চলনবিল অধ্যুষিত নাটোর জেলা সারাদেশের মধ্যে অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী জেলা। বর্তমানে এই ইতিহাস অনেকটা বিলীন হতে চলেছে। শস্য ভাণ্ডার বলে খ্যাত চলনবিলসহ সারা জেলায় কৃষি আবাদযোগ্য জমি কেটে পুকুর কাটার হিড়িক পড়েছে।
এমনকি পুকুর কাটার উপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা আমলে নিচ্ছে না কৃষকরা। প্রশাসন বিভিন্নভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা মানছে না। এমনকি জনপ্রতিনিধিদের কড়াকড়ি নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে কৃষি আবাদযোগ্য জমিতে অনায়াসে কাটা হচ্ছে একের পর এক পুকুর।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৫ বছরে নাটোরে আবাদযোগ্য কৃষি জমি কমেছে চার হাজার একশ’ ৭০ হেক্টর।
২০১৫ সালে নাটোর জেলায় কৃষি আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৫০ হাজার ৮৩৮ হেক্টর। বর্তমানে ২০১৯ সালে এক লাখ ৪৬ হাজার ৬৬৮ হেক্টর জমিতে কৃষি আবাদ হচ্ছে।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সুব্রত কুমার সরকার বলেন, “বিগত ৫ বছরে কৃষি আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। হ্রাসকৃত বেশির ভাগ জমিতে পুকুর খনন হলেও নতুন রাস্তা-ঘাট, নতুন বসতি, শিল্প কারখানা তৈরি, ইটভাটার সম্প্রসারণসহ বিবিধ কারণে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বিগত তিন বছরে সরকারি অনুমতিক্রমে পুকুর খনন করেছে সাত হাজার ৩৯৫টি।
২০১৬ সালে পুকুরের সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৯২৪টি। বর্তমানে সমগ্র নাটোর জেলায় পুকুরের সংখ্যা ২৬ হাজার ৩১৯টি। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে অনুমতিক্রমে প্রায় সাড়ে সাত হাজার পুকুর খনন করা হলেও বাস্তবের চিত্র আরও ভয়াবহ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাগজ-কলমের হিসেবের চেয়ে দ্বিগুণ জমিতে পুকুর খনন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতি সম্প্রতি ধানের বাজার একেবারে দাম কম হওয়ায় ধানের আবাদ কমে গেছে। এক মণ ধান আবাদ করে ঘরে তুলতে খরচ হয় সাতশ’ টাকা। অথচ একমণ ধান বিক্রি হচ্ছে ছয়শ’ টাকায়।
ধান কাটার সময় কাজের লোকের অভাব, সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক দে র্যোগ রয়েছেই। ধানের বিকল্প হিসেবে কৃষিজাত ফসল, গম, মশুর, মুগ, আখ, রসুন, ভুট্টা আবাদ করতে শুরু করে প্রান্তিক কৃষকরা। কিন্তু ওই ফসলগুলোর উৎপাদন খরচ অনুপাতে বিক্রিমূল্য কম হওয়ায় ওই ফসলগুলোও আবাদ করার ব্যাপারে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তারা।
গুরুদাসপুর উপজেলার কৃষক মো. আব্দুল মজিদ বলেন, আমার সাত বিঘা জমিতে বিগত দুই বছরে ধান আবাদ করে লোকসান হয়েছে। বিকল্প হিসেবে পুকুর কাটার চেষ্টা করি। কিন্তু অনুমতি নিতে অনেক ঝামেলা হওয়ায় নিয়মবর্হিভূতভাবে পুকুর খনন করেছি।
বাগাতিপাড়া উপজেলার কৃষক ফজলে রাব্বি বলেন, শুনেছি পুকুর কাটার বিষয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু ধান আবাদ করে লোকসান হওয়ায় নিরুপায় হয়ে রাতের অন্ধকারে সবাইকে ম্যানেজ করে পুকুর কেটেছি। বর্তমানে আমি সফলতার সাথে সংসার চালাচ্ছি।
সরকারি নির্ধারিত মূল্য না পাওয়ায় ধানের প্রান্তিক কৃষকরা অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে। তুলনামূলক কম আবাদি কৃষকেরা সরকারি গোডাউনে গিয়ে ধান বিক্রি করতে আগ্রহ কম আর যাদের বেশি ধান হয় তারা সরকারি গুদামের সিন্ডিকেটের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
বাস্তবিক প্রেক্ষিত খাতা-কলমে কৃষি আবাদযোগ্য জমি কেটে পুকুরের সংখ্যা যাই থাকুক না কেন বাস্তবে তা রয়েছে দ্বিগুণ।
স্থানীয় কৃষকরা মনে করেন, ধান বিক্রির সরকারি মূল্য পেতে সহজীকরণ এবং ধান আবাদে বেশি প্রণোদনা না দিলে আগামীতে আরও ধান আবাদযোগ্য কৃষি জমি কমতে থাকবে।