শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট গর্বের সঙ্গে বৃহস্পতিবার সাতসকালেই জানিয়ে দিল কথাটা। বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা প্রথম ওয়ানডের টিকিট ‘সোল্ড আউট’। কিন্তু কখনো প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের হারাতে না পারা বাংলাদেশ লাসিথ মালিঙ্গার বিদায়ী ওয়ানডেটাকে নিজেদের করে নিতে পারবে? শেষ সফরটা বলছে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলে বাংলাদেশ আজ কলম্বোতে তা পারবে।
দু’দলের জন্যই বিশ্বকাপের পোড়াক্ষতে মলম লাগানোর সিরিজ এটি। কিন্তু গেল চার বছরে ওয়ানডেতে দারুণ উন্নতি করা বাংলাদেশের চেয়ে কিন্তু লঙ্কানরা পিছিয়ে। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ৭, শ্রীলঙ্কা ৮। ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তামিম ইকবালের দলের সামনে সুযোগ এক ধাক্কায় এই প্রতিপক্ষকে ৯ নম্বরে ঠেলে দিয়ে ৬-এ থাকা পাকিস্তানের সঙ্গে রেটিং পয়েন্টের ব্যবধান টেকারদের নির্ঘাত স্পর্শ করে থাকবে। ২-১-এ সিরিজ জিতলে পয়েন্ট ৯০ থাকবে। আবার শ্রীলঙ্কা ২-১-এ জিতলে বাংলাদেশের হয়ে যাবে ৮৮, লঙ্কানদের ৮০। কিন্তু লঙ্কানরা যদি ৩-০-তে জিতে যায়? তখন বাংলাদেশের ৮৬, শ্রীলঙ্কার ৮২। বিপদ আছে।
কিন্তু শুরুতে যে ইতিহাসের কথা বলা হলো সেদিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিন। এবার ছুটি নিয়ে সাকিব আল হাসান দলের বাইরে। নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা চোটের কারণে শেষ মুহূর্তে আসতে পারলেন না। ২০১৭-এর সফরের প্রথম ম্যাচে তামিম ইকবালের দুর্ধর্ষ ১২৭ বাংলাদেশকে ১-০-তে লিড দিয়েছিল। পরের ম্যাচ বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত। শেষ খেলাটা জিতে সিরিজ হার থেকে রক্ষা মেলে লঙ্কানদের। একটুর জন্য আক্ষেপ বাংলাদেশের।
২০১৯ বিশ্বকাপেও বৃষ্টির কারণে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরিত্যক্ত ম্যাচটা নিয়ে বাংলাদেশের দুঃখ আছে। হারানোর আত্মবিশ্বাস ছিল। ২টি পয়েন্টের জায়গায় শেষে মিলল ১। ম্যাচটা হলে গতিপথ বদলাতেও পারত। তাছাড়া এই দুই দল ২০১৮-এর শেষে দুবাইয়ে শেষ মুখোমুখি হয়েছিল। সেই ম্যাচে মুশফিকুর রহিম ১৪৪ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেছিলেন। লঙ্কানদের জুটেছিল ১৩৭ রানের বিরাট হারের লজ্জা। সব মিলে বাংলাদেশ এগিয়ে না?
