মাশরাফীর মাপা হাসি চাপা কান্না

প্রশ্ন : কিছুদিন আগে বলেছিলেন ক্যারিয়ারটা ২০ বছর পুরো করে শেষ করার ইচ্ছে আপনার। কিন্তু এখন প্রতি মুহূর্তে আমাদের কাছ থেকেও অবসরের প্রশ্নের কথা আসছে। এটা আপনার কাছে কতটা উচিত বলে মনে হয় এবং তা আপনাকে কতটা কষ্ট দেয়?

মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা : সত্যি বলতে আমি বিব্রতও হইনি। আর এটা নিয়ে হতাশও না। কারণ প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কাজটাই করবে এটাই স্বাভাবিক। আমার সবকিছু বিবেচনা আপনারা করবেন। আপনাদের দিক থেকে সবকিছু কনসিডার করবেন। তাই আপনাদের কাছ থেকে প্রশ্ন আসছে। মহেন্দ্র সিং ধোনির কথাই বলি। তার ধারেকাছেরও প্লেয়ার নই আমি। তার

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ১০ হাজার রান। প্রতিটি প্রেস কনফারেন্সেই তাকে এই প্রশ্ন করা হয়। আমার কাছে মনে হয় এটাকে প্রফেশনালি দেখা উচিত। আমি এভাবেই দেখি। আমার জায়গাটা সবসময় ক্লিয়ার। একজন খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে আমি নিজের সেরাটা পারফর্ম করতে পারিনি। ক্যাপ্টেন হিসেবেও সেরাটা দিতে পারিনি। সবার প্রত্যাশা ছিল দল সেমিফাইনালে যাবে। আমরা সেখানেও ব্যর্থ। প্রশ্নগুলো আসতেই পারে। আমি এভাবেই দেখছি আসলে। এর বেশি ভাবার সুযোগও নেই।

কিন্তু এটা তো স্রেফ আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া জবাব। এভাবেই বলার চল। দেশের সেরা অধিনায়কের চোখে-মুখের বিষণœতার সঙ্গে এই জবাব যায় না। তা বুঝতে পারেন সবাই। কিন্তু বুকটা চিরে তো আর প্রকাশ্যে রক্তক্ষরণ দেখাতে পারেন না।

বিদেশে শেষটা যে হাসিমুখে করবেন তারও তো উপায় নেই। প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন শ্রীলঙ্কা সফর দিয়ে বিদেশের মাটিতে দেশের জার্সিতে শেষ করার। কিন্তু গতকাল তার ইনজুরির খবর এলো আকাশ ভেঙে পড়ার মতো করে। সন্ধ্যায় অনুশীলন চলাকালীন হ্যামস্ট্রিং চোটে পড়েন মাশরাফী। বিশ্বকাপেও এই চোট নিয়ে খেলেছিলেন।

এই ইনজুরির কারণেই বিশ্বকাপে নিজের সেরাটা দিতে পারেননি। বাজে পারফরম্যান্সের কারণে দেশের ওয়ানডে দলকে গত ৪ বছরে বদলে দেওয়া মানুষটাকে আজ যখন-তখন প্রশ্নবাণে রক্তাক্ত করতে ছাড়েন না কেউ কেউ।

শ্রীলঙ্কায় ৩ ম্যাচের সিরিজ নিয়ে অধিনায়ক ও অন্তর্বর্তীকালীন কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের সংবাদ সম্মেলন হয় মাশরাফীর ইনজুরি সংবাদ পাওয়ার আগে। সেখানে একাধিকবার কেবল অবসরের প্রসঙ্গে জবাব দিতে হয় ম্যাশকে। যে জবাবগুলো আগেও দিয়েছেন। আবার দিতে হয়। শেষ বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছেন। এবার প্রশ্ন ছিল, শ্রীলঙ্কা সফর শেষেই কি অবসর নাকি?

ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হয়ে অভিজ্ঞ মানুষটা বলে যান, যে (এটা) যে রকম ভাবে নেবে। আমারটা আমি এখনো ওভাবে বলতে পারছি না। কারণ চিন্তা করিনি এখনো কিছু। খেলতে যাচ্ছি, ওখানে খেলারই চিন্তা করছি। আর এরপর অনেক দিন খেলাও নেই, এটাও একটা ব্যাপার। সে রকম কিছু হলে আসার পর চিন্তা করব। এরপর যে কথাটা আসে খুব নরম কণ্ঠে তার মধ্যে কষ্টের প্রকাশ। হয়তোবা আপনাদের কাছে এটা একটা নিউজ, আমার কাছে হয়তোবা এটা না, আমার কাছে অনেক কিছুই। আমার কাছে এই খেলাটা ছাড়া অনেক কিছুর একটা ব্যাপার। সুতরাং অবশ্যই আমাকে একটু সময় নিয়ে চিন্তা করতে হবে। শ্রীলঙ্কা লাস্ট ট্যুর এটা বলতে পারি। যেহেতু আর খেলা নেই। শ্রীলঙ্কা অবশ্যই শেষবারের মতো যাচ্ছি, বিশ্বকাপের মতোই বলছি। আসার পরে হয়তো একটু সময় পাব, সময় নিয়ে চিন্তা করে...যেটা বললাম আপনাদের কাছে হয়তোবা একটু লেখালেখি করলেই শেষ, আমার কাছে হয়তোবা তা না। তো দেখা যাক। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মাটিতে খেলার ইচ্ছাটা তার পূরণ হলো কই!

এটাকে পাল্টা আক্রমণ হিসেবে কেউ নিতে চাইলে নিতে পারেন। কিন্তু দুই পায়ে ৭টা মেজর অপারেশন নিয়ে যে যোদ্ধা কখনো হাল ছাড়েননি তার কণ্ঠে আবার নতুন করে ফেরার প্রবল প্রত্যয়ী উচ্চারণ ছিল, আগেও আমি অনেকবার ফিরে এসেছি। অনেক কঠিন পরিস্থিতি থেকে। আমার বিশ্বাস, আবার আমি ফিরে আসব।

দুই পায়ে তখনো চোট ছিল। শর্ট রানআপে বল করছিলেন ফ্লাডলাইটের আলোয়। কিছুক্ষণ পরই বাম হ্যামস্ট্রিংয়ে ব্যথা পেলেন। চিকিৎসা চলল। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হলো না। ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। গুরুতর চোট, লম্বা সময়ের জন্য মাঠের বাইরে চলে গেলেন মাশরাফী। তাই যেভাবে আবার ফেরার কথা ৩৫ বছরের মাশরাফী নিপুণ আত্মবিশ্বাসে বলে যাচ্ছিলেন সেটা অধরাই থাকল।

বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য পারফর্ম করা সাকিব আল হাসান ছুটিতে। তার অভাব অনেক বোধ হবে জানিয়ে মাশরাফী অবশ্য লঙ্কায় হাড্ডাহাড্ডি এক লড়াইয়ের প্রত্যাশাই করছিলেন, আমার কাছে মনে হয় দুই দলই সমান থাকবে। কারণ, যেহেতু তারা হোমে খেলছে। হোমে তারা সব সময় ভালো খেলে। একই সঙ্গে তাদের যে টিমটা আছে, তারা একসঙ্গে অনেক দিন ধরে খেলছে। তাদের জায়গা থেকে তারা ভারসাম্যপূর্ণ। আর ওদেরও বিশ্বকাপে ভালো কিছু স্মৃতি আছে, ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে, কিছু ম্যাচ ওরা খুব ভালো খেলেছে। আর নিদাহাস ট্রফির পর থেকে একটা উত্তেজনা সব সময় কাজ করে অন ফিল্ড। এটাও কাউন্ট হয় অনেক সময়। সবকিছু মিলে আমার মনে হয়, কারও জন্যই সহজ হবে না। ২৬, ২৮ ও ৩১ জুলাই কলম্বোতে তিন ম্যাচের সিরিজ।