ডিজিটালে ঝুঁকছে বিজ্ঞাপন জগৎও

বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম এখনো টেলিভিশন। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞাপনের বাজারে টেলিভিশনের আধিপত্য বজায় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউটিউব এবং ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের নতুন বাজার তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানি এবং ব্র্যান্ডগুলো অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের প্রচার এবং প্রসারের জন্য ডিজিটাল মাধ্যমকেই বেছে নিচ্ছে। বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শ্রিয়া সর্বজয়া বলছেন, ‘বাংলাদেশে ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের বাজার ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। গ্লোবালি আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এটা শিফট হচ্ছে। বাংলাদেশেও সেদিকে যাচ্ছে। সবাই পছন্দ করছে নিজেই নিজের মিডিয়াকে কন্ট্রোল করে ব্যবহার করতে।’

বিজ্ঞাপন নির্মাণে সিদ্ধহস্ত অমিতাভ রেজা। তিনি এখনকার বিজ্ঞাপন সেক্টরকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তার মতে, ‘আমাদের দেশের পুরো শোবিজ অঙ্গনটাই একটা ট্রানজিশন পিরিয়ড পার করছে। কী করতে হবে আর কী করা উচিত নয়, তা চিহ্নিত করতেই সময় লেগে যাচ্ছে। এটা অবশ্য যে কোনো দেশেই হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্দিষ্ট করে বিজ্ঞাপন সেক্টরের কথা বলতে গেলে এখন বেশ ভালো কাজ হচ্ছে। কিন্তু এত বেশি কাজ হচ্ছে যে ভালো কাজটি চোখে পড়ছে না। আমাদের উচিত যার যার জায়গা থেকে ভালো কাজ করা। তাহলে ভালোর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। তখন পণ্যের কোম্পানি, ভোক্তা, নির্মাতা, এজেন্সি, মডেল বা কলাকুশলী সবারই লাভ হবে।’ এখন টিভির আর ওয়েব প্ল্যাটফর্মের জন্য আলাদা আলাদা বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। এই বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না বিজ্ঞাপন জগতের ব্যস্ত নির্মাতা মাসুদ জাকারিয়া সাবিন। তিনি বলেন, ‘এখন পণ্যের মালিকরা বিজ্ঞাপনটি টিভিতে না ওয়েবে প্রচার করবেন এটা নিয়েই দ্বিধায় থাকেন। এজন্য আমরা যারা সৃষ্টিশীল পেশার সঙ্গে জড়িত তাদের শুরু থেকেই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ওয়েবের জন্য বিজ্ঞাপন করলে বাজেট একেবারেই কম। তখন হয়তো আমরা ঠিকমতো মডেলকেও প্রেজেন্ট করতে পারি না। মডেলের বদলে অ্যানিমেশন, স্থিরচিত্র বা কোনো প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে থাকি। এতে দর্শক বিরক্ত হন।’

তার সঙ্গে একমত নন জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন নির্মাতা আদনান আল রাজীব। তিনি বলেন, ‘অনেকে ভাবেন, ওয়েবে বিজ্ঞাপন করা মানেই কম বাজেট, না কিন্তু নয়। এটা পণ্যের মালিকদের নিজস্ব ভাবনা। কেউ অনেক বড় পরিসরে করতে চান, কেউ চান না। এটা টিভিতেও ছিল। আসল কথা হলোÑ একটি বিজ্ঞাপন কী ধরনের হবে, তা নির্ধারণ করা হয় মার্কেটিং পলিসির ওপর। তবে এটা ঠিক যে, টিভির জন্য বিজ্ঞাপন নির্মাণের ক্ষেত্রে একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট হয়ে গেছে, যেটা ওয়েবে এখনো হয়নি।’

বিজ্ঞাপন সেক্টরের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সাবিন বেশ হতাশ। তার ভাষ্য, ‘আমাদের দেশে এই জায়গা মোটেও ক্রিয়েটিভ নয়। এখানে কাজ জানা লোকের খুব অভাব। পুরো বিষয়টিই চলছে শখের ওপর। কারও পরিচালনা করার শখ, কারও মডেল হওয়ার শখ, তা মেটাতেই সবাই কাজ করছে। এতে করে বিজ্ঞাপনের মান অনেক নেমে গেছে। অথচ মুম্বাইতে একজন প্রোডাকশন বয়ও তার কাজটা শিখে করে।’

অনেকেই বলেন, আমাদের দেশে আগের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন নির্মাণ হয় না। ডাবিং করেই বিদেশি বিজ্ঞাপন প্রচার হরা হচ্ছে। এ বিষয়ে নির্মাতা আদনান আল রাজীব বলেন, ‘আগেও ডাবিংকৃত বিজ্ঞাপন চলত, এখনো চলে। একটি বিদেশি ব্র্যান্ড যদি ভাবে তাদের সেল কম হবে তাহলে তারা খরচ বাড়াতে চায় না। সেক্ষেত্রে তারা ডাবিং করে বিদেশি বিজ্ঞাপনটাই চালায়। আর লাক্স বা অন্যসব জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক পণ্যের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় না। এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন আমাদের দেশেই হয়। আমাদের আর্টিস্ট, পরিচালকের মেধা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, সবটাই ব্যবসার পলিসির ওপর নির্ভর করে।’