গুজবের পরিণতি কত প্রাণঘাতী ও নির্মম হতে পারে, তা গত কিছুদিনে আমরা আবারও প্রত্যক্ষ করলাম। ফলে গুজবের প্রকৃতি, গুজবের প্রেক্ষাপট এবং গুজবের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়ার যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি প্রয়োজন আছে গুজবে আক্রান্ত মানুষগুলোর মনস্তত্ত্ব ও সক্রিয়তার ধরনকেও উপলব্ধি করা, বোঝার চেষ্টা করা কীসের সঙ্গে কীসের সংযোগ ঘটলে গুজব মানুষকে আলোড়িত করছে। সর্বদা গুজবকে শুধু শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না, শাস্তি দিয়ে স্থায়ী দমনও সম্ভব হয় না। বরং শুধু শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করাকে একমাত্র রণকৌশল হিসেবে গ্রহণ করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে, যদি তা জনগোষ্ঠীর অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে তোলে। প্রায় সর্বদাই গুজবের কোনো না কোনো সামাজিক প্রেক্ষাপট থাকে। উপমহাদেশ জুড়ে ‘ছেলেধরা’ আতঙ্ক হলো তেমনি একটা প্রপঞ্চ। যেমন গত বছরই বিবিসির একটা খবরে দেখেছিলাম, দেড় মাসের ব্যবধানে ভারতে ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে অন্তত ১৯ জনকে হত্যা করা হয়েছিল, প্রকৃত সংখ্যা এরচেয়ে কিছু বেশি হওয়ারই সম্ভাবনা। সেই সংবাদের সঙ্গে প্রকাশিত বিশেষজ্ঞ মতামত হিসেবে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শমিত কর বলছিলেন, ‘কোনো কারণে ভয়ভীতির আবহাওয়াতে যদি মানুষের মনে হয় যে প্রশাসন বা পুলিশের কাছে গেলে সহায়তা পাব না, তখনই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায় তারা। সেটা যতই আমাদের অযৌক্তিক মনে হোক, ওই ভীত মানুষদের কাছে সেটাই তখন যুক্তি হয়ে দাঁড়ায়।’
বাংলাদেশে এবারে ছেলেধরার এই গুজবের বিস্তৃতি ও ভয়াবহতা বোঝা যাবে দেশ রূপান্তরের এ-বিষয়ক সংবাদের সামান্য উদ্ধৃতি দিলেÑ “আমাদের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুতে ‘বাচ্চা ছেলেমেয়ের মাথা লাগবে’ এই গুজবে আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে গ্রামের স্কুলগুলোতে শিশুদের উপস্থিতি কমে গেছে। আবার ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির আতঙ্কও সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা বলেন, পথে-ঘাটে সব জায়গায় একই আলোচনা ছেলেধরা এবং গণপিটুনির আতঙ্ক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশিরভাগ স্কুলের সামনে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো গণপিটুনি বা ছেলেধরা সন্দেহে বাগ্বিতণ্ডা চলছে।” তবে বিলম্বিত হলেও কিছু প্রচারণামূলক পদক্ষেপ, পত্রপত্রিকা ও সামাজিক গণমাধ্যমে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে প্রচুর আলোচনা ও ঘৃণা এবং পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা এই গুজবের শক্তিতে কিছুটা ভাটা এনেছে।