সব মিলে অবশ্য শ্রীলঙ্কায় ১৯ ম্যাচের মোটে দুটি জেতার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের। আর মোট লড়াইয়ে ৪৫-এ মোটে সাত জয় বাংলাদেশের। কিন্তু এ সময়ের বিচারে মালিঙ্গাকে ‘পারফেক্ট বিদায়ী ম্যাচ’ উপহার দেওয়ার লঙ্কান পরিকল্পনা পণ্ড করার মতো দলই বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিকে এর আগে একটা টেস্টে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে তামিমের। ২০১৭ সালে। মুশফিকের ইনজুরির কারণে। কিন্তু এবারই প্রথম পুরো সিরিজের অধিনায়ক, মানে বাংলাদেশের ১৪তম ওয়ানডে অধিনায়ক। এবং সুযোগ শ্রীলঙ্কার মাটিতে প্রথম সিরিজ জয়ের রেকর্ড গড়ার, নেতা হিসেবে।
কিন্তু নেতৃত্বের ব্যাপারটি খুব রোমাঞ্চিত করছে না তামিমকে। তার চাই ফল। সেই কারণেই বুঝি নিজের প্রসঙ্গটাকে দূরে ঠেলে দলকে টানেন গতকাল কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে। “সত্যি বলতে এভাবে ভাবছি না যে অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক হচ্ছে। আপনারা বলছেন। শুনতে ভালো লাগছে।”
তামিম বলছিলেন, “দলের অন্য ১০ খেলোয়াড় পারফর্ম করলে তখনই কেবল কাউকে ক্যাপ্টেন হিসেবে বিচার করতে পারেন। অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক হচ্ছে বলে আমি রোমাঞ্চিত না। যারা খেলছে তাদের কাজে আসতে সেরাটাই করব। এটা যদিও স্বল্প সময়ের জন্য তবু আমি আমার দায়িত্ব পালনের সেরা চেষ্টা চালাব।”
ওদিকে, এ ম্যাচের সব আকর্ষণ বুঝি ভিন্ন অ্যাকশনের ফাস্ট বোলিং চরিত্র মালিঙ্গা কেড়ে নিয়েছেন। ২০১০-এ টেস্ট ছেড়েছেন। টি-টোয়েন্টি খেলতে চান। কিন্তু ওয়ানডে এরপর আর না। ১৫ বছরের ৫০ ওভারের ক্যারিয়ারে এই পেসার ২২৫ ম্যাচে ৩৩৫ উইকেট নিয়ে লঙ্কান ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির তালিকার তিন নম্বরে থেকে বিদায় নিচ্ছেন।
এমন আবেগঘন মুহূর্তকে আরও স্মরণীয় করে রাখতে গতকাল প্র্যাকটিস সেশনের পর লঙ্কান অধিনায়ক দিমুথ করুনারত্নের প্রত্যয়ী উচ্চারণ- “আমাদের মনের সবটা জুড়ে এই ম্যাচ জয়। এটাই সেই সেরা জিনিস যা তাকে আমরা দিতে পারি... এই প্রথম ওয়ানডেতে তাকে আমরা সেরা বিদায় জানাতে চাই।”
ওদিকে মালিঙ্গা দুদিন আগে স্ত্রীর ফেইসবুকে জানিয়েছিলেন, অনেক অবিচারের শিকার হলেও কারও প্রতি তার কোনো বিদ্বেষ নেই। যদিও দুই বছর অন্যায়ভাবে তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। আর গতকাল কলম্বোর সংবাদ সম্মেলনে হাসিমুখেই বললেন, “এভাবে বিদায় নিতে পারছি বলে আমি খুব খুশি। এটা নতুন খেলোয়াড়দের নিজেদের প্রমাণের এবং পরের বিশ্বকাপের জন্য তৈরি হওয়ার সুযোগ।”
প্রেমাদাসা আজ ৪০ হাজার কণ্ঠে মালিঙ্গা-মালিঙ্গা উচ্চারণে থরথর কাঁপবে নিশ্চিত। বাংলাদেশকে তাই জিততে প্রখর বিরুদ্ধ স্রোতে সাঁতরাতে হবে। কিন্তু আবহাওয়াবিদের আবার অন্য কোনো ভাবনা আছে কি না কে জানে। পূর্বাভাস বলছে, বৃষ্টির শঙ্কা। সারাদিনও নাকি কাঁদতে পারে আকাশ। ক্রিকেটপ্রেমীদের তাই একটা সত্যিকারের ম্যাচ দেখার জন্য আলাদা করে প্রার্থনায়ও বসতে হচ্ছে।