ভাগ্য পুরোপুরি ইংল্যান্ডের পক্ষে ছিল

ফাইনাল যেমন উইকেটে খেলা হলো, সেখানে ২৪১ রান মোটামুটি ভালো সংগ্রহ ছিল। উইকেটে পেসাররা অনেক সহায়তা পেয়েছে। অনেক মুভমেন্ট ছিল, ক্রিস ওকস খুব ভালো বোলিং করেছে। যদিও খুব বেশি উইকেট নিতে পারেনি, তবে দুদিকেই মুভমেন্ট করিয়েছে। সে অনুপাতে আর্চার নতুন বলে তেমন ভালো করতে পারেনি। পরে ও দারুণ করেছে। কেন উইলিয়ামসন দ্রুত আউট হয়ে যাওয়ার পর আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম নিউজিল্যান্ড ২১০-২২০ করতে পারবে। কিন্তু ল্যাথাম ভালো ব্যাটিং করায় রানটা ২৪১ হয়েছে। এ রান করার পর অনেকের মতো আমিও ভেবেছিলাম ইংল্যান্ড সহজেই রানটা তাড়া করে ফেলবে। যেটা তারা করেছিল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। তবে উইকেট নিয়ে একটু ধন্ধে ছিলাম, যদি প্রথম ইনিংসের মতো মুভমেন্ট এবং পেসারদের জন্য সহায়তা থাকে, হয়তো নিউজিল্যান্ড কামব্যাক করবে। নিউজিল্যান্ড আসলেই খুব ভালো বোলিং করেছে। সঙ্গে ছিল অসাধারণ ফিল্ডিং। যারা ১৫০-১৪০ গতিতে বল করেছে তারা তো ভালো করেছেই, যারা ১১০-১২০ গতিতে বল করেছে তারাও অসম্ভব সুইং করিয়েছে, অনেক কাট করিয়েছে, ইংল্যান্ড ব্যাটসম্যানদের জন্য অনেক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এ ম্যাচটা নিউজিল্যান্ডের হাতেই ছিল বলতে গেলে। কিন্তু জস বাটলারকে নিয়ে বেন স্টোকস ১১০ রানের জুটি গড়ে ম্যাচটা এগিয়ে নিয়ে যায়। বাটলার হাত খুলে খেলছিল। ও যতক্ষণ ছিল, ততক্ষণ মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ড সহজেই জিতে যাবে। কিন্তু ওর বিদায়ের পর আবার ইংল্যান্ড চাপে পড়ে যায়। তবে স্টোকস শুরুতে ধীরে খেললেও বাটলারের বিদায়ের পর সব দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নেয়। জীবনের সেরা খেলা খেলে ম্যাচটা টাই করায়। এই ম্যাচে আসলে দু’দলই জিততে পারত। আসলে তো জিতেছে দু’দলই। তারপরও সত্যিকারের সেরাদের হাতেই শিরোপা গিয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ ওর গত কয়েক বছর ধরেই র‌্যাংকিংয়ে সেরা ছিল এবং পুরো টুর্নামেন্টটাই তারা দাপটের সঙ্গে খেলেছে।

আসলে ভাগ্যও পুরোপুরি ইংল্যান্ডের পক্ষে ছিল। নইলে শেষ ওভারে কেন গাপটিলের থ্রোটা স্টোকসের ব্যাটে লেগে বাউন্ডারি হয়ে যাবে। ওই ঘটনায় ৬ রান পেয়েছিল ইংল্যান্ড এবং আমি মনে করি নিয়ম মেনেই ওই রানটা ইংল্যান্ড পেয়েছে। কারণ স্টোকস সেটা ইচ্ছে করে করেনি। থ্রোটা ব্যাটে লাগার পর কিন্তুও দৌড়ে রান নেওয়ার চেষ্টা করেনি। বরং এর জন্য যে ও দায়ী নয়, হাত তুলে সেটাই বোঝাতে চেয়েছে। এটা ইংল্যান্ডের গুডলাক আর নিউজিল্যান্ডের ব্যাডলাক ছাড়া কিছুই নয়। ক্রিকেটে ভাগ্য যে একটা বড় নিয়ামক, সেটা আরেকবার প্রমাণিত হলো। তাছাড়া আম্পায়ারদের দুয়েকটা সিদ্ধান্তও নিউজিল্যান্ডের পক্ষে ছিল না।

আমার দেখা এটাই বিশ্বকাপের সেরা ফাইনাল। এর ধারেকাছে কোনো ফাইনাল হয়নি। এর আগে আমি ১৯৯২ সালের ফাইনালকেই সেরা বলতাম। ওই ফাইনালে পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওয়াসিম আকরাম পরপর দুটি উইকেট নেওয়ায় ম্যাচের চেহারা পাল্টে গিয়েছিল। আমার মনে হয় এটাই ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ। রোমাঞ্চ, অনিশ্চয়তা ছিল পরতে পরতে। বড় দলগুলো ছোট দলগুলোর বিপক্ষে সহজে জয় পায়নি। সেমিফাইনালিস্ট কারা জানতে অপেক্ষা করতে হয়েছে লিগের প্রায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নিশ্চিত হতেও অপেক্ষা করতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। এই বিশ্বকাপটা আমার কাছে সেরা মনে হয় এর ফরম্যাটের কারণে। সব দল সবার সঙ্গে খেলার সুযোগ পাওয়া কেবল সেরা দলগুলোই সেমিফাইনালে খেলতে পেরেছে। আমি বরাবরই সেরা চারে নিউজিল্যান্ডকে রেখেছিলাম। কিন্তু তারা যে ফাইনাল খেলবে এবং শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালাতে পারবে ভাবিনি। আসলে তাদের অধিনায়কের কারণেই দলটা এই পর্যন্ত আসতে পেরেছে। উইলিয়ামসন বলতে গেলে একাই পুরো আসর দলটাকে টেনে এনেছে। এমন একটি দল, যে দলের ব্যাটিংটা পুরোপুরি অধিনায়কের ওপর নির্ভর, তাদের নিয়ে শিরোপার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করার জন্য আমি উইলিয়ামসনকে ধন্যবাদ জানাব। তবে সত্যি বললে টুর্নামেন্টসেরা হিসেবে আমিও সাকিবকেই দেখতে চেয়েছিলাম। পরিসংখ্যান বিবেচনায় ওই সেরা। এরপরই রোহিত শর্মা। কিন্তু উইলিয়ামসনের মতো সাকিব কিন্তু দলকে সেমিফাইনাল অথবা ফাইনালে নিয়ে আসতে পারেনি। তাই হয়তো তাকে বিবেচনা করা হয়নি। আমি মনে করি উইলিয়ামসন টুর্নামেন্টসেরা পুরস্কারটা যোগ্য হিসেবেই পেয়েছে। ওর অবদানটা বেশি দেখা গেছে বলেই সবাই ওর অধিনায়কত্বের প্রশংসা করছে। তবে আমি এর পাশাপাশি মরগানেরও প্রশংসা করব ইংল্যান্ডকে অসাধারণ নেতৃত্ব দেওয়ায়। ও হয়তো ব্যাট হাতে সেভাবে অবদান রাখতে পারেনি। শর্ট বলে ওর দুর্বলতাটা অন্য দলগুলো ভালো বুঝে ফেলে ওকে রান করতে দেয়নি, তবে ইংল্যান্ড দলের প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে ওর বোঝাপড়াটা দলটিকে বিশ্বকাপ জিততে বড় ভূমিকা রেখেছে। ইংল্যান্ডকে অভিনন্দন জানাই প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ায়। তবে একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের দুর্ভাগ্য, না হেরেও হারকে মেনে নিতে হচ্ছে।