২. ছেলেধরা সন্দেহে হত্যা বাংলাদেশে এর আগেও অজস্র হয়েছে। ভিখারিরা তার প্রধান শিকার। এছাড়া ভবঘুরে মানুষজন এভাবে নির্মম মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। এছাড়া প্রতিবন্ধীরা এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্রেফ অচেনা যেকেউ এমন সন্দেহের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। যেভাবেই হোক, ভারতবর্ষ জুড়েই এবং বাংলাদেশেরও জনমানসে এই কুসংস্কারটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছেÑ যেকোনো নতুন স্থাপনাকে কার্যকর করতে, নিরাপদ করতে, দীর্ঘস্থায়ী করতে শিশুদের বলি প্রয়োজন হয়। এমনকি আরও অন্ধবিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, ধনীরা তাদের লুকিয়ে রাখা সম্পদ পাহারা দেওয়ার জন্য শিশুকে তার সঙ্গে মাটিচাপা দিতেন, মৃত শিশুটি এই সম্পদ পাহারা দিত যক্ষ বা যখ হয়ে, সেই থেকে ‘যখের ধন’ প্রবাদটির উদ্ভব। রবীন্দ্রনাথেরও একটা মর্মান্তিক গল্প আছে এই নিয়েÑ নিরুদ্দিষ্ট বংশধরদের জন্য গুপ্তধন পাহারার দায়িত্ব দিতে দাদা ভুল করে আপন নাতিকেই যখ বানিয়েছেন। দীঘিতে জল ওঠাবার জন্য এমন কাহিনী মনে হয় প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আছে। সেতু কিংবা বড় স্থাপনাকে কেন্দ্র করে এই আতঙ্ককে আমরা বিগত দিনের বিষয় বলেই ভেবে এসেছি। এককালে এইসব বড় স্থাপনা গণিত আর প্রকৌশল বিদ্যার অনগ্রসরতার যুগে অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল ভাগ্যের ওপর, সে কারণেই এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে তুষ্ট করবার জন্য রক্তপান করানোর এমন চর্চাÑ প্রকৃতিকে হিংস্র রক্তপায়ী হিসেবে দেখার একটা শক্তিশালী উপধারা একদা সব দেশেই ছিল। প্রাণ উৎসর্গ করাটা তারই প্রতিষেধক। প্রকৃতির বদল ঘটানো হয়েছে, এবার তাই বিনিময়ে প্রকৃতিকে উৎসর্গ করে প্রাণদান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্য একটি নাটক মুক্তধারাতেও দেখা যাবে, মুক্তধারার প্রবাহে বাঁধ দেওয়ার জন্য বলিদানের নিষ্ঠুর রীতির কথা। প্রকৃতির ওপর এই নিয়ন্ত্রণ যত বেশি মানুষের আপন হাতে চলে এসেছে, তত বেশি এই তুষ্ট করবার অজ্ঞানতাপ্রসূত মানসিক দরকারটাও কমে এসেছে। সেই অর্থে বলা যায়, পরদেশি প্রযুক্তি আর লোকবল ভাড়া করে এনে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কিংবা মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো যথেষ্ট নয়, দেশবাসীর মানসকে এই আদিম বিশ্বাস থেকে মুক্ত করার কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মযজ্ঞ এদেশে ঘটেনি।
