নিজ বাসভবন রংপুরের পল্লী নিবাসের লিচুতলায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। এ সময় পার্টির নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে রংপুর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে চতুর্থ ও শেষ জানাজা শেষে সেখান থেকে চার কিলোমিটার হেঁটে জাপা চেয়ারম্যানের মরদেহ বহনকারী গাড়ি পল্লী নিবাসে নিয়ে যান দলের নেতাকর্মীরা।
দাফনের আগে এরশাদপুত্র সাদ তার বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চান। এরপর দাফনকার্য পরিচালনা করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, এরশাদের ছোট ভাই ও জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের, জাপা মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা, সাবেক মহাসচিব রুহুল
আমিন হাওলাদার, রংপুর সিটি মেয়র ও জাপার প্রেসিডিয়াম মেম্বার মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাসহ আওয়ামী লীগ, জাপা, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। দাফন শেষে ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. নজরুল ইসলাম ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
এর আগে দুপুর ১২টার কিছুক্ষণ পর এরশাদের মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টার ঢাকা থেকে রংপুর পৌঁছায়। তখন পর্যন্তরাজধানীর বনানীর সামরিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার সিদ্ধান্ত ছিল। তবে সাবেক এ সামরিক শাসকের মৃত্যুর পর থেকে তাকে পৈত্রিক নিবাস রংপুরে দাফনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। গত সোমবার রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জাপার প্রেসিডিয়াম মেম্বার মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এরশাদের কবর যাতে পল্লী নিবাসে হয় সেজন্য রংপুরবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। গায়ের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও এরশাদকে রংপুরে সমাহিত করার ঘোষণা দেন তিনি। এ নিয়ে জাতীয় পার্টির মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জানাজা উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয় রংপুর নগরজুড়ে।
দুপুর ২টার পর রংপুর শহরের কালেক্টরেট ঈদগাহ ময়দানে চতুর্থ ও শেষ জানাজার জন্য এরশাদের মরদেহ আনা হয়। সেখানে লক্ষাধিক মানুষ জানাজায় শরিক হন। জানাজার মধ্যেই রংপুরে এরশাদের দাফনের দাবিতে হট্টগোল শুরু হয়। জানাজার আগে বক্তৃতায় মেয়র মোস্তাফিজার রংপুরে এরশাদের দাফনের দাবি আবারও তোলেন। এরপর জি এম কাদের বক্তব্য শুরু করেন। কিন্তু তার বক্তব্যের মাঝেই দাফনের বিষয়টি উল্লেখ করে সেøাগান শুরু হয়। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে এরশাদের জানাজা শুরু হয়। জানাজার পর শত শত কর্মী এরশাদের মরদেহ বহনকারী গাড়িটি ঘিরে ধরেন। তারা রংপুরে কবর দেওয়ার দাবি জানান। জানাজার পরপরই মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সে উঠে বসেন মেয়র মোস্তাফিজার। ময়দানে মাইক থেকে তার প্রতি আহ্বান জানানো হয়, মরদেহ যেন রংপুর থেকে ঢাকায় না যায়। এ পরিস্থিতিতে বেলা ৩টার দিকে এরশাদের মরদেহ শহরে তার বাড়ি পল্লী নিবাসে নেওয়া হয়। এরপর সেখানেই দাফন করার ঘোষণা দেন জি এম কাদের। তিনি বলেন, এরশাদকে রংপুরে দাফন করার ব্যাপারে ঢাকায় যারা আছেন, তাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারা সম্মতি দিয়েছেন বলে আমি এ সিদ্ধান্তের কথা জানালাম।
এর আগে গতকাল জাপার পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রংপুরে এরশাদের দাফনের ব্যাপারে স্ত্রী ও জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান এবং সংসদের বিরোধী দলের উপনেতা রওশন এরশাদের সম্মতি রয়েছে বলে জানানো হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে এরশাদের প্রতি রংপুরের গণমানুষের আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতাবোধকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এরশাদকে রংপুরেই দাফন করতে অনুমতি দেন রওশন এরশাদ। এরশাদের কবরের পাশে তার জন্য কবরের জায়গা রাখতেও অনুরোধ জানান তিনি। রওশন বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি রংপুরের গণমানুষের ভালোবাসা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাদের আবেগ ও অনুরাগেই রংপুরে এরশাদকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন বলেন, স্যারের মরদেহ (এরশাদ) রংপুরে তার ইচ্ছা অনুযায়ী দাফন করা হয়েছে। আমরা স্যারের ইচ্ছাপূরণ করতে বদ্ধপরিকর ছিলাম। এখানে দাফন হওয়ায় সাধারণ মানুষসহ দলীয় লোকজন স্বাচ্ছন্দ্যে স্যারের কবর জিয়ারত করতে পারবেন। এটা আমাদের পরম পাওয়া।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, মৃত্যুর আগে পল্লী নিবাস সংস্কার করে তিনতলা নতুন ভবন গড়ার উদ্যোগ নেন এরশাদ। পুরনো ভবন ভেঙে তিনতলা কমপ্লেক্স করা হচ্ছে। রংপুরে এলে এই পল্লী নিবাসেই থাকতেন তিনি। এবার এলে সেখানেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
আজ বুধবার বাদ আসর রাজধানীর গুলশানের আজাদ মসজিদে এরশাদের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে।
গত রবিবার ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু হয়। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।
এরশাদের আসন শূন্য ঘোষণা : সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মারা যাওয়ায় তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করেছে সংসদ সচিবালয়। রংপুর-৩ আসন থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সাবেক এই সামরিক শাসক বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বে ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
সংসদ সচিবালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) আ ই ম গোলাম কিবরিয়া গতকাল মঙ্গলবার আসনটি শূন্য হওয়ার গেজেট প্রকাশ করেন। গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ৩০ আষাঢ় ১৪২৬/১৪ জুলাই ২০১৯ তারিখ পূর্বাহ্ণে মৃত্যুবরণ করায় একাদশ জাতীয় সংসদের ২১ রংপুর-৩ আসনটি উক্ত তারিখে শূন্য হয়েছে।’
সংবিধানের ১২৩(৪) দফায় বলা হয়েছে, ‘সংসদ ভাঙিয়া যাওয়া ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদের কোনো সদস্যপদ শূন্য হইলে পদটি শূন্য হইবার নব্বই দিনের মধ্যে উক্ত শূন্যপদ পূর্ণ করিবার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (তবে শর্ত থাকে যে, যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতে, কোনো দৈব-দুর্বিপাকের কারণে এই দফার নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয়, তাহা হইলে উক্ত মেয়াদের শেষ দিনের পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে)।’
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আসন শূন্য হওয়ার দিন থেকেই নব্বই দিন গণনা করা হয়। এক্ষেত্রে আগামী ১১ অক্টোবরের মধ্যে ওই আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদের তালিকায় শূন্য এরশাদের আসনের বিষয়ে ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব ফরহাদ আহাম্মদ খান বলেন, সংসদ সচিবালয় গেজেট প্রকাশের পর আমরা উপনির্বাচনের জন্য বিষয়টি কমিশনের কাছে উত্থাপন করি। কমিশনই সিদ্ধান্ত নেন কখন ভোট হবে। বিষয়টি শিগগির কমিশনে তোলা হবে।