জিওফ অ্যালার্ডিচ, আইসিসির জেনারেল ম্যানেজার। নব্বইয়ের দশকে ভিক্টোরিয়ার হয়ে অস্ট্রেলিয়া ঘরোয়া ক্রিকেটে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলেছেন কয়েকটি। পড়তেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। বন্ধু ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সিইও জেমস সাদারল্যান্ড চাকরি দেন আম্পায়ারদের সিডিউলিংয়ের। সেই থেকে শুরু। ২০১২ সালের জুলাইতে এসেছেন আইসিসিতে, দক্ষিণ আফ্রিকার ডেভ রিচার্ডসনের উত্তরসূরি হিসেবে। ক্রিকনইফো কথা বলে সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপ ও টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নানা বিষয় নিয়ে। সাক্ষাৎকারের সংক্ষিপ্ত অংশ এখানে তুলে ধরা হলো...
বিশ্বকাপকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ক্রিকেটের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমরা খুব খুশি। দলগুলোর সামর্থ্য প্রায় সমান ছিল। যেকোনো দল যেকোনো ম্যাচ জেতার জায়গায় ছিল। ক্রিকেটের গুণমান এবং স্বপ্নের ফাইনাল ধরলে বলতেই হবে এটা অন্যরকম এক টুর্নামেন্ট। শুরুতে রেকর্ড স্কোরের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে স্কোরগুলো ছোট-বড় মিলিয়ে গড়পড়তা ছিল।
উইকেট তৈরির ব্যাপারে আইসিসি গ্রাউন্ডসম্যানদের কি কোনো নির্দেশনা দিয়েছিল?
না, কোনো বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আইসিসির ইভেন্টে সেরা উইকেট তৈরির জন্য সাধারণভাবে যে নির্দেশনা দেওয়া হয় তাই দেওয়া হয়েছিল। উইকেট প্রস্তুতির সঙ্গে আমরা যুক্ত ছিলাম না। প্রথম ম্যাচে ১০৫ রানে অল আউটের নজির আছে। সর্বোচ্চ ৩৯৭ রানের নজিরও আছে। উইকেট সব দলের দক্ষতা এবং কৌশলের চূড়ান্ত পরীক্ষা নিয়েছে।
বৃষ্টির সময় মাঠ পুরোপুরি না ঢেকে রাখা নিয়ে আইসিসিকে অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। প্রস্তুতির সময় কি এই বিষয়টা নিয়ে ভাবা হয়নি?
পৃথিবীর অন্য অংশের মাঠগুলোতে যেমন ফুল কাভারেজ রাখা হয়, উন্নত ড্রেনেজ সিস্টেম থাকা মাঠে সাধারণভাবে তেমনটা দরকার হয় না। অন্যান্য দেশে বৃষ্টির ধরনের কারণেই হোক কিংবা ড্রেনেজের কারণেই হোক, পানি শুকাতে দেরি হয়। ইংল্যান্ডে ড্রেনেজ সিস্টেম চমৎকার। সাধারণত আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করলে তারা যেভাবে বৃষ্টির হাত থেকে মাঠকে আড়াল করে বিশ্বকাপেও সাধারণভাবে সেটাই অনুসরণ করেছিল। এই বিশ্বকাপে বেশিরভাগ সময়েই বৃষ্টির থামার পর আমরা দ্রুত খেলা শুরু করতে পেরেছি। সারা দুনিয়ার সব মাঠের জন্য একটাই মাত্র সমাধান তো আর হতে পারে না। এ কারণেই আমরা স্থানীয় বোর্ডকে আমরা মাঠ কাভারে তাদের পদ্ধতি অনুসরণের অনুমিত দিই।
বিশ্বকাপ ফাইনালে যে ওভারথ্রো রুল প্রয়োগ করা হয়েছিল তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। আইসিসির ম্যাচ অফিশিয়াল, ম্যাচ রেফারিরা কি ফাইনালে যা করছে তার চেয়ে ভিন্ন কিছু করতে পারত?
যখন ফিল্ডার থ্রো করছে তখন ব্যাটসম্যানরা পরস্পরকে ক্রস করেছে কি না সেই বিচার করার দায়িত্ব মাঠের আম্পায়ারের। সেই ডেলিভারির সময়ে যা ঘটেছিল তারা দুজন কমনসেন্সের ওপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে তারা সঠিক পদ্ধতিই অনুসরণ করেছিল।
আপনি কি মনে করেন ওভারথ্রো রুলের পর্যালোচনা করা উচিত?
