লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুমে পুঁজিবাজারে বড় দরপতনে চিন্তিত হয়ে পড়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। দরপতন ঠেকাতে ব্রোকার হাউজ ও বিনিয়োগকারীদের প্রায় সব দাবি মেটানোর পরও সূচকের বড় পতনকে অস্বাভাবিক
বলে মনে করছেন এসইসি কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে দরপতনে কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকা তদন্ত করতে কমিটি গঠন করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ঢাক স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচকটি সাত শতাংশের বেশি কমার পরই এ তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গতকাল রবিবার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রায় ৭৮ শতাংশ শেয়ারের পতনে প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ৯৬ পয়েন্ট। এতে সূচকটি নেমে এসেছে ৫০৩৩ পয়েন্টে, যা ৩১ মাসে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর এ সূচকটি ছিল ৫০২৭ পয়েন্টে। বাজেট অনুমোদনের পর ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে ১১ দিনই সূচকের পতন হয়েছে। এ সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স হারিয়েছে ৩৮৭ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট।
এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের দরপতনের কারণ অনুসন্ধানে এসইসির পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি কিছু শেয়ারের অস্বাভাবিক পতন ও স্টক এক্সচেঞ্জের কেনাবেচা কমে যাওয়ার বিষয়টি তদন্ত করবে। পাশাপাশি এতে স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকাও পর্যালোচনা করবে। আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে তদন্ত কমিটিকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সালের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও দরপতনের মধ্যে রয়েছে পুঁজিবাজার। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জানুয়ারি মাসে সাময়িক উল্লম্ফনের কারণে সূচকে তেমন প্রভাব না পড়লেও বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। চলতি বছর ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩১৭টি কোম্পানির মধ্যে ২২৬টি দর হারিয়েছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে ৯৫টি কোম্পানি। বিনিয়োগকারীরা বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে। বিশেষ করে যেসব বিনিয়োগকারী মার্জিন ঋণে শেয়ার কিনেছিলেন, তাদের অবস্থা আরও করুণ। টানা দরপতনে এসব বিনিয়োগকারী পড়েছেন ফোর্স সেলের (বাধ্যতামূলক বিক্রি) মুখে। অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পুঁজিবাজার ত্যাগ করেছেন।
বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোনাস লভ্যাংশ নিরুৎসাহিত করতে কর আরোপ করে সরকার। একই সঙ্গে দ্বৈতকর পরিহারসহ বিনিয়োগকারীদের করমুক্ত আয়ের সীমা দ্বিগুণ করা হয়। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি প্লেসমেন্ট শেয়ারে লক-ইনের (বিক্রয় বা হস্তান্তর নিষেধাজ্ঞা) মেয়াদ বাড়ানোসহ পাবলিক ইস্যু বিধিমালায় আমূল পরিবর্তন আনে। এর বাইরে মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য রি-ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট (বোনাস লভ্যাংশ) ঘোষণাও বাতিল করে এসইসি। এর আগে অতালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ বাদ দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হিসাবায়ন করার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হলেও পুঁজিবাজারে এর কোনো প্রভাবই পড়েনি।
সংসদ নির্বাচনের পর চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে টানা তিন মাসেরও বেশি সময় পুঁজিবাজারে দরপতন দেখা দেয়। যদিও বাজেট প্রণোদনার আশায় পুঁজিবাজার স্বাভাবিক থাকলেও চলতি মাসের শুরু থেকে আবারও পুরনো ধারায় ফিরেছে বাজার পরিস্থিতি। ডিএসইতে গতকাল লেনদেন হওয়া ৩৫২টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ২৭৩টির দর কমেছে। এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। ডিএসই এক দিনে বাজার মূলধন হারিয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মুদ্রাবাজারের তারল্য সংকট পুঁজিবাজারে পড়ছে। সুদের হার এক অঙ্কে নেমে না আসায় বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকে স্থায়ী আমানত রাখছেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়ায় ও স্থানীয়ভাবে টাকার অবমূল্যায়ন না হওয়ায় বিদেশিরাও পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এছাড়া গ্রামীণফোনের সঙ্গে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার টানাপড়েন পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলছে বলে জানান তারা। সম্প্রতি আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের অবসায়নের প্রক্রিয়াও পতনে প্রভাব ফেলেছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল সব খাতই দর হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে সিরামিক খাতের দর। এ খাতটির সব কোম্পানির দরপতনে সিরামিকের বাজার মূলধন কমেছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সিমেন্ট, প্রকৌশল, পাট, কাগজ, বস্ত্র, নির্মাণ ও সেবা খাত হারিয়েছে ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাজার মূলধন। সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাংক ও টেলিযোগাযোগ খাত যথাক্রমে ১ দশমিক ৪ ও ২ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে। এছাড়া ফার্মাসিউটিক্যালস, জ্বালানি, খাদ্য, এনবিএফআই, বিবিধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাজার মূলধন হারিয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা চলতি বছর সবচেয়ে বেশি লোকসানে রয়েছেন কাগজ ও প্রকাশনা খাতে। এ বছর এ খাতটিতে তাদের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশেরও বেশি। পাট খাতের কোম্পানিগুলোতে তাদের গড় লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এছাড়া সিমেন্টে ১৯ দশমিক ৭, সিরামিকে ১৯ দশমিক ৫, বস্ত্রে ১৫ দশমিক ৬, তথ্যপ্রযুক্তিতে ১৫, এনবিএফআই ১৪, সেবা ও নির্মাণ খাতে গড়ে ১৩ শতাংশ লোকসান রয়েছে। এর বাইরে টেলিযোগাযোগ, ট্যানারি ও প্রকৌশল খাতেও উল্লেখযোগ্য লোকসান রয়েছে। বিপরীতে বীমা, খাদ্য ও মিউচুয়াল ফান্ডে কিছুটা লাভে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।