চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার মাদ্রাসাছাত্র আবির হুসাইন হত্যাকাণ্ডে মাদ্রাসারই কেউ জড়িত বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তাদের সন্দেহের তালিকায় প্রথমেই রয়েছেন মাদ্রাসার সুপার মুফতি আবু হানিফ। পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, এ হত্যা মামলায় গতকাল শুক্রবার বিকেলে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া আটক চার শিক্ষককেও জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের নুরানি হাফিজিয়া মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র আবির গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে মাদ্রাসার অদূরে একটি আমবাগান থেকে তার মাথাবিহীন লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা থেকে আসা র্যাবের ডগ স্কোয়াডের একটি বিশেষ দল গত বুধবার দিনভর অভিযান চালিয়েও শিশুটির মাথা উদ্ধারে ব্যর্থ হয়। পরদিন সকালে চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস ও খুলনার ডুবুরিদল মাদ্রাসার পাশের একটি পুকুর থেকে তার মাথা উদ্ধার করে।
পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদ্রাসাছাত্র আবির হত্যার পর আমরা অতি সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছি। তদন্তে ও জিজ্ঞাসাবাদে র্যাব সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছে। হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমাদের কাছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্যও এসেছে। সেগুলো খুব সূক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করছি। তবে আমরা নিশ্চিত খুনি মাদ্রাসারই কেউ।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আবিরকে বলাৎকার করা হতো এবং তা ধামাচাপা দিতেই এ হত্যাকাণ্ডÑ এটি এখন পরিষ্কার। আমরা মাদ্রাসার সুপার মুফতি আবু হানিফকেই সন্দেহের এক নম্বরে রেখেছি। কারণ আবির নিখোঁজ হওয়ার সময় তিনি মাদ্রাসাতে ছিলেন না।’
আলমডাঙ্গা থানার ওসি আসাদুজ্জামান মুন্সী জানান, মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, মঙ্গলবার এশার নামাজের সময় সুপারকে বিচলিত দেখা গেছে। নামাজ শেষে কিছুক্ষণের জন্য মাদ্রাসা থেকে বাইরে বের হন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার সকালে আবিরের মাথা উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে ছুটে যান পুলিশ সুপার, ঝিনাইদহ র্যাব-৬-এর ক্যাম্প কমান্ডার মাসুদ আলমসহ র্যাব ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পুলিশ সুপার এলাকাবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তৃতার পর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘ঘাতক এতটাই চতুর ও ঠাণ্ডা মাথার খুনি যে খুব নিখুঁত পরিকল্পনা করে খুন করা হয় মাদ্রাসাছাত্রকে। এরপর হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে গুম করা হয়। যাতে করে সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা সেতু তৈরিতে মানুষের মাথা লাগছেÑ এটি প্রতিষ্ঠিত করে সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা যায়।’
এদিকে গত বুধবার রাতে আবিরের মা গোলাপী বেগম অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে আলমডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক শেখ মাহবুবুর রহমান গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। সব তথ্যকেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্তকার্য পরিচালনা করছি। মাদ্রাসার সুপার মুফতি আবু হানিফ জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনাতে জামায়াত-শিবিরের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা মামলার এজাহারনামীয় আসামি আবু হানিফ। চার্জশিটেও তাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। আবির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জামায়াতের কোনো যোগসূত্র আছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
ঝিনাইদহ র্যাব-৬ এর ক্যাম্প কমান্ডার মাসুদ আলম বলেন, ‘গত দুদিনে প্রায় ৫০ শতাংশ তদন্ত শেষ করেছি। অনেক বিষয় সামনে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটককৃতদের হাতের ডিএনএ, ফিঙ্গার প্রিন্ট ও নিহত ছাত্রের মলদ্বারের স্যুয়াব সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে ঢাকাতে। প্রতিবেদনটি হাতে পেলেই সব কিছু পরিষ্কার হবে।’