সাধারণত এমসিসির ক্রিকেট আইনকেই আইসিসি অনুসরণ করে। বিশ্বকাপ ফাইনালে ওভারথ্রো নিয়ে যা হয়েছে তারপর আমি জানি না এমসিসি ওভারথ্রো রুলের পর্যালোচনা করবে কি না।
টাইব্রেকার রুল নিয়েই বা আপনি কী বলবেন? কেন উইলিয়ামসন তো বলেই ফেলেছিলেন যে, এটা লজ্জার ব্যাপার যে রানার্সআপ হিসেবে ঘরে ফিরতে হচ্ছে নিউজিল্যান্ডকে। চ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক ওয়েন মরগানও বলেছেন, এটা অন্যায়। আইসিসি আইন পরিবর্তনের কথা বলবে ক্রিকেট কমিটিকে?
বিশ্বকাপের ফাইনালে যে ইস্যুগুলো উঠেছে পরের মিটিংয়ে ক্রিকেট কমিটি তা বিবেচনা করবে (২০২০ সালের প্রথমার্ধে আইসিসির ক্রিকেট কমিটির মিটিং)। আইসিসি ইভেন্টে ২০০৯ সালের পর থেকে টাই ম্যাচের বিজয়ী নির্ধারণ করা হচ্ছে সুপার ওভারের মাধ্যমে। তার আগে বোল-আউট নিয়ম ছিল। সেই ম্যাচে সুপার ওভার টাই হওয়ার পর টাইব্রেকের নিয়ম প্রয়োগ করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে ম্যাচের বাউন্ডারিই গণনা করা হয়। বিশ্বে প্রচলিত সব টি-টোয়েন্টি লিগেই সুপার ওভার টাই হওয়ার পর টাইব্রেকের এই নিয়ম প্রচলিত। আমরা প্রচলিত সেই সুপার ওভারের নিয়মই ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম যা সব ধরনের পেশাদার ক্রিকেটে প্রচলিত। যদি কিছু পরিবর্তনের দরকার হয়, ক্রিকেট কমিটি তা বিবেচনা করবে।
ফাইনালের আম্পায়ার হিসেবে কুমার ধর্মসেনাকে নেওয়া হয়েছিল। যিনি শুধু ফাইনালেই নয়, তার আগেও সিদ্ধান্তের জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন। আপনি কি বলবেন বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় ম্যাচের আম্পায়ার কীভাবে বেছে নেওয়া হয়। ফাইনালে তৃতীয় আম্পায়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল আলিম দারকে?
আমাদের সিলেকশন কমিটি আছে যারা আম্পায়ারদের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে এবং এলিট প্যানেলের ১২ জনকে বেছে নেয়। এলিট প্যানেলের আম্পারদেরও একটা ভালো কিংবা খারাপ দিন যায়। সুতরাং একটা খারাপ দিনের জন্য ভালো একজন আম্পায়ার হঠাৎ বাজে আম্পায়ার হয়ে যায় না। এলিট প্যানেলের আম্পায়ারদের পারফরম্যান্স বেশ লম্বা সময় ধরে বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিশ^কাপ ফাইনালের মতো টুর্নামেন্টে আমরা সর্বোচ্চ র্যাংকের আম্পায়ারকেই বেছে নিই। এ ক্ষেত্রে সহজাত আম্পায়ার কি না সেই ব্যাপারটাও মাথায় থাকে। সেই মুহূর্তে (বিশ্বকাপ ফাইনালের সময়) এলিট প্যানেলে আমাদের হাতে ইংল্যান্ডের চারজন আম্পায়ার ছিল। ইংল্যান্ড ফাইনালে ওঠায় আমরা তাদের বেছে নিতে পারিনি। কুমার ধর্মসেনা বছরটা দারুণ কাটিয়েছিল। যে কারণে সে ২০১৮ সালের বর্ষসেরা আম্পায়ার হয়। অনেক দিন ধরেই সে একজন সেরা ডিসিশন মেকার। আগেও সে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলিয়েছে। এলিট প্যানেলে তার র্যাংকিংও ভালো ছিল। সে কারণেই তাকে ফাইনালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
অ্যাশেজের এক সপ্তাহ পরেই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হবে। বিরাট কোহলি এই প্রতিযোগিতাকে বলেছেন সেরার সেরা। ক্রিকেটারদের এই সমর্থন কি সাহায্য করে?
অবশ্যই। এমন মন্তব্য শুনে উৎসাহ বোধ করছি। আমি জানি ক্রিকেটাররা টেস্ট ক্রিকেটকে ভালোবাসে। এটাও জানি টেস্ট র্যাংকিং লম্বা সময় ধরে সেরা দল বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভালো দায়িত্ব পালন করেছে। তবে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পরিকল্পনা যেভাবে করা হয়েছে তাতে এটার প্রতি সবার আগ্রহ বাড়বে।