সে মামলাটি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলা। যদিও এরশাদ সবসময় ওই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। এসব মামলা নিয়ে

রাজনৈতিক দলগুলো যেমন এরশাদকে ব্যবহার করেছে; তেমনি এরশাদও ছিলেন বেশ বিপদে। এরশাদের ভাষায়, ৯০ বছরের জীবনের শেষ ২৯টি বছরে একটি দিনও তিনি সুখী ছিলেন না। আর তার ওই অসুখের কারণ ছিল দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে করা সাড়ে তিন ডজন মামলা।

২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে এরশাদ বলেন, এখনো আমার নামে মামলা আছে। আমার মতো দুঃখী কেউ নেই। পার্টির জন্য আমার চেয়ে কষ্ট কেউ করেনি।

১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি এরশাদের পতনের পর বিভিন্ন অভিযোগে মোট ৪৩টি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। এর তিনটিতে নিম্ন আদালতে তার সাজার আদেশ হলেও হাইকোর্টে একটিতে খালাস পান। বাকি দুই মামলায় তিনি সাজা খাটা শেষ করেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে পাওয়া উপহার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে আর্থিক অনিয়মের মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত এরশাদকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়। দুই যুগ পর হাইকোর্ট সেই সাজা বাতিল করে এরশাদকে খালাস দেয়।

জাপানি নৌযান কেনায় অনিয়মের অভিযোগে দায়ের মামলায় প্রথমে এরশাদের তিন বছর এবং পরে হাইকোর্টে আপিলে সাজা কমে দুই বছরের কারাদণ্ড হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুই বছর কারাগারে কাটানোয় এরশাদকে নতুন করে আর ওই মামলায় দণ্ড ভোগ করতে হয়নি।

জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালত এরশাদকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। ১৭ বছর পর হাইকোর্ট সাজা কমিয়ে এরশাদকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা করে।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল চলাকালে এরশাদের সাড়ে তিন বছর কারাভোগ শেষ হওয়ায় আপিল বিভাগ পরে জরিমানার দণ্ড বহাল রেখে এরশাদকে অবশিষ্ট দেড় বছর সাজাভোগ থেকে অব্যাহতি দেয়।

এছাড়া স্বর্ণ চোরাচালান, টেলিকম দুর্নীতি, পোল্ট্রি ফার্ম দুর্নীতি মামলা, আয়কর ফাঁকি, জাহাজ কেনায় দুর্নীতি, রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়ম, হরিপুরে তেল অনুসন্ধানে দুর্নীতি এবং রাডার কেনায় দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আরও ১৯টি মামলা ছিল এরশাদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে কয়েকটিতে তিনি নিম্ন আদালত থেকে বেকসুর খালাস পান। কয়েকটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

কিন্তু ৩৮ বছর আগে সেনাবাহিনীর মেজর আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এরশাদের গলার কাঁটা হয়েই ছিল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় চট্টগ্রামে একদল সৈন্যের গুলিতে নিহত হন বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ওই ঘটনার পর পুলিশের হাতে আটক হন জেনারেল মঞ্জুর, যিনি সে সময় সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন। পুলিশ হেফাজত থেকে ১ জুন চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নেওয়ার পর তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন এরশাদ ছিলেন সেনাপ্রধানের দায়িত্বে। পরে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।

গণআন্দোলনে এরশাদের পতনের ১৪ বছর পর ১৯৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন মঞ্জুরের ভাই। ওই বছরই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তখনকার সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ অভিযোগপত্র দেন এবং বিচার শুরু করে আদালত। তবে সরকার বদল এবং রাষ্ট্রপক্ষের গড়িমসিতে এ মামলার বিচারকাজ বিলম্বিত হতে থাকে বারবার।

মামলার শুনানির সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে এরশাদ বলেন, জেনারেল মঞ্জুরকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তৎকালীন সরকার রেডিও-টিভিতে ৫ লাখ টাকা ঘোষণা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। তবে ওই ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

২০১২ সালের ২ অক্টোবর নাজিমউদ্দিন রোডের বিশেষ এজলাসে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত দায়রা জজের কাছে আত্মপক্ষ সমর্থন করে লিখিত বক্তব্য দাখিল করেন এরশাদ।

২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি মামলার ২৩তম বিচারক ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হোসনে আরা আক্তার আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য ওই বছর ১০ ফেব্রুয়ারি দিন ঠিক করে দেন। কিন্তু এক সপ্তাহের মাথায় বিচারকের বদলির আদেশ আসে। তার জায়গায় নতুন বিচারক হিসেবে যোগ দেন খন্দকার হাসান মাহমুদ ফিরোজ। রায় দেওয়ার আগে তিনি নতুন করে যুক্তিতর্ক শুনতে চান। সেজন্য ২৭ ফেব্রুয়ারি দিন ঠিক করে দেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) আসাদুজ্জামান খান রচি সেদিন এ মামলায় অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে বিচারিক তা মঞ্জুর করেন।

এরপর দফায় দফায় সময় বাড়ানো হলেও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন আর জমা দিতে পারেনি। সর্বশেষ চলতি বছর ২৭ জুন নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক শরীফ এ এম রেজা জাকের অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৬ আগস্ট দিন ঠিক করে দেন। তার আগেই মামলার প্রধান আসামির মৃত্যু ঘটল।

জাতীয় পার্টির নেতারা বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন, এরশাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার হয়েছে। বাকি সব মামলা থেকে এরশাদ একে একে মুক্ত হলেও মঞ্জুর হত্যা মামলা এরশাদকে আটকে রেখেছিল রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে। জোট আর ভোটের রাজনীতিতে এরশাদকে ‘বশে রাখতে’ এ মামলাটিকে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ নেতাদের।