যেভাবেই হোক, পদ্মা সেতু গূঢ় প্রাকৃতিক শক্তি বিষয়ে মানুষের অন্ধবিশ্বাসের জগতকে জাগিয়ে দিয়েছে, নির্মাণ জটিলতা তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই বিষয়ে যতবার খবর প্রকাশিত হয়েছে, সরকারকে নকশা বদলাতে হয়েছে, বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হয়েছে, ততবার জনমনে এই সংশয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে প্রাণ উৎসর্গ বিষয়ে সেই আদিম কল্পনা আরও পরিপুষ্ট হয়েছে, সংশয় আর সন্দেহ তৈরি করেছে। মানুষ যখন পত্রিকায় পড়েছে বা শুনেছে পদ্মার নিচে মাটি মিলছে না, নকশা বদলাতে হয়েছে এবং এমনি আরও নানান প্রতিবন্ধকতা, তখন এমন একটা শক্তিশালী গুজবের জন্য উৎকৃষ্ট ক্ষেত্রই প্রস্তুত হয়েছে, এভাবেই একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে যাতে মানুষ এই প্রবল ভ্রান্তবিশ্বাসটাকে যে সূত্র থেকেই শুনে থাকুক না কেন, নিজের মনে স্থান দিয়েছে যে, পদ্মা সেতুর ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন করার জন্য মানুষের মাথা উৎসর্গ করতে হবে। এমনকি কোনো কোনো গুজবে কোন জেলা থেকে কত মাথা লাগবে, তার সংখ্যাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
৩. গণপিটুনির একটা দৃশ্যের ভিডিও দেখা খুব কঠিন মানসিক পীড়নের কাজ। কিন্তু তারপরও তা দেখলাম। তাতে ‘মাইরা ফালা’ বাক্যটা অনেকবার শোনা গেল, আর অন্তত একবার শোনা গেল ‘পুলিশ ছাইড়া দিব’। গণপিটুনির যতগুলো দৃশ্য এ পর্যন্ত দেখেছি, তাতে সর্বদাই এই ‘পুলিশ ছাইড়া দিব’ বাক্যটাকে বারবার শুনেছি। সেই হিসেবে বলা যায়, পথচলতি মানুষও যে তুচ্ছ অপরাধে কিংবা বিকট সন্দেহের বশে এমন হিংস্র সত্তায় পরিণত হয়, তার প্রধান কারণ পুলিশ এবং আদালতের প্রতি তীব্রতম জনঅনাস্থা, যার কথা অধ্যাপক শমিত কর ওপরে বলছিলেন ভারতীয় প্রেক্ষাপটে। তার সঙ্গে যখন যুক্ত হয়েছে একটা শতাব্দীপ্রাচীন আতঙ্ক জাগানো কুসংস্কার, পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ হওয়ারই কথা। একদম ভ্রান্তভাবেও কিছু মানুষ যদি কিছুদিনের জন্য অন্ধভাবে বিশ্বাস করে যে, সেতু করবার জন্য এই ছেলেধরায় সরকারের অনুমোদন আছে, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ারই কথা, তাই হয়েছে। এই নগরেই কিংবা মফস্বলে কিংবা গ্রামীণ এলাকায় যাদের ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলে বেড়ায়, রাস্তায় হাঁটে, তাদের জন্য এই আতঙ্ক ভয়ংকর। অপরাধী সন্দেহে কাউকে আদালতে হাজির না করে উপস্থিত বিচার বা গণপিটুনি কিংবা ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া সারা দুনিয়াতেই ছিল। এটা কমে আসাটা বিচারের দৃঢ়ভাবে স্থাপিত হওয়ার সমানুপাতিক। আমাদের দেশে ঠিক এই ঘাটতিটাই রয়েছে একদিকে, অন্যদিকে যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি জনমানসকে নিজের সন্দেহকে বিচার করতে শেখায়, তার কোনো উদ্যোগও রাষ্ট্র কখনো নেয়নি। বিচারব্যবস্থার অকার্যকারিতার কারণেই গণপিটুনিকে আমাদের দেশে এখনো অনুমোদনযোগ্য হিসেবেই দেখা হয়। ছিনতাইকারীর বেলায় পুলিশকে বেশ কয়েকবার অপেক্ষা করতে দেখেছি কখন মানুষজন মোটামুটি তৃপ্ত বোধ করছে, তারপর তারা উদ্ধারে নামে। অনেক সময় দরকষাকষিও চলে, পুলিশের হাতে দিয়ে দেওয়ার আগেই যথেষ্ট শাস্তি অপরাধী সন্দেহ করা ব্যক্তিটিকে দেওয়া হয়েছে কি না, সেটাই সেখানে বিবেচ্য। আবার অনতিবিলম্বে হতভাগ্য মানুষটাকে উদ্ধার করার চেষ্টাও দেখেছি তাদের কখনো কখনো। অহেতুক বলপ্রয়োগ, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণের জন্য এদেশের পুলিশ কুখ্যাত; কিন্তু এটা নিশ্চিত, গণপিটুনি কিংবা সাম্প্রদায়িক হামলার মতো জঘন্য ঘটনাগুলো বন্ধে পুলিশ ত্বরিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে তার কার্যকারিতার প্রতি মানুষের আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধিই পাবে; নাগরিকদের মাঝেও এই ধারণা দৃঢ় হবে যে, এমনকি গণপিটুনিতে হত্যাও শাস্তিযোগ্য।
পত্রিকান্তরে জেনেছি, বাংলাদেশে একাধিক ঘটনা আছে যেখানে আইন রক্ষাকর্তারাই কাউকে তুলে দিয়েছেন ‘জনতার’ হাতে, মেরে ফেলবার জন্য। এর প্রধান কারণ হলো গণপিটুনি বন্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যর্থতাকে এখানে বড় করে দেখা হয় না, গণপিটুনিতে জড়িতদের শাস্তির নিদর্শনও এখানে প্রায় নেই। ফলে গণপিটুনির সংস্কৃতি উৎসাহিত হয়। আর সরকারের প্রকৃতি যদি হয় গুণ্ডাতান্ত্রিক, তৃণমূল স্তর পর্যন্ত আপন গুণ্ডাবাহিনীকে রক্ষায় সর্বোচ্চটাই তাকে করতে হয়, কেন সে একজন নামগোত্রহীন নিহত মানুষের জন্য তার তৃণমূলের সদস্যদের ত্যক্ত করতে যাবে! এই বিষয়টাও গণপিটুনির সঙ্গে জড়িতদের মাঝে একটা অভয়বোধের সৃষ্টি করে। কিশোর বা যুবক বয়েসী যে তরুণরা গণপিটুনির উৎসাহী অংশগ্রহণকারী, তারা এরকম একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণের, নেতৃত্বের স্বাদ আস্বাদনের কিংবা যাকে বলা যায় ঘটনার কর্তা হয়ে উঠবার আনন্দ উপভোগ করেন। সাধারণত দেখা যায় বিবেচক প্রকৃতির কিছু মানুষ গণপিটুনি থামাবার চেষ্টা করেন; দুর্ভাগ্য এই যে, সর্বশেষ তাসলিমা বেগম রেনুর হত্যাকাণ্ড ঠেকাবার উদ্যোগ নিতেও তেমন কাউকেই দেখা যায়নি।
৪. মাত্র গত রমজানেই খুলনা অঞ্চলে গুজব রটে রোহিঙ্গা ছেলেধরার। একজন প্রতিবন্ধীর মৃত্যু, আরও কয়েকজনের গণপিটুনিতে আহত হওয়া, তীব্র আতঙ্কের পরিবেশে রাত জেগে পাহারা দেওয়ার পর এক সময় তা থিতিয়েও আসে। মর্মান্তিক এই মৃত্যুগুলো মেনে নেওয়া যায় না। আপনার আশপাশে এমন দৃশ্য দেখলে অবশ্যই থামাবার চেষ্টা করবেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পক্ষে এটা সবচেয়ে বেশি সম্ভব। ৯৯৯-এ ফোন করবেন, সেক্ষেত্রে পুলিশের তৎপরতা বহুগুণ সক্রিয় থাকবে; কারণ তাদেরকে উচ্চস্তর থেকে নির্দেশ দেওয়া হবে। উদ্যোগ নিলে, চেষ্টা করলে হয়তো এমন অনেক প্রাণঘাতী ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু আইন ও আদালত মানুষের মনে আস্থা তৈরি না করতে পারলে এবং সরকারকে নিয়ে মানুষের মনে সংশয় থাকলে রোহিঙ্গা ছেলেধরা, পদ্মা সেতুর জন্য ছেলেধরার পর হয়তো নতুন কোনো গুজবের শিকার হয়ে নিরীহ কোনো পথচারীকে, কোনো বাকপ্রতিবন্ধীকে কিংবা কোনো মাকে প্রাণ হারাতে হবে।